টাঙ্গনের বুকে দৃষ্টিনন্দন চেরকুঘাট সেতু, বদলে যাওয়ার অপেক্ষায় ১৭ গ্রামের জীবন
মোঃ আসাদুজ্জামান, পীরগঞ্জ (ঠাকুরগাঁও) প্রতিনিধি:
ঠাকুরগাঁওয়ের পীরগঞ্জে টাঙ্গন নদীর ওপর নির্মিত হয়েছে দৃষ্টিনন্দন চেরকুঘাট সেতু। নির্মাণকাজ শেষ হলেও এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে যান চলাচলের জন্য খুলে দেওয়া হয়নি। তবে সেতুটি ঘিরে এরই মধ্যে নতুন স্বপ্ন ও প্রত্যাশা তৈরি হয়েছে নদীর দুই পাড়ের মানুষের মধ্যে। প্রতিদিনই সেতুটি দেখতে ভিড় করছেন নানা বয়সী মানুষ। গড়ে উঠেছে অস্থায়ী দোকানপাট ও বিনোদনের বিভিন্ন আয়োজন।
স্থানীয়দের দীর্ঘদিনের দাবি ছিল টাঙ্গন নদীর ওপর একটি স্থায়ী সেতু নির্মাণের। সেই প্রত্যাশা পূরণ হওয়ায় খুশি নদীপাড়ের ১৭ গ্রামের মানুষ। তাদের আশা, সেতুটি আনুষ্ঠানিকভাবে চালু হলে উপজেলা ও জেলা সদরের সঙ্গে যোগাযোগ সহজ হওয়ার পাশাপাশি কৃষি, শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও ব্যবসা-বাণিজ্যে নতুন গতি আসবে।
স্থানীয় সংসদ সদস্য জাহিদুর রহমান জানিয়েছেন, চলতি মাসেই সেতুটি জনগণের চলাচলের জন্য উন্মুক্ত করে দেওয়ার আশা রয়েছে। তিনি বলেন, সেতুটির নির্মাণকাজ শেষ হয়েছে। আনুষ্ঠানিক উদ্বোধনের মাধ্যমে দ্রুত এটি চালু করা গেলে এলাকার মানুষের দীর্ঘদিনের দুর্ভোগের অবসান হবে। সেতুটির উদ্বোধন রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুল ইসলাম করবেন—এমন প্রত্যাশার কথাও জানান তিনি।
উপজেলা প্রকৌশলীর দপ্তর সূত্রে জানা যায়, পীরগঞ্জ উপজেলার বুক চিরে প্রবাহিত টাঙ্গন নদী কোষারানীগঞ্জ ও সৈয়দপুর ইউনিয়নের শালগড়া, ডাঙ্গীপাড়াসহ ১৭টি গ্রামের মানুষের যোগাযোগের ক্ষেত্রে দীর্ঘদিন ধরে বড় বাধা হয়ে ছিল। বর্ষা মৌসুমে নদী পারাপারে দুর্ভোগ আরও বেড়ে যেত। সড়ক যোগাযোগ সহজ করতে ২০১৮ সালে ভামদা গ্রামে টাঙ্গন নদীর ওপর চেরকুঘাট সেতু নির্মাণের উদ্যোগ নেয় স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি)।
প্রায় ২০ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত সেতুটির দৈর্ঘ্য ১৬০ মিটার। এরই মধ্যে পুরো নির্মাণকাজ শেষ হয়েছে। সবুজ মাঠের মাঝ দিয়ে টাঙ্গন নদীর ওপর দাঁড়িয়ে থাকা সেতুটি স্থানীয়দের কাছে এখন শুধু যোগাযোগের অবকাঠামো নয়, নতুন সম্ভাবনার প্রতীক হয়ে উঠেছে।
সেতুটি চালু হওয়ার আগেই এর আশপাশে মানুষের আনাগোনা বেড়েছে। প্রতিদিন দূর-দূরান্ত থেকে মানুষ সেতুটি দেখতে আসছেন। দর্শনার্থীদের ঘিরে গড়ে উঠেছে অস্থায়ী দোকানপাট। কোথাও বসানো হয়েছে দোলনাসহ বিভিন্ন ধরনের বিনোদনমূলক রাইড। ফলে সেতুকেন্দ্রিক একটি নতুন জনসমাগমস্থলেরও সৃষ্টি হয়েছে।
স্থানীয় শিক্ষক ওয়ালিউর রহমান মিঠু ও সাইফুল ইসলাম বলেন, টাঙ্গন নদীর পূর্বপাড়ের মানুষের দীর্ঘদিনের আকাঙ্ক্ষা ছিল চেরকুঘাটে একটি সেতু। সেই স্বপ্ন এখন বাস্তব হয়েছে। সেতুটি নির্মাণ হওয়ায় এলাকার মানুষ অত্যন্ত খুশি। ইতোমধ্যে সেতুকে ঘিরে মানুষের আগ্রহ বেড়েছে এবং অস্থায়ী দোকানপাটও বসেছে।
কোষারানীগঞ্জ ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান গোলাম মোস্তফা বলেন, চেরকুঘাট সেতু ছিল এলাকার মানুষের দীর্ঘদিনের প্রত্যাশা। সেতুটি চালু হলে ১৭ গ্রামের প্রায় ৩০ হাজার মানুষ সরাসরি উপকৃত হবে। উপজেলা ও জেলা সদরের সঙ্গে সড়ক যোগাযোগ সহজ হবে। পাশাপাশি এলাকার আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে সেতু এলাকায় দুইজন গ্রাম পুলিশকে সার্বক্ষণিক দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।
উপজেলা প্রকৌশলী মাইদুল ইসলাম বলেন, সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে সেতুটির নির্মাণকাজ সম্পন্ন করা হয়েছে। নির্মাণে ভালো মানের রড, সিমেন্ট ও ব্ল্যাক স্টোনসহ প্রয়োজনীয় নির্মাণসামগ্রী ব্যবহার করা হয়েছে।
ঠাকুরগাঁও-৩ আসনের সংসদ সদস্য জাহিদুর রহমান বলেন, ২০১৮ সালে সংসদ সদস্য থাকাকালে তিনি চেরকুঘাট সেতুর জন্য অর্থ বরাদ্দের উদ্যোগ নিয়েছিলেন। দীর্ঘ প্রক্রিয়া শেষে সেতুটির নির্মাণকাজ সম্পন্ন হওয়ায় এখন এটি চালুর অপেক্ষায় রয়েছে।
স্থানীয়দের প্রত্যাশা, আনুষ্ঠানিক উদ্বোধনের পর দ্রুত সেতুটি যান চলাচলের জন্য খুলে দেওয়া হবে। সেতুটি চালু হলে শুধু নদী পারাপারের দুর্ভোগই কমবে না, বরং এ অঞ্চলের কৃষিপণ্য পরিবহন, শিক্ষার্থীদের যাতায়াত, রোগীদের চিকিৎসাসেবা গ্রহণ এবং ব্যবসা-বাণিজ্যের প্রসারেও ইতিবাচক প্রভাব পড়বে। দীর্ঘদিন যোগাযোগ বিচ্ছিন্নতার যে বাস্তবতা ছিল, চেরকুঘাট সেতু সেটিকে বদলে দিয়ে পীরগঞ্জের এই জনপদে নতুন সম্ভাবনার দুয়ার খুলবে—এমন প্রত্যাশাই এখন স্থানীয়দের।