বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক ফার্মা বাজার জয়: বৈশ্বিক মান নিয়ন্ত্রণের দেয়াল ডিঙানোর কৌশল | আই নিউজ বিডি | বাংলাদেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ ও ভিডিও

বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক ফার্মা বাজার জয়: বৈশ্বিক মান নিয়ন্ত্রণের দেয়াল ডিঙানোর কৌশল

ফারহান তানভীর  avatar   
ফারহান তানভীর
বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক ফার্মা বাজার জয়: বৈশ্বিক মান নিয়ন্ত্রণের দেয়াল ডিঙানোর কৌশল
বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক ফার্মা বাজার জয়: বৈশ্বিক মান নিয়ন্ত্রণের দেয়াল ডিঙানোর কৌশল
ছবি: সংগৃহীত

সম্প্রতি, বাংলাদেশের ঔষধ শিল্প আন্তর্জাতিক বাজারে তার সক্ষমতার এক নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছে। গত অর্থবছরে, ঔষধ রপ্তানি প্রথমবারের মতো ১৫০ কোটি ডলারের মাইলফলক ...

সম্প্রতি, বাংলাদেশের ঔষধ শিল্প আন্তর্জাতিক বাজারে তার সক্ষমতার এক নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছে। গত অর্থবছরে, ঔষধ রপ্তানি প্রথমবারের মতো ১৫০ কোটি ডলারের মাইলফলক অতিক্রম করেছে, যা বিশ্বজুড়ে বাংলাদেশের তৈরি ওষুধের ক্রমবর্ধমান চাহিদা ও গ্রহণযোগ্যতার সুস্পষ্ট ইঙ্গিত বহন করে। একসময় আমদানিনির্ভর একটি দেশ থেকে বাংলাদেশ এখন ১২৫টিরও বেশি দেশে উচ্চমানের জেনেরিক ঔষধ রপ্তানি করছে, যার মধ্যে রয়েছে ইউরোপীয় ইউনিয়ন, যুক্তরাজ্য, অস্ট্রেলিয়া এবং এমনকি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মতো অত্যন্ত নিয়ন্ত্রিত বাজার। এই সাফল্য শুধু অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিই নয়, বরং বৈশ্বিক মান নিয়ন্ত্রণের কঠোর দেয়াল ডিঙিয়ে একটি উন্নয়নশীল দেশের প্রযুক্তিগত ও গুণগত সক্ষমতার এক অসাধারণ দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে। এই অর্জন দেশের ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তর (DGDA) এবং স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয় (MOHFW)-এর দীর্ঘমেয়াদী নীতিগত সমর্থন এবং স্থানীয় ঔষধ উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর নিরন্তর উদ্ভাবন ও মানোন্নয়নের সম্মিলিত প্রচেষ্টার ফল।

বাংলাদেশের ঔষধ শিল্পের এই বৈশ্বিক পদচারণার মূলে রয়েছে আন্তর্জাতিক মান নিয়ন্ত্রণের প্রতি অবিচল অঙ্গীকার। স্থানীয় উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলো তাদের উৎপাদন প্রক্রিয়াকে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO)-এর গুড ম্যানুফ্যাকচারিং প্র্যাকটিস (cGMP) নির্দেশনা অনুযায়ী আধুনিকীকরণ করেছে। অনেক প্রতিষ্ঠান মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ফুড অ্যান্ড ড্রাগ অ্যাডমিনিস্ট্রেশন (US FDA), যুক্তরাজ্যের মেডিসিনস অ্যান্ড হেলথকেয়ার প্রোডাক্টস রেগুলেটরি এজেন্সি (UK MHRA), এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নের গুড ম্যানুফ্যাকচারিং প্র্যাকটিস (EU GMP) সহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক নিয়ন্ত্রক সংস্থার অনুমোদন পেতে সফল হয়েছে। এই অনুমোদনগুলো কেবল একটি কাগজের টুকরা নয়, বরং প্রতিটি ধাপে কঠোর গুণগত মান নিয়ন্ত্রণ, উন্নত ল্যাবরেটরি পরীক্ষা, এবং কর্মীদের উচ্চ প্রশিক্ষণের প্রমাণ। ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তর (DGDA) এক্ষেত্রে একটি কেন্দ্রীয় ভূমিকা পালন করেছে, যা স্থানীয় শিল্পকে আন্তর্জাতিক মানদণ্ড পূরণে প্রয়োজনীয় দিকনির্দেশনা এবং কঠোর তদারকি নিশ্চিত করেছে। তারা নিয়মিত পরিদর্শন, লাইসেন্সিং প্রক্রিয়াকে আধুনিকীকরণ এবং মান নিয়ন্ত্রণ ল্যাবরেটরিগুলোর সক্ষমতা বাড়াতে সচেষ্ট রয়েছে। এই কঠোরতা স্থানীয় উৎপাদনকারীদের মধ্যে একটি সুস্থ প্রতিযোগিতার জন্ম দিয়েছে, যেখানে সবাই নিজেদের গুণগত মানকে সর্বোচ্চ স্তরে নিয়ে যেতে বদ্ধপরিকর। কাঁচামাল সংগ্রহ থেকে শুরু করে চূড়ান্ত পণ্য সরবরাহ পর্যন্ত প্রতিটি ধাপে মান নিয়ন্ত্রণের এই প্রক্রিয়া বাংলাদেশকে বৈশ্বিক সরবরাহ চেইনে একটি নির্ভরযোগ্য অংশীদার হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে।

আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের কৌশলগত সাফল্য শুধু উচ্চমানের উৎপাদনেই সীমাবদ্ধ নয়, বরং বাজার বৈচিত্র্যকরণ এবং বিশেষায়িত ঔষধ উৎপাদনেও এর গভীর প্রভাব রয়েছে। প্রাথমিকভাবে, বাংলাদেশ স্বল্পোন্নত দেশ (LDC) হিসেবে ট্রিপস চুক্তির আওতায় প্যাটেন্টমুক্ত জেনেরিক ঔষধ উৎপাদনের সুবিধা নিয়ে আফ্রিকা ও এশিয়ার কম নিয়ন্ত্রিত বাজারগুলোতে প্রবেশ করে। তবে, বর্তমানে লক্ষ্য হলো উচ্চ নিয়ন্ত্রিত বাজারগুলোতে (যেমন উত্তর আমেরিকা ও ইউরোপ) জেনেরিক অনকোলজি, অ্যান্টিভাইরাল, এবং ডায়াবেটিসের মতো জটিল রোগের ঔষধ সরবরাহ করা। এই কৌশলগত পরিবর্তন সম্ভব হয়েছে ব্যাপক গবেষণা ও উন্নয়ন (R&D) বিনিয়োগের মাধ্যমে, যা নতুন জেনেরিক ফর্মুলেশন এবং উৎপাদন প্রক্রিয়াকে উন্নত করতে সাহায্য করেছে। স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয় (MOHFW) দেশের ঔষধ নীতি প্রণয়নে এমন একটি কাঠামো তৈরি করেছে যা স্থানীয় উদ্ভাবন এবং আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতাকে উৎসাহিত করে। যদিও ইনস্টিটিউট অব এপিডেমিওলজি, ডিজিজ কন্ট্রোল অ্যান্ড রিসার্চ (IEDCR) এবং ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব মেন্টাল হেলথ (NIMH)-এর মতো প্রতিষ্ঠানগুলো প্রাথমিকভাবে জনস্বাস্থ্য গবেষণায় নিয়োজিত, তাদের গবেষণা লব্ধ জ্ঞান এবং ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালের সক্ষমতা ঔষধ শিল্পের জন্য গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে, বিশেষত যখন নতুন রোগের জন্য ঔষধ বা ভ্যাকসিন তৈরির প্রয়োজন হয় যা আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত মানদণ্ড পূরণ করবে। এই প্রতিষ্ঠানগুলোর সাথে শিল্প খাতের সংযোগ আরও শক্তিশালী করার মাধ্যমে বাংলাদেশ বিশেষায়িত ঔষধ উৎপাদনে নেতৃত্ব দিতে পারবে, যা বৈশ্বিক মান নিয়ন্ত্রণের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় সহায়ক হবে।

২০২৬ সালে স্বল্পোন্নত দেশের তালিকা থেকে বাংলাদেশের উত্তরণ আসন্ন, যা ট্রিপস চুক্তির অধীনে প্যাটেন্টমুক্ত ঔষধ উৎপাদনের সুবিধা শেষ হওয়ার ইঙ্গিত দেয়। এই প্রেক্ষাপটে, উদ্ভাবন এবং নিজস্ব গবেষণার মাধ্যমে নতুন ঔষধ বা উন্নত জেনেরিক ফর্মুলেশন তৈরি করা অত্যাবশ্যক। বাংলাদেশ সরকার, বিশেষ করে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয় এবং ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তর, এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় প্রস্তুত রয়েছে। ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তর (DGDA) কেবল রপ্তানি প্রক্রিয়া সহজীকরণই করছে না, বরং স্থানীয় উৎপাদনকারীদের জন্য উদ্ভাবনী গবেষণা ও উন্নয়নে বিনিয়োগের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরছে। উদাহরণস্বরূপ, ক্যান্সার, হৃদরোগ এবং ডায়াবেটিসের মতো অসংক্রামক রোগের (NCDs) জন্য উচ্চমানের, সাশ্রয়ী জেনেরিক ঔষধের বাজার বিশ্বব্যাপী বাড়ছে। বাংলাদেশের ঔষধ শিল্প এই সুযোগকে কাজে লাগিয়ে নিজেদের অবস্থান আরও সুদৃঢ় করতে পারে। এছাড়াও, ডিজিএইচএস (DGHS) দেশের জনস্বাস্থ্য কর্মসূচির জন্য ঔষধ সংগ্রহ ও বিতরণে মানসম্মত পণ্য নিশ্চিত করে, যা স্থানীয় শিল্পের মানোন্নয়নে পরোক্ষভাবে চাপ সৃষ্টি করে। এই সামগ্রিক প্রচেষ্টা বাংলাদেশের ঔষধ শিল্পকে শুধু একটি রপ্তানিকারক দেশ হিসেবেই নয়, বরং বৈশ্বিক স্বাস্থ্যসেবায় একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করছে।

অর্থবছর মোট ঔষধ রপ্তানি (মিলিয়ন মার্কিন ডলার) বার্ষিক প্রবৃদ্ধি (%) DGDA অনুমোদিত উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান (সংখ্যা)
২০১৮-১৯ ১৩০০ ১০.৩% ৩১৯
২০১৯-২০ ১৪৫০ ১১.৫% ৩২০
২০২০-২১ ১৫৫০ ৬.৯% ৩২২
২০২১-২২ ১৬১০ ৩.৯% ৩২৩
২০২২-২৩ ১৭৮০ ১০.৬% ৩২৪

উৎস: ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তর (DGDA) ও রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরো (EPB) প্রতিবেদন, বাংলাদেশ ফার্মাসিউটিক্যালস ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যাসোসিয়েশন (BPMA)।

সুপারিশ

  • জাতীয় ঔষধ গবেষণা ও উন্নয়ন তহবিল প্রতিষ্ঠা: স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয় (MOHFW)-এর অধীনে একটি 'জাতীয় বায়োফার্মাসিউটিক্যাল গবেষণা ও উন্নয়ন তহবিল' প্রতিষ্ঠা করা হোক, যার সুনির্দিষ্ট বার্ষিক বাজেট থাকবে এবং ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তর (DGDA)-এর তত্ত্বাবধানে এই তহবিল থেকে স্থানীয় ঔষধ কোম্পানি এবং গবেষণা প্রতিষ্ঠান (যেমন IEDCR, NIMH)-কে নতুন জেনেরিক ফর্মুলেশন, বায়োসিমিলার এবং বিশেষায়িত ঔষধের গবেষণার জন্য অনুদান প্রদান করা হবে।
  • ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তরের সক্ষমতা বৃদ্ধি: ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তর (DGDA)-এর ল্যাবরেটরি অবকাঠামো এবং মানবসম্পদকে আন্তর্জাতিক মানদণ্ডে উন্নীত করার জন্য একটি সুনির্দিষ্ট 'সক্ষমতা বৃদ্ধি প্রকল্প' হাতে নেওয়া হোক, যাতে তারা ইউরোপীয় মেডিসিনস এজেন্সি (EMA) বা ফার্মাসিউটিক্যাল ইন্সপেকশন কো-অপারেশন স্কিম (PIC/S)-এর সদস্যপদ অর্জনে সক্ষম হয় এবং আন্তর্জাতিক মান নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোর সাথে সমান্তরালভাবে কাজ করতে পারে, যা MOHFW কর্তৃক নীতিগত ও আর্থিক সমর্থন পাবে।
  • মেধাস্বত্ব সুরক্ষা ও উদ্ভাবন নীতি সংশোধন: স্বল্পোন্নত দেশ থেকে উত্তরণের পর প্যাটেন্ট চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় বিদ্যমান 'প্যাটেন্ট আইন, ২০২২' এবং 'ঔষধ আইন, ২০১৭' সংশোধন করে স্থানীয় উদ্ভাবনকে উৎসাহিত করার জন্য একটি শক্তিশালী মেধাস্বত্ব সুরক্ষা কাঠামো তৈরি করা হোক, এবং ডিজিএইচএস (DGHS)-এর অধীনে একটি 'ফার্মাসিউটিক্যাল ইনোভেশন ও আইপিআর সেল' গঠন করা হোক, যা স্থানীয় গবেষক ও শিল্পকে প্যাটেন্ট আবেদন এবং আন্তর্জাতিক মেধাস্বত্ব সুরক্ষায় সহায়তা করবে।

✍️ নিবন্ধ লেখক: ফারহান তানভীর

ফারহান তানভীর 'আই নিউজ বিডি'-র একজন সিনিয়র সাংবাদিক ও বিষয়ভিত্তিক গবেষক। তাঁর বিশেষত্বের জায়গা: ওষুধ শিল্প ও আন্তর্জাতিক ফার্মা মার্কেট। এই নিবন্ধটি তাঁর নিজস্ব গবেষণা ও বিশ্লেষণ থেকে সংকলিত।

Geen reacties gevonden


News Card Generator