তিস্তার গোপন দলিল: জলবণ্টন চুক্তির আড়ালে আঞ্চলিক ক্ষমতার খেলা | আই নিউজ বিডি | বাংলাদেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ ও ভিডিও

তিস্তার গোপন দলিল: জলবণ্টন চুক্তির আড়ালে আঞ্চলিক ক্ষমতার খেলা

শাহেদ করিম  avatar   
শাহেদ করিম
তিস্তার গোপন দলিল: জলবণ্টন চুক্তির আড়ালে আঞ্চলিক ক্ষমতার খেলা
তিস্তার গোপন দলিল: জলবণ্টন চুক্তির আড়ালে আঞ্চলিক ক্ষমতার খেলা
ছবি: সংগৃহীত

সম্প্রতি, বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে তিস্তা নদীর জলবণ্টন চুক্তি নিয়ে ভারতের সঙ্গে চলমান আলোচনার অগ্রগতি নিয়ে যে বিবৃতি এসেছে, তা কেবল একটি দ্বিপ...

সম্প্রতি, বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে তিস্তা নদীর জলবণ্টন চুক্তি নিয়ে ভারতের সঙ্গে চলমান আলোচনার অগ্রগতি নিয়ে যে বিবৃতি এসেছে, তা কেবল একটি দ্বিপাক্ষিক বিষয় নয়, বরং দক্ষিণ এশীয় ভূ-রাজনীতির এক জটিল চিত্র তুলে ধরে। এই বিবৃতি আবারও মনে করিয়ে দিয়েছে যে, অর্ধ শতাব্দীরও বেশি সময় ধরে ঝুলে থাকা তিস্তার ভাগ্য নির্ধারণ শুধু জলবিজ্ঞানের সমীকরণ নয়, এটি আঞ্চলিক ক্ষমতার ভারসাম্য, বিশ্বাস ও অবিশ্বাসের এক সূক্ষ্ম খেলা। বিশেষ করে, যখন চীন বাংলাদেশের তিস্তা মহাপরিকল্পনায় বিনিয়োগের আগ্রহ দেখাচ্ছে, তখন এই জলবণ্টন ইস্যুটি কেবল ভারত-বাংলাদেশের দ্বিপাক্ষিক বিষয় না থেকে একটি বহুমাত্রিক ভূ-রাজনৈতিক প্রতিযোগিতার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে।

তিস্তার জলবণ্টন চুক্তিটি শুরু থেকেই ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে আস্থা ও সহযোগিতার প্রতীক হতে পারতো, কিন্তু পশ্চিমবঙ্গের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি এবং ভারতের বৃহত্তর আঞ্চলিক নিরাপত্তা কৌশলের কারণে এটি বারবার আটকে গেছে। বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলের কৃষি অর্থনীতি তিস্তার জলের উপর প্রবলভাবে নির্ভরশীল, যা প্রায় ১০ লক্ষাধিক মানুষের জীবন-জীবিকার সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। শুষ্ক মৌসুমে তিস্তার জলপ্রবাহ কমে যাওয়ায় বাংলাদেশের কৃষিক্ষেত্রে ব্যাপক ক্ষতি হয়, যা খাদ্য নিরাপত্তা এবং গ্রামীণ অর্থনীতিতে সরাসরি প্রভাব ফেলে। অন্যদিকে, ভারতের পশ্চিমবঙ্গের কৃষকদের স্বার্থ এবং রাজ্য সরকারের রাজনৈতিক সংবেদনশীলতা দিল্লির কেন্দ্রীয় সরকারকে একটি চুক্তি স্বাক্ষরে প্রতিবন্ধকতা তৈরি করেছে। এই দীর্ঘসূত্রিতা আঞ্চলিক স্থিতিশীলতাকে প্রভাবিত করছে এবং বাংলাদেশের জনমনে ভারতের প্রতি এক ধরনের অবিশ্বাস তৈরি করছে, যা চীনের মতো প্রতিদ্বন্দ্বী শক্তির জন্য এই অঞ্চলে প্রভাব বিস্তারের সুযোগ তৈরি করছে।

আঞ্চলিক ভূ-রাজনীতির প্রেক্ষাপটে, তিস্তার এই অচলাবস্থা সার্ক (SAARC) এবং বিমসটেক (BIMSTEC)-এর মতো আঞ্চলিক সংস্থাগুলোর কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে। সার্ক, যা কিনা দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে সহযোগিতা বৃদ্ধির লক্ষ্য নিয়ে গঠিত হয়েছিল, কাশ্মীর ইস্যু এবং ভারত-পাকিস্তান বৈরিতার কারণে প্রায় অকার্যকর। বিমসটেক, যেখানে ভারত একটি প্রধান ভূমিকা পালন করে, সেখানেও জলবণ্টনের মতো সংবেদনশীল দ্বিপাক্ষিক ইস্যুতে কোনো কার্যকর আঞ্চলিক কাঠামো গড়ে তুলতে পারেনি। এই শূন্যতাতেই চীন তার বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ (BRI) এর মাধ্যমে বাংলাদেশের মতো দেশগুলোতে অবকাঠামো খাতে বিনিয়োগের প্রস্তাব দিচ্ছে, যা কেবল অর্থনৈতিক নয়, কৌশলগতভাবেও গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় উভয় দেশের সঙ্গে ভারসাম্যপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রাখার চেষ্টা করলেও, তিস্তার মতো মৌলিক ইস্যুতে সমাধান না আসায় বাংলাদেশের আঞ্চলিক কূটনৈতিক কৌশল কিছুটা দুর্বল হয়ে পড়ছে। আঞ্চলিক শক্তি হিসেবে ভারতের ভূমিকা এবং তার প্রতিবেশীদের আস্থা অর্জনের ক্ষেত্রে তিস্তা চুক্তির ব্যর্থতা একটি বড় অন্তরায়।

এই জলবণ্টন ইস্যুটির সমাধান না হওয়ায় বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক অবস্থানও প্রভাবিত হচ্ছে। বাংলাদেশ UN Peacekeeping মিশনে বিশ্বের অন্যতম প্রধান অবদানকারী দেশ হিসেবে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে তার অবস্থান সুদৃঢ় করেছে। কিন্তু দেশের অভ্যন্তরে একটি মৌলিক নদীর জলবণ্টন নিয়ে দীর্ঘস্থায়ী অচলাবস্থা আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছে আঞ্চলিক সুশাসনের প্রশ্নে প্রশ্ন তুলতে পারে। যদিও এটি সরাসরি UN Peacekeeping কার্যক্রমে প্রভাব ফেলে না, তবে একটি দেশের সামগ্রিক কূটনৈতিক শক্তি এবং আঞ্চলিক সমস্যা সমাধানে তার সক্ষমতা আন্তর্জাতিক ফোরামে তার গ্রহণযোগ্যতাকে পরোক্ষভাবে প্রভাবিত করে। তিস্তার মতো একটি সংবেদনশীল ইস্যুতে দীর্ঘদিনের অচলাবস্থা বাংলাদেশের মতো দেশের জন্য আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক প্ল্যাটফর্মে তার দাবি জোরালোভাবে উত্থাপন করার ক্ষেত্রে কিছুটা সীমাবদ্ধতা তৈরি করে।

সূচক তথ্য বছর/সময়কাল
তিস্তার শুষ্ক মৌসুমে গড় প্রবাহ (কিউসেক) ৫,০০০-১০,০০০ ২০১৪-২০২৩ (জানুয়ারি-মে)
তিস্তা অববাহিকার কৃষি জমির পরিমাণ (বাংলাদেশ) ৭৫০,০০০ হেক্টর ২০২১
ভারত-বাংলাদেশ জলসম্পদ সচিব পর্যায়ের সভা ১৪টি (অমীমাংসিত) ২০০৪-২০২৩
BIMSTEC সদস্য রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে আন্তঃবাণিজ্য (%) মোট বাণিজ্যের ৫.৫% ২০২২
UN Peacekeeping এ বাংলাদেশের সৈন্য অবদান (মোট) ৭,৪০০+ (দ্বিতীয় সর্বোচ্চ) ২০২৩

উৎস: বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড, ভারতীয় সেচ মন্ত্রণালয়, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, UN Peacekeeping Statistics, BIMSTEC Secretariat.

সুপারিশ

  • বাংলাদেশ ও ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে একটি নির্দিষ্ট সময়সীমার মধ্যে তিস্তা চুক্তি চূড়ান্ত করার জন্য একটি উচ্চ-পর্যায়ের যৌথ কারিগরি কমিটি গঠন করতে হবে, যেখানে উভয় দেশের জলবিজ্ঞানী, অর্থনীতিবিদ ও আইন বিশেষজ্ঞদের অন্তর্ভুক্ত করে একটি টেকসই ও বাস্তবসম্মত সমাধান প্রস্তাব তৈরি করা হবে এবং প্রতি তিন মাস অন্তর অগ্রগতির প্রতিবেদন জনসম্মুখে প্রকাশ করতে হবে।
  • BIMSTEC ফোরামের আওতায় একটি আঞ্চলিক পানি সম্পদ ব্যবস্থাপনা কাঠামো (Regional Water Resource Management Framework) তৈরি করতে হবে, যেখানে সীমান্ত অতিক্রমকারী নদীগুলোর জলবণ্টন, বন্যা নিয়ন্ত্রণ এবং জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবেলায় সদস্য রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে তথ্য আদান-প্রদান ও সমন্বিত পদক্ষেপ গ্রহণের জন্য একটি সুনির্দিষ্ট নীতিমালা প্রণয়ন করা হবে, যা ভবিষ্যতে তিস্তার মতো অন্যান্য দ্বিপাক্ষিক জলবণ্টন সমস্যার সমাধানে দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে পারে।
  • বাংলাদেশ সরকারকে জাতীয় পানি সম্পদ পরিকল্পনা (National Water Resources Plan) এর অধীনে তিস্তা অববাহিকায় বিকল্প জল ব্যবস্থাপনার উপর জোর দিতে হবে, যার মধ্যে ভূগর্ভস্থ জল সংরক্ষণ, বর্ষার জল ধরে রাখার জন্য জলাধার নির্মাণ এবং আধুনিক সেচ প্রযুক্তির ব্যবহার বৃদ্ধি করার জন্য একটি নির্দিষ্ট বাজেট বরাদ্দ এবং আগামী ৫ বছরের জন্য একটি কর্মপরিকল্পনা প্রণয়ন করে বাস্তবায়নের উদ্যোগ নিতে হবে, যাতে তিস্তার জলের উপর নির্ভরশীলতা হ্রাস পায় এবং আলোচনার টেবিলে বাংলাদেশের অবস্থান আরও শক্তিশালী হয়।

✍️ নিবন্ধ লেখক: শাহেদ করিম

শাহেদ করিম 'আই নিউজ বিডি'-র একজন সিনিয়র সাংবাদিক ও বিষয়ভিত্তিক গবেষক। তাঁর বিশেষত্বের জায়গা: দক্ষিণ এশীয় ভূ-রাজনীতি। এই নিবন্ধটি তাঁর নিজস্ব গবেষণা ও বিশ্লেষণ থেকে সংকলিত।

কোন মন্তব্য পাওয়া যায়নি


News Card Generator