চাঁদপুরে এক বছরের আগেই ম্যানহোল ভাঙার ঘটনায় পৌরসভার উন্নয়ন কাজ ও ঠিকাদারি সিন্ডিকেটের অনিয়ম ফাঁস.. | আই নিউজ বিডি | বাংলাদেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ ও ভিডিও

চাঁদপুরে এক বছরের আগেই ম্যানহোল ভাঙার ঘটনায় পৌরসভার উন্নয়ন কাজ ও ঠিকাদারি সিন্ডিকেটের অনিয়ম ফাঁস..

Akhter Hossain avatar   
Akhter Hossain
চাঁদপুরে এক বছরের আগেই ম্যানহোল ভাঙার ঘটনায় পৌরসভার উন্নয়ন কাজ ও ঠিকাদারি সিন্ডিকেটের অনিয়ম ফাঁস..
চাঁদপুরে এক বছরের আগেই ম্যানহোল ভাঙার ঘটনায় পৌরসভার উন্নয়ন কাজ ও ঠিকাদারি সিন্ডিকেটের অনিয়ম ফাঁস..
ছবি: সংগৃহীত

চাঁদপুর শহরের হাসান আলী সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ের সামনের সড়কে স্থাপনের এক বছরের মধ্যেই ম্যানহোলের ঢাকনা ভেঙে যাওয়ায় নিম্নমানের নির্মাণসামগ্রী ও পৌরসভার তদারকি নিয়ে তীব্র ক্ষোভ ও প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।..

চাঁদপুর শহরের অন্যতম ব্যস্ত ও জনবহুল এলাকা হাসান আলী সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ের সামনের সড়কে একটি ম্যানহোলের ঢাকনা স্থাপনের মাত্র এক বছরের মাথায় ভেঙে পড়ার ঘটনা ঘটেছে, যা বর্তমান পৌর প্রশাসনের উন্নয়ন কাজের সামগ্রিক মান এবং তদারকি ব্যবস্থাপনার ভঙ্গুর অবস্থাকে স্পষ্টভাবে উন্মোচন করেছে। সম্প্রতি ভোরের আলো ফোটার আগেই ক্যামেরাবন্দি হওয়া এই ভাঙা ঢাকনাটি কেবল একটি বিচ্ছিন্ন অবকাঠামোগত ত্রুটি নয়, বরং শহরবাসীর দীর্ঘদিনের জমে থাকা ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ। এই সড়ক দিয়ে প্রতিদিন হাজার হাজার শিক্ষার্থী, পথচারী এবং যানবাহন চলাচল করে, আর এমন একটি অতি গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টে ম্যানহোলের এই ভগ্নদশা যেকোনো মুহূর্তে বড় ধরনের দুর্ঘটনা ডেকে আনতে পারত। যেখানে একটি টেকসই নাগরিক সুবিধা নিশ্চিত করার কথা ছিল, সেখানে মাত্র বারো মাসের ব্যবধানে ঢাকনাটি ভেঙে যাওয়ার ঘটনাটি প্রমাণ করে যে, কাজের প্রাক্কলন ও বাস্তবায়নের প্রাথমিক পর্যায়েই চরম অবহেলা বা গাফিলতি করা হয়েছিল। দিন বাড়ার সাথে সাথে ব্যস্ত এই সড়কে ভাঙা ঢাকনার কারণে সৃষ্ট ছোট-বড় গর্তটি যান চলাচলে মারাত্মক প্রতিবন্ধকতা তৈরি করছে এবং ট্রাফিক ব্যবস্থাপনাকে আরও জটিল করে তুলছে। অথচ সংশ্লিষ্ট পৌর কর্তৃপক্ষ বা রক্ষণাবেক্ষণ বিভাগ সময়মতো এটি মেরামতের কোনো কার্যকর উদ্যোগ না নেওয়ায় জনদুর্ভোগ চরমে পৌঁছেছে, যা স্থানীয় নাগরিকদের মনে চরম হতাশার জন্ম দিয়েছে এবং সরকারি অর্থের হরিলুটের বাস্তব চিত্রটি আবারও সামনে নিয়ে এসেছে।

স্থানীয় বাসিন্দা ও সচেতন মহলের দীর্ঘদিনের অভিযোগ, চাঁদপুর পৌরসভার বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পে দীর্ঘদিন ধরে অনিয়ম ও দুর্নীতির একটি প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কৃতি গড়ে উঠেছে, যার মূল কারণ প্রকৌশল বিভাগের কিছু অসাধু কর্মকর্তা এবং ঠিকাদারদের যোগসাজশ বা সিন্ডিকেট। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, নিয়ম অনুযায়ী এই ম্যানহোলের ঢাকনাটি প্রায় ৮০ কেজি ওজনের হওয়ার কথা থাকলেও, ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে অভিযোগ রয়েছে যে তারা নির্ধারিত ওজনের চেয়ে অন্তত অর্ধেক ওজনের অর্থাৎ ৪০ থেকে ৫০ কেজি ওজনের নিম্নমানের ঢাকনা সরবরাহ করেছে। এই অভিযোগ যদি পুরোপুরি সত্য প্রমাণিত হয়, তবে এটি স্পষ্টতই সরকারি সম্পদের আত্মসাৎ এবং ঠিকাদার কর্তৃক চুক্তিভঙ্গের শামিল। অতীতেও এই পৌরসভার বিভিন্ন প্রকৌশলী ও কর্মকর্তার বিরুদ্ধে ক্ষমতার অপব্যবহার এবং জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জনের অভিযোগে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) অনুসন্ধান পরিচালিত হওয়ার তথ্য রয়েছে, যা পুরো প্রশাসনিক কাঠামোর স্বচ্ছতাকেই প্রশ্নবিদ্ধ করে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক ভুক্তভোগী ও স্থানীয় ব্যবসায়ী ক্ষোভ প্রকাশ করে জানিয়েছেন যে, নামমাত্র তদারকি আর দায়সারা পরিদর্শনের মাধ্যমে এই ধরনের নিম্নমানের কাজগুলো পাস করিয়ে নেওয়া হয়। এর ফলে ঠিকাদারেরা পার পেয়ে গেলেও সাধারণ নাগরিক ও পথচারীদের প্রতিদিন এই ঝুঁকিপূর্ণ ভাঙা সড়কের ওপর দিয়ে যাতায়াত করতে গিয়ে জীবন ও অঙ্গহানির আশঙ্কায় থাকতে হয়। ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের এক বছরের জামানতের যে আইনি বিধান বা শর্ত থাকে, এই ভাঙা ঢাকনার ক্ষেত্রে সেই জামানতের অর্থ আটকে রেখে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার নজির বা সদিচ্ছা কর্তৃপক্ষের মধ্যে দেখা যাচ্ছে না, যা পুরো প্রক্রিয়াটিকে আরও বেশি প্রশ্নবিদ্ধ ও রহস্যজনক করে তুলেছে।

