গত ১৭ সেপ্টেম্বর বেলা ১১টায় নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের বীরশ্রেষ্ঠ শহিদ মোহাম্মদ রহুল আমিন অডিটরিয়ামে ‘ইন্টারন্যাশনাল মাইক্রোঅর্গানিজম ডে-২০২৬’ উপলক্ষে আয়োজিত অনুষ্ঠানে এক অনভিপ্রেত ও বিতর্কিত ঘটনা ঘটে। অণুজীববিজ্ঞান বিভাগের আয়োজনে র্যালি ও আলোচনা সভার শুরুতে জাতীয় সংগীত পরিবেশনের সময় প্রজেক্টরে প্রদর্শিত ভিডিওর শেষ অংশে ফ্যাসিস্ট সরকারের প্রধানের ছবি ভেসে ওঠে। বিশ্ববিদ্যালয়ের এই জাতীয় প্রোগ্রামে এমন দৃশ্য প্রদর্শিত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে উপস্থিত অতিথিদের মাঝে তীব্র অসন্তোষ দেখা দেয় এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের ট্রেজারার অধ্যাপক ড. মো. হাছান উদ্দীন তাৎক্ষণিকভাবে এর প্রতিবাদ জানান। পরবর্তীতে পরিস্থিতি সামাল দিতে পুনরায় জাতীয় সংগীত পরিবেশন করা হলেও, জুলাই গণঅভ্যুত্থানের ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট ও ছাত্র-জনতার রক্তক্ষয়ী সংগ্রামের ঠিক এই সময়ে রাষ্ট্রীয় ও জাতীয় অনুষ্ঠানে এমন ঘটনা জনমনে গভীর ক্ষোভের জন্ম দিয়েছে। কে বা কারা এবং কীভাবে এই ভিডিও প্রজেক্টরে যুক্ত করেছিল, তা নিয়ে তাৎক্ষণিকভাবে প্রশ্ন ওঠে এবং বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন কঠোর অবস্থান গ্রহণ করে ঘটনাটির প্রাথমিক সত্যতা নিশ্চিত করে।
এই ন্যাক্কারজনক ঘটনার পর বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন অবিলম্বে নড়েচড়ে বসে এবং অনুষ্ঠানের আহ্বায়ক ও অণুজীববিজ্ঞান বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. খন্দকার ফাহমিদা সুলতানা এবং বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. ফিরোজ আহমেদকে কারণ দর্শানোর নোটিশ প্রদান করে। বিশ্ববিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত রেজিস্ট্রার মোহাম্মদ তামজিদ হোছাইন চৌধুরী স্বাক্ষরিত ওই চিঠিতে স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয় যে, জাতীয় সংগীতের মতো পবিত্র মুহূর্তে ফ্যাসিবাদী সরকারের প্রধানের ছবি প্রদর্শন কেবল অসদাচরণই নয়, বরং এটি সরাসরি চাকরি শৃঙ্খলার পরিপন্থি। প্রশাসন মনে করে, জুলাই গণঅভ্যুত্থানের শহীদ এবং আহতদের রক্তের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতার শামل এই কর্মকাণ্ড। যেখানে দেশজুড়ে ছাত্র-জনতার আত্মত্যাগের স্মৃতি অম্লান, সেখানে রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ একটি প্রতিষ্ঠানে এমন স্লিপ অব জাজমেন্ট বা ইচ্ছাকৃত প্রদর্শন দেশের বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতায় চরম অবমাননাকর হিসেবে বিবেচিত হয়েছে এবং এর পেছনে অন্য কোনো গভীর চক্রান্ত আছে কি না, তা খতিয়ে দেখার দাবি জোরালো হচ্ছে।
ঘটনার ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে অভিযুক্ত শিক্ষক ও সংশ্লিষ্ট কর্তারা নিজেদের দায় এড়ানোর চেষ্টা করলেও এর পেছনের প্রশাসনিক ও সাংগঠনিক উদাসীনতা স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। অনুষ্ঠানের আহ্বায়ক সহযোগী অধ্যাপক ড. খন্দকার ফাহমিদা সুলতানা দাবি করেছেন যে এটি সম্পূর্ণ অনাকাঙ্ক্ষিত এবং আয়োজনের ব্যস্ততার কারণে ভিডিওটি পূর্বে রিভিউ করা সম্ভব হয়নি, যদিও ভুল বুঝতে পেরে তারা তাৎক্ষণিকভাবে ভিডিও বন্ধ করে পুনরায় অডিওর মাধ্যমে জাতীয় সংগীত বাজান। অন্যদিকে, বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. ফিরোজ আহমেদ জানিয়েছেন যে ইউটিউব থেকে নামানো ওই ভিডিওর শেষাংশে প্রায় দশ সেকেন্ডের জন্য ওই ছবি চলে আসে যা শিক্ষার্থীরা খেয়াল করেনি। তবে বিশ্ববিদ্যালয়ের ট্রেজারার অধ্যাপক ড. মো. হাছান উদ্দীন এই সাফাই প্রত্যাখ্যান করে জানান যে বিদেশি গবেষক ও আমন্ত্রিত অতিথিদের উপস্থিতিতে এমন ঘটনা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয় এবং পূর্বপ্রস্তুতি ও রিহার্সালের দায়িত্বে থাকা ব্যক্তিদের অবহেলার কারণে এ ধরনের পরিস্থিতি এড়ানো সম্ভব ছিল না বিধায় তিনি তাৎক্ষণিক প্রতিবাদ জানিয়ে অনুষ্ঠান ত্যাগ করেন।
উচ্চশিক্ষার মতো সংবেদনশীল জায়গায় এ ধরনের পুনরাবৃত্তি রোধ করতে এবং প্রাতিষ্ঠানিক শৃঙ্খলা বজায় রাখতে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের এই শোকজ নোটিশ অত্যন্ত সময়োপযোগী পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে। আগামী তিন কার্যদিবসের মধ্যে সন্তোষজনক জবাব দিতে ব্যর্থ হলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে কী ধরনের বিভাগীয় ও আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হয়, এখন সেদিকেই নজর সবার। এ ধরনের দায়িত্বহীনতা ও প্রশাসনিক তদারকির অভাব কেবল একটি বিভাগের মান ক্ষুণ্ন করে না, বরং পুরো বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাবমূর্তিকে চরম সংকটের মুখে ঠেলে দেয়। ভবিষ্যতে জাতীয় গুরুত্বের প্রতিটি অনুষ্ঠানে সর্বোচ্চ সতর্কতা অবলম্বন না করলে এ ধরনের ঘটনা শহীদদের আত্মত্যাগের প্রতি চরম অসম্মান হিসেবে গণ্য হতে থাকবে এবং জনমনে প্রশাসনের নজরদারি নিয়ে প্রশ্ন আরও ঘনীভূত হবে।