চাঁদপুর সদর হাসপাতালের পাশে অবস্থিত ইনসাফ ডায়াগনস্টিক সেন্টারের দেওয়া রক্ত পরীক্ষার একটি ভুল রিপোর্টকে কেন্দ্র করে সম্প্রতি এক রোগীর পরিবারকে চরম হয়রানি ও মানসিক সংকটের মুখোমুখি হতে হয়েছে। রোগীর স্বজন ইকবাল হোসেনের অভিযোগ অনুযায়ী, তার বাবার রক্তে হিমোগ্লোবিনের মাত্রা মাত্র ৬ গ্রাম/ডেসিলিটার দেখানো হয়, যা একজন সুস্থ মানুষের ক্ষেত্রে তীব্র রক্তশূন্যতার লক্ষণ হিসেবে বিবেচিত। এই রিপোর্টের ওপর ভিত্তি করে চিকিৎসকরা রোগীকে দ্রুত হাসপাতালে ভর্তি করা এবং তিন ব্যাগ রক্ত সংগ্রহের জরুরি পরামর্শ দেন। অথচ পরবর্তীতে অন্য একটি প্রতিষ্ঠানে একই রোগীর রক্ত পুনরায় পরীক্ষা করানো হলে হিমোগ্লোবিন স্বাভাবিক মাত্রায় পাওয়া যায়। এই অসামঞ্জস্যপূর্ণ ফলাফলের কারণে কেবল একটি পরিবারকেই তিন দিন ধরে হাসপাতালে দৌড়ঝাঁপ ও অহেতুক আতঙ্ক সহ্য করতে হয়নি, বরং এটি স্থানীয় বেসরকারি ডায়াগনস্টিক সেন্টারগুলোর ল্যাবরেটরি মান নিয়ন্ত্রণ এবং চিকিৎসাসেবার নির্ভরযোগ্যতাকে সরাসরি কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়েছে। একটি ভুল রিপোর্টের ভিত্তিতে চিকিৎসকের ভুল সিদ্ধান্তের ঝুঁকিতে পড়া এবং রোগীর জীবন নিয়ে এমন উদাসীনতা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না বলে মনে করছেন সচেতন মহল।
ভুক্তভোগী পরিবারের এই ভোগান্তির পেছনে ডায়াগনস্টিক সেন্টারের যান্ত্রিক ত্রুটি, অদক্ষ জনবল এবং মানহীন পরীক্ষার প্রক্রিয়া চরমভাবে দায়ী বলে প্রতীয়মান হয়। ইকবাল হোসেন জানান, প্রথম রিপোর্ট হাতে পাওয়ার পর তার বাবা নিজেও তীব্র মানসিক আতঙ্কে ভেঙে পড়েন, কারণ জরুরি ভিত্তিতে রক্ত জোগাড় করা এবং হাসপাতালের সিট পাওয়ার লড়াইয়ে পুরো পরিবারটি দিশেহারা হয়ে পড়েছিল। চিকিৎসকের পর্যবেক্ষণে সন্দেহ না জাগলে হয়তো ওই রোগীকে অপ্রয়োজনীয়ভাবে রক্ত সঞ্চালন বা ভুল চিকিৎসার শিকার হতে হতো। এই ঘটনার পর প্রথম রিপোর্টের নিচে স্বাক্ষরকারী ডা. আসিবুল ইসলামের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি জানান যে তিনি সরাসরি রিপোর্ট তৈরির সাথে যুক্ত নন, তার স্বাক্ষর কেবল অনুমোদনের অংশ। চিকিৎসকের এই দায়িত্বহীন বক্তব্য ল্যাবরেটরি রিপোর্ট অনুমোদনের প্রচলিত ত্রুটিপূর্ণ কাঠামোরই বহিঃপ্রকাশ। যেখানে একজন চিকিৎসকের নাম ও স্বাক্ষর ব্যবহার করে দায় সারা হয়, অথচ পরীক্ষার বিশুদ্ধতা যাচাইয়ের কোনো কার্যকর অভ্যন্তরীণ ব্যবস্থাপনা থাকে না। ভুক্তভোগীদের মতে, এই ধরনের অনিয়মের কারণে সাধারণ মানুষ প্রতিনিয়ত প্রতারিত হচ্ছেন এবং আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পাশাপাশি মারাত্মক স্বাস্থ্যঝুঁকির মধ্যে পড়ছেন।
এই গুরুতর অভিযোগের বিষয়ে ইনসাফ ডায়াগনস্টিক সেন্টার কর্তৃপক্ষের সাথে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাদের পক্ষ থেকে কোনো সদুত্তর বা তাৎক্ষণিক ব্যাখ্যা পাওয়া যায়নি, এমনকি তাদের হটলাইনেও কোনো সাড়া মেলেনি। একটি চিকিৎসাসেবা প্রদানকারী প্রতিষ্ঠানে এ ধরনের অসচ্ছতা ও দায়িত্বজ্ঞানহীনতা জনস্বাস্থ্য সুরক্ষার নিয়মনীতির পরিপন্থী। অথচ চাঁদপুর শহরে যত্রতত্র গড়ে ওঠা এসব বেসরকারি ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারের ওপর স্থানীয় স্বাস্থ্য বিভাগের নিয়মিত মনিটরিং বা নজরদারি না থাকায় তারা সাধারণ মানুষের জীবন নিয়ে এভাবে ছিনিমিনি খেলার সুযোগ পাচ্ছে। ল্যাবরেটরির যন্ত্রপাতি সঠিক তাপমাত্রায় ও মানসম্মত উপায়ে পরিচালিত হচ্ছে কি না, কিংবা সেখানে নিয়োজিত টেকনিশিয়ানরা যথাযথ যোগ্যতাসম্পন্ন কি না, তা খতিয়ে দেখার সময় এসেছে। সংশ্লিষ্ট স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষ যদি দ্রুত এই ইনসাফ ডায়াগনস্টিক সেন্টারের কার্যক্রমের ওপর ফরেনসিক বা ল্যাবরেটরি অডিট পরিচালনা না করে, তবে এ ধরনের ভুল রিপোর্টের শিকার হয়ে সাধারণ রোগীরা যেকোনো সময় বড় ধরনের বিপদের মুখে পড়তে পারেন।
পরিশেষে, একটি রক্ত পরীক্ষার ভুল রিপোর্ট কীভাবে একটি পরিবারের তিন দিন কেড়ে নিতে পারে এবং তাদের মানসিক শান্তি ধ্বংস করতে পারে, এই ঘটনা তার একটি সুস্পষ্ট ও উদ্বেগজনক উদাহরণ। এই ধরনের ভুলের পেছনে লুকিয়ে থাকা কারিগরি ত্রুটি কিংবা ইচ্ছাকৃত অবহেলার সুনির্দিষ্ট কারণ উদ্ঘাটন করা অত্যন্ত জরুরি। শুধু একটি পরিবারের অভিযোগের ভিত্তিতে নয়, বরং সার্বিক জনস্বাস্থ্যের স্বার্থে প্রতিটি ডায়াগনস্টিক সেন্টারের লাইসেন্স, পরীক্ষার মান এবং প্যাথলজিক্যাল রিপোর্ট প্রদানের জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে হবে। যদি এই অভিযোগের সত্যতা প্রমাণিত হয়, তবে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে কঠোর প্রশাসনিক ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে, যাতে ভবিষ্যতে কোনো ল্যাবরেটরি সাধারণ মানুষের জীবন ও স্বাস্থ্য নিয়ে ছিনিমিনি খেলার সাহস না পায়। অন্যথায়, স্বাস্থ্য খাতের ওপর মানুষের হারানো আস্থা ফিরিয়ে আনা কোনোভাবেই সম্ভব হবে না।