এই তীব্র জনরোষ ও কেলেঙ্কারির মুখে সংশ্লিষ্ট ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান এবং চাঁদপুর পৌরসভার প্রকৌশল বিভাগের ভূমিকা সম্পূর্ণ দায়সারা ও রহস্যজনক বলে মনে করছেন স্থানীয়রা। ঢাকনাটিতে ২০২৫ সাল খোদাই করা থাকার সুবাদে এটি প্রমাণিত হয় যে, এক বছর পূর্ণ হওয়ার আগেই পণ্যটি ব্যবহারের অযোগ্য হয়ে পড়েছে এবং এর পেছনে যে নির্মাণসামগ্রীর গুণগত মানের মারাত্মক ঘাটতি ছিল, তা অস্বীকার করার কোনো উপায় নেই। তবে পৌর কর্তৃপক্ষের দায়িত্বশীল কোনো কর্মকর্তা এখনো পর্যন্ত এই নিম্নমানের কাজের দায় স্বীকার করে সুনির্দিষ্ট কোনো প্রশাসনিক পদক্ষেপ বা তদন্ত কমিটি গঠন করেননি। বরং এ ধরনের ঘটনা ঘটলে তাৎক্ষণিকভাবে কার্যাদেশ, প্রাক্কলন, ম্যানহোলের স্পেসিফিকেশন, ওজনের পরিমাপ বই এবং বিল-ভাউচারের নথিপত্র পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে খতিয়ে দেখার কথা থাকলেও সংশ্লিষ্ট বিভাগ নিরবতা বজায় রেখেছে। স্থানীয় সচেতন নাগরিক সমাজের পক্ষ থেকে অবিলম্বে এই কাজের সাথে জড়িত প্রতিটি স্তরের অনিয়ম তদন্তের দাবি জানানো হয়েছে, যাতে কেবল নতুন ঢাকনা বসিয়ে সাময়িক প্রলেপ দেওয়ার সংস্কৃতি চিরতরে বন্ধ হয়। একই সাথে, সরকারি অর্থের এই অপচয় রোধ করতে এবং ঠিকাদারের জামানতের টাকা বাজোপ্ত করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা করার দাবি জোরালো হচ্ছে, যাতে ভবিষ্যতে আর কোনো ঠিকাদার সাধারণ মানুষের জীবন নিয়ে ছিনিমিনি খেলার সাহস না পায়।

একটি মাত্র ম্যানহোলের ঢাকনা ভেঙে যাওয়ার এই ঘটনাটি সামগ্রিকভাবে চাঁদপুর পৌরসভার নাগরিক সেবা, অভ্যন্তরীণ জবাবদিহিতা এবং অবকাঠামোগত উন্নয়নের দীর্ঘমেয়াদী স্থায়িত্বের ওপর বড় ধরনের নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। যদি এই ছোট অনিয়মের সুষ্ঠু তদন্ত ও বিচার না হয়, তবে ঠিকাদার ও অসাধু কর্মকর্তাদের সিন্ডিকেট আরও বেশি বেপরোয়া হয়ে উঠবে এবং শহরের অন্যান্য উন্নয়ন প্রকল্পগুলোও অচিরেই বেহাল দশায় পরিণত হবে। সাধারণ মানুষের করের টাকায় নির্মিত এসব অবকাঠামো যদি এক বছরের মধ্যে ধসে পড়তে থাকে, তবে স্মার্ট ও টেকসই শহর গড়ার সমস্ত রূপরেখাই কেবল কাগজে-কলমে সীমাবদ্ধ থাকবে। তাই সময় এসেছে কঠোর প্রশাসনিক নজরদারি বাড়ানোর, প্রতিটি উন্নয়ন কাজের থার্ড-পার্টি ভ্যালিডেশন নিশ্চিত করার এবং অনিয়মের সাথে জড়িতদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করার। অন্যথায়, চাঁদপুরবাসীর এই দুর্ভোগ কেবল বাড়তেই থাকবে এবং জনস্বার্থের চরম অবমূল্যায়ন করে পৌর অবকাঠামোর ভঙ্গুর রূপটিই শেষ পর্যন্ত স্থায়ী বাস্তবতায় রূপ নেবে।

نظری یافت نشد


News Card Generator