এনবিআর, ট্যাক্সেশন ও শুল্ক নীতি-এ বিনিয়োগ, ঝুঁকি ও সম্ভাবনার পরিমাপ | আই নিউজ বিডি | বাংলাদেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ ও ভিডিও

এনবিআর, ট্যাক্সেশন ও শুল্ক নীতি-এ বিনিয়োগ, ঝুঁকি ও সম্ভাবনার পরিমাপ

নাসরিন সুলতানা  avatar   
নাসরিন সুলতানা
এনবিআর, ট্যাক্সেশন ও শুল্ক নীতি-এ বিনিয়োগ, ঝুঁকি ও সম্ভাবনার পরিমাপ
এনবিআর, ট্যাক্সেশন ও শুল্ক নীতি-এ বিনিয়োগ, ঝুঁকি ও সম্ভাবনার পরিমাপ
ছবি: সংগৃহীত

জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (NBR) সম্প্রতি চলতি অর্থবছরের (২০২৩-২৪) প্রথম সাত মাসে (জুলাই-জানুয়ারি) রাজস্ব আহরণে প্রায় সাড়ে আট শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জন করলেও, নির্ধা...

জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (NBR) সম্প্রতি চলতি অর্থবছরের (২০২৩-২৪) প্রথম সাত মাসে (জুলাই-জানুয়ারি) রাজস্ব আহরণে প্রায় সাড়ে আট শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জন করলেও, নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় প্রায় ১৯,০০০ কোটি টাকা পিছিয়ে রয়েছে। এই পরিসংখ্যান কেবল একটি সংখ্যা নয়; এটি দেশের বিনিয়োগ পরিবেশ, রপ্তানি প্রতিযোগিতা এবং সামগ্রিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার উপর কর ও শুল্ক নীতির গভীর প্রভাবের একটি স্পষ্ট চিত্র তুলে ধরে। বাংলাদেশের উদীয়মান অর্থনীতিতে বিনিয়োগ আকর্ষণ, ঝুঁকি মোকাবিলা এবং সম্ভাবনার পূর্ণ সদ্ব্যবহারের ক্ষেত্রে এনবিআর-এর নীতিগত সিদ্ধান্তগুলো কেন্দ্রীয় ভূমিকা পালন করে, যা শুধু রাজস্ব আদায় নয়, বরং দীর্ঘমেয়াদী শিল্পায়ন ও কর্মসংস্থান সৃষ্টির ক্ষেত্রেও প্রভাব ফেলে।

এনবিআর-এর কর ও শুল্ক কাঠামো প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে দেশীয় ও বৈদেশিক বিনিয়োগকারীদের সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করে। উদাহরণস্বরূপ, নতুন শিল্প স্থাপনে শুল্কমুক্ত কাঁচামাল আমদানির সুযোগ, বা নির্দিষ্ট খাতে কর অবকাশ (tax holiday) ঘোষণা সরাসরি বিনিয়োগ আকর্ষণ করে। তবে, সাম্প্রতিক সময়ে করপোরেট কর হার, ভ্যাট আদায় প্রক্রিয়া এবং শুল্ক সংক্রান্ত জটিলতা নিয়ে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে এক ধরনের অনিশ্চয়তা লক্ষ্য করা যাচ্ছে। বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (BSEC) এর তথ্য অনুযায়ী, পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত কোম্পানিগুলোর উপর আরোপিত করের বোঝা এবং লভ্যাংশ আয়ের উপর দ্বৈত করের কারণে দীর্ঘমেয়াদী বিনিয়োগকারীরা নিরুৎসাহিত হচ্ছেন, যা মূলধন গঠনের প্রক্রিয়াকে বাধাগ্রস্ত করছে। বিশেষ করে, ভ্যাট অনলাইন প্রকল্প বাস্তবায়নে ধীরগতি এবং এর কারিগরি ত্রুটি ছোট ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের জন্য কর পরিপালন ব্যয় (compliance cost) বাড়িয়ে দিচ্ছে, যা নতুন বিনিয়োগের অন্যতম প্রধান প্রতিবন্ধকতা হিসেবে কাজ করছে। এই পরিস্থিতি একদিকে যেমন শিল্পের উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি করছে, অন্যদিকে তেমনি দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির গতি শ্লথ করে দিচ্ছে।

বিনিয়োগের ক্ষেত্রে ঝুঁকি পরিমাপের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো নীতিগত স্থিতিশীলতা ও স্বচ্ছতা। সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (CPD) এর সাম্প্রতিক গবেষণা অনুযায়ী, শুল্ক ও কর নীতির ঘন ঘন পরিবর্তন এবং এর প্রয়োগে অসামঞ্জস্যতা বিনিয়োগকারীদের আস্থায় চিড় ধরাচ্ছে। বিশেষ করে, রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ অঞ্চলের (EPZ) বাইরের শিল্পগুলোর জন্য কাঁচামাল আমদানিতে উচ্চ শুল্ক ও কর আরোপের ফলে তাদের উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি পাচ্ছে, যা আন্তর্জাতিক বাজারে তাদের প্রতিযোগিতা সক্ষমতা কমিয়ে দিচ্ছে। রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরো (EPB) এর মতে, পোশাক খাত ব্যতীত অন্যান্য সম্ভাবনাময় রপ্তানি খাতের বিকাশ ব্যাহত হচ্ছে অতিরিক্ত আমদানি শুল্ক এবং শুল্ক প্রত্যর্পণ (duty drawback) প্রক্রিয়ার দীর্ঘসূত্রতার কারণে। এছাড়া, কর ফাঁকি রোধে এনবিআর-এর জোরালো পদক্ষেপ থাকা সত্ত্বেও, অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতের বিশাল অংশ এখনও করের আওতার বাইরে রয়েছে, যা সৎ করদাতাদের উপর বাড়তি চাপ সৃষ্টি করছে এবং অসম প্রতিযোগিতা তৈরি করছে। এই ধরনের অনিয়ম ও অস্পষ্টতা বিদেশি বিনিয়োগকারীদের জন্য একটি বড় ঝুঁকি হিসেবে বিবেচিত হয়, যারা একটি স্থিতিশীল ও পূর্বাভাসযোগ্য নীতি পরিবেশ প্রত্যাশা করেন।

তবে, এই চ্যালেঞ্জগুলোর মধ্যেও বাংলাদেশে বিনিয়োগ আকর্ষণ ও রাজস্ব বৃদ্ধির ব্যাপক সম্ভাবনা রয়েছে। এনবিআর যদি তার করনীতিকে আরও বিনিয়োগবান্ধব ও সহজীকরণ করে, তাহলে এটি দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে নতুন গতি আনবে। বাণিজ্য মন্ত্রণালয় বিভিন্ন দ্বিপাক্ষিক ও বহুপাক্ষিক বাণিজ্য চুক্তির মাধ্যমে রপ্তানি বাজার সম্প্রসারণের চেষ্টা করছে, এবং এই প্রচেষ্টার সাথে এনবিআর-এর শুল্ক নীতিগুলোর সমন্বয় ঘটানো অপরিহার্য। উদাহরণস্বরূপ, ডিজিটাল অর্থনীতির প্রসারে অনলাইন লেনদেনের উপর যৌক্তিক কর আরোপ এবং ই-কমার্স খাতের জন্য একটি সুনির্দিষ্ট কর কাঠামো তৈরি করা যেতে পারে। একইসাথে, করের ভিত্তি সম্প্রসারণের জন্য আধুনিক ডেটা অ্যানালিটিক্স এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা প্রযুক্তি ব্যবহার করে সম্ভাব্য করদাতাদের চিহ্নিত করা এবং তাদের করের আওতায় আনা সম্ভব। কর প্রশাসনকে আরও আধুনিক, দক্ষ এবং দুর্নীতিমুক্ত করার মাধ্যমে করদাতাদের আস্থা বাড়ানো যেতে পারে, যা স্বেচ্ছামূলক কর পরিপালনে উৎসাহিত করবে এবং দীর্ঘমেয়াদী রাজস্ব বৃদ্ধিতে সহায়ক হবে। সঠিক নীতি প্রণয়ন ও বাস্তবায়নের মাধ্যমে এনবিআর কেবল রাজস্ব আদায়কারী সংস্থা হিসেবেই নয়, বরং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির মূল চালিকাশক্তি হিসেবেও কাজ করতে পারে।

অর্থবছর এনবিআর রাজস্ব আহরণ লক্ষ্যমাত্রা (কোটি টাকা) এনবিআর রাজস্ব আহরণ (কোটি টাকা) লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় আহরণের শতাংশ (%)
২০২১-২২ ৩,৩০,০০০ ৩,০১,৬৩৪ ৯১.৪০%
২০২২-২৩ ৩,৭০,০০০ ৩,২৫,২৩০ ৮৭.৯০%
২০২৩-২৪ (জুলাই-জানুয়ারি) ২,৫৭,০০০ (সাত মাসের আনুপাতিক) ২,৩৮,০০০ ৯২.৬০%

উৎস: জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (NBR) ও অর্থ মন্ত্রণালয়।

সুপারিশ

  • জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (NBR) কে ভ্যাট অনলাইন প্রকল্প (VAT Online Project) এর ত্রুটি দূর করে একটি ব্যবহারকারী-বান্ধব ও সম্পূর্ণ ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম স্থাপন করতে হবে, বিশেষ করে ছোট ও মাঝারি শিল্পের জন্য সহজীকৃত রিটার্ন দাখিল প্রক্রিয়া নিশ্চিত করতে হবে এবং এর জন্য ভ্যাট আইন, ২০১২ এর প্রয়োজনীয় সংশোধনী আনতে হবে।
  • বাণিজ্য মন্ত্রণালয় এবং অর্থ মন্ত্রণালয়ের মধ্যে কর ও শুল্ক নীতি প্রণয়নে সমন্বয় বাড়াতে হবে, বিশেষ করে রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরো (EPB) এর সুপারিশসমূহকে শুল্ক কাঠামোতে অন্তর্ভুক্ত করতে হবে যাতে রপ্তানি প্রতিযোগিতা বাড়ে, এবং এর জন্য আমদানি শুল্ক আইনের নিয়মিত পর্যালোচনা ও সংশোধন প্রক্রিয়াকে ত্বরান্বিত করতে হবে।
  • বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (BSEC) এর পরামর্শক্রমে, পুঁজিবাজারে দীর্ঘমেয়াদী বিনিয়োগ আকর্ষণে ডিভিডেন্ড আয়ের উপর দ্বৈত কর হ্রাস বা বিলোপের জন্য NBR কে আয়কর অধ্যাদেশ, ১৯৮৪ এর প্রয়োজনীয় ধারাগুলো সংশোধন করতে হবে।

✍️ নিবন্ধ লেখক: নাসরিন সুলতানা

নাসরিন সুলতানা 'আই নিউজ বিডি'-র একজন সিনিয়র সাংবাদিক ও বিষয়ভিত্তিক গবেষক। তাঁর বিশেষত্বের জায়গা: এনবিআর, ট্যাক্সেশন ও শুল্ক নীতি। এই নিবন্ধটি তাঁর নিজস্ব গবেষণা ও বিশ্লেষণ থেকে সংকলিত।

কোন মন্তব্য পাওয়া যায়নি


News Card Generator