সম্প্রতি, আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রণালয় কর্তৃক বাস্তবায়নাধীন 'ই-জুডিশিয়ারি প্রকল্প'-এর আওতায় দেশের ৪৩টি জেলায় ভিডিও কনফারেন্সিংয়ের মাধ্যমে বিচার কার্যক্রম পরিচালনার সক্ষমতা অর্জনের ঘোষণা বিচার বিভাগের ডিজিটাল রূপান্তরের পথে একটি উল্লেখযোগ্য মাইলফলক হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। বাংলাদেশ সরকারের 'রূপকল্প ২০৪১' এবং 'ডিজিটাল বাংলাদেশ' বিনির্মাণের অঙ্গীকারের অংশ হিসেবে বিচারপ্রার্থীদের দ্রুত ও স্বচ্ছ বিচার নিশ্চিত করতে এই উদ্যোগের গুরুত্ব অনস্বীকার্য। বিশেষ করে, কোভিড-১৯ মহামারীর সময় বিচারিক কার্যক্রম স্থবিরতা থেকে মুক্তি দিতে ভার্চুয়াল কোর্ট সিস্টেমের প্রবর্তন একটি জরুরি পদক্ষেপ ছিল, যা এখন একটি স্থায়ী কাঠামোতে রূপান্তরিত হচ্ছে। এই পদক্ষেপ শুধু বিচারিক প্রক্রিয়াকে গতিশীলই করছে না, বরং বিচার ব্যবস্থার প্রতিটি স্তরে আধুনিক প্রযুক্তির সমন্বয় সাধনের এক বৃহত্তর পরিকল্পনার প্রতিফলন ঘটাচ্ছে।
বিচার বিভাগের ডিজিটাল রূপান্তরের যাত্রা শুরু হয়েছিল মূলত বিচারিক প্রক্রিয়াকে সহজ, দ্রুত এবং আরও বেশি জবাবদিহিমূলক করার লক্ষ্যে। ওয়ার্ল্ড ব্যাংক এবং এডিবি'র আর্থিক ও কারিগরি সহায়তায় বিভিন্ন সময়ে গৃহীত প্রকল্পসমূহ, যেমন 'জুডিশিয়াল স্ট্রেনদেনিং প্রজেক্ট' (JSP), এই রূপান্তরের ভিত্তি স্থাপন করেছে। সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়, সুপ্রিম কোর্ট এবং জেলা আদালতগুলোর সমন্বিত প্রচেষ্টায় ই-ফাইল সিস্টেম, ডিজিটাল কেস ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম (CMS), অনলাইন কোর্ট ফি পেমেন্ট এবং বিচারকদের জন্য অত্যাধুনিক ল্যাপটপ ও ইন্টারনেট সুবিধা প্রদানের মতো বিষয়গুলো বাস্তবায়িত হচ্ছে। উদাহরণস্বরূপ, বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট কর্তৃক প্রণীত 'ভার্চুয়াল কোর্ট অধ্যাদেশ-২০২০' পরবর্তীতে আইনে রূপান্তরিত হয়ে ভার্চুয়াল শুনানির আইনগত ভিত্তি সুদৃঢ় করেছে, যা এখন দূরবর্তী স্থান থেকে সাক্ষ্যগ্রহণ ও যুক্তিতর্কের সুযোগ তৈরি করেছে। এর ফলে বিচারপ্রার্থীদের আদালতে সশরীরে উপস্থিত হওয়ার ঝক্কি কমেছে এবং বিশেষ করে নারী, বয়স্ক ব্যক্তি ও প্রতিবন্ধী বিচারপ্রার্থীদের জন্য বিচার প্রাপ্তি সহজতর হয়েছে। তবে, দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ ও উচ্চগতির ইন্টারনেট সংযