চাঁদপুর পৌরসভার ৭ নম্বর ওয়ার্ডের একটি পরিত্যক্ত রেলওয়ে সম্পত্তি দীর্ঘদিন ধরে ঝোপঝাড়, আগাছা আর ময়লা-আবর্জনার ভাগাড়ে পরিণত হয়ে পড়েছিল, যা গত ১৪ সেপ্টেম্বর সকাল ৯টায় স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন ‘ক্লিন চাঁদপুরের’ প্রায় ৩০ সদস্যের একটি টিমের দীর্ঘ প্রচেষ্টায় সম্পূর্ণ রূপান্তরিত হয়েছে। সংগঠনের প্রতিষ্ঠাতা অ্যাডভোকেট নুরুল আমিন খান আকাশের নেতৃত্বে পরিচালিত এই ঝটিকা পরিচ্ছন্নতা অভিযানে ওই এলাকার দীর্ঘদিনের পুঞ্জীভূত জঙ্গল ও বর্জ্য অপসারণ করে জায়গাটিকে শিশু-কিশোরদের খেলাধুলার উপযোগী এক নতুন উন্মুক্ত প্রান্তরে পরিণত করা হয়েছে। মূলত কী ঘটেছে, কেন এই জঙ্গলটি বিপজ্জনক হয়ে উঠেছিল এবং কীভাবে স্বেচ্ছাসেবী তরুণরা মিলে এটিকে খেলার মাঠে রূপ দিলেন—তারই এক অনন্য নজির স্থাপন করেছে এই উদ্যোগ। স্থানীয় পর্যায়ে সরকারি অব্যবহৃত সম্পত্তির সঠিক তদারকি না থাকার কারণে কীভাবে একটি জনপদ ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে ওঠে, এই ঘটনার মধ্য দিয়ে সেই চিত্রই অত্যন্ত স্পষ্টভাবে উন্মোচিত হয়েছে এবং সাধারণ মানুষের দীর্ঘদিনের পুঞ্জীভূত ক্ষোভের বিস্ফোরণ ঘটেছে।
স্থানীয় বাসিন্দাদের দীর্ঘদিনের অভিযোগ ছিল যে, রক্ষণাবেক্ষণের চরম অভাবে রেলওয়ের এই জায়গাটি সমাজবিরোধীদের দখলে চলে গিয়েছিল এবং সেখানে নিয়মিত মাদকসেবী ও জুয়াড়িদের অভয়ারণ্য গড়ে উঠেছিল। সন্ধ্যার পর ওই নির্জন এলাকায় সাধারণ পথচারীদের চলাচল করাও দুরূহ হয়ে পড়েছিল, বিশেষ করে নারী ও শিশুদের নিরাপত্তা নিয়ে অভিভাবকরা সবসময় চরম উৎকণ্ঠায় দিন কাটাতেন। ভুক্তভোগী এলাকাবাসীর প্রত্যক্ষ বক্তব্য অনুযায়ী, সরকারি সম্পত্তি বছরের পর বছর এভাবে অবহেলায় ফেলে রাখার কারণে অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের একটি নিরাপদ জোনে পরিণত হয়েছিল জায়গাটি, অথচ স্থানীয় প্রশাসন বা দায়িত্বশীল কোনো কর্তৃপক্ষ সময়মতো কোনো কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করেনি। সমাজের এই অবক্ষয় ও নিরাপত্তার ঘাটতির সুযোগ নিয়ে যখন কিশোর গ্যাং বা অপরাধীরা মাথাচাড়া দিয়ে উঠছিল, ঠিক সেই মুহূর্তে সাধারণ মানুষের ভোগান্তির অবসান ঘটাতে এগিয়ে আসে স্থানীয় সচেতন যুবসমাজ। ভুক্তভোগীদের এই দীর্ঘশ্বাস ও যন্ত্রণার অবসান ঘটিয়ে জায়গাটিকে জনকল্যাণমুখী ব্যবহারের আওতায় আনার মাধ্যমে স্থানীয় বাসিন্দারা সাময়িকভাবে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেললেও মূল সমস্যা সমাধানে দীর্ঘমেয়াদি কাঠামোগত প্রশ্ন থেকেই গেছে।
এই পুরো ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ ও রেলওয়ে প্রশাসনের ভূমিকা নিয়ে তীব্র সমালোচনার ঝড় উঠেছে, কারণ জনসাধারণের নিরাপত্তা এবং সরকারি সম্পত্তির রক্ষণাবেক্ষণের প্রাথমিক দায়িত্ব যাদের ওপর ন্যস্ত, তারা চরম উদাসীনতার পরিচয় দিয়ে আসছে। ‘ক্লিন চাঁদপুর’-এর প্রতিষ্ঠাতা অ্যাডভোকেট নুরুল আমিন খান আকাশ স্পষ্টভাষায় জানিয়েছেন যে, তাদের এই উদ্যোগ কেবল একদিনের ময়লা পরিষ্কার করার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, বরং শিশু-কিশোরদের জন্য একটি নিরাপদ ও স্বাস্থ্যকর বিনোদন পরিবেশ নিশ্চিত করাই তাদের মূল লক্ষ্য এবং অচিরেই তারা সেখানে খেলাধুলার সামগ্রীও সরবরাহ করবেন। তবে স্থানীয় সচেতন মহলের প্রশ্ন হলো, স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনের এই মহৎ উদ্যোগের পর কি সংশ্লিষ্ট রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ ও পৌর প্রশাসন তাদের ঘুমে আচ্ছন্ন দাপ্তরিক প্রক্রিয়া ভেঙে জেগে উঠবে? নাকি এই মাঠটি আবার ভবিষ্যতে কোনো প্রভাবশালী বা অপরাধীদের দখলে চলে যাবে—সেই শঙ্কা কাটানোর জন্য প্রশাসনের পক্ষ থেকে জোরালো নজরদারি ও স্থায়ী সমাধানের দাবি জোরালো হচ্ছে। স্থানীয়দের জোরালো দাবি হলো, কেবল তরুণদের স্বেচ্ছা শ্রমের ওপর নির্ভর করে না থেকে বরং পৌরসভা এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে সমন্বিতভাবে এই মাঠে শিশু-কিশোরদের অবাধ ও নিরাপদ বিচরণ নিশ্চিত করতে হবে।
পরিত্যক্ত একটি জঙ্গলকে খেলার মাঠে রূপান্তর করার এই সফল ঘটনাটি চাঁদপুর শহরের সামগ্রিক সামাজিক পরিসরে একটি সুদূরপ্রসারী ও ইতিবাচক প্রভাব ফেলতে শুরু করেছে, যা অন্যান্য এলাকার অবহেলিত স্থানগুলোকেও পুনরুদ্ধারের নতুন দিগন্ত উন্মোচন করে দিচ্ছে। এই ঘটনার মধ্য দিয়ে প্রমাণিত হয়েছে যে, প্রশাসনিক স্থবিরতা ও উদাসীনতার বিরুদ্ধে স্থানীয় যুবসমাজ ঐক্যবদ্ধ হলে কত বড় সামাজিক সমস্যার তাৎক্ষণিক সমাধান করা সম্ভব, যা ভবিষ্যতে অন্যান্য স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনগুলোকেও দারুণভাবে অনুপ্রাণিত করবে। তবে এই অর্জিত বিজয়কে স্থায়ী রূপ দিতে হলে কেবল মাঠ পরিষ্কার করাই যথেষ্ট নয়, বরং শহরের প্রতিটি পরিত্যক্ত সরকারি সম্পত্তির রক্ষণাবেক্ষণে একটি স্থায়ী মনিটরিং সেল গঠন করা অত্যন্ত জরুরি হয়ে পড়েছে। আগামী দিনে যদি এই খেলার মাঠের স্থায়ী নিরাপত্তা ও রক্ষণাবেক্ষণ নিশ্চিত করা না যায়, তবে এই মহৎ উদ্যোগের সুফল দীর্ঘস্থায়ী হবে না এবং সাধারণ মানুষের এই সাময়িক স্বস্তিও ম্লান হয়ে যাওয়ার ঝুঁকি থেকে যাবে। তাই চাঁদপুরের এই ব্যতিক্রমী ও সাহসী উদ্যোগের চূড়ান্ত সার্থকতা নির্ভর করছে রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ, পৌর প্রশাসন এবং স্থানীয় সচেতন মহলের সম্মিলিত ও ধারাবাহিক নজরদারির ওপর, যা শহরটিকে আরও বাসযোগ্য ও নিরাপদ করে তোলার ক্ষেত্রে একটি মাইলফলক হয়ে থাকবে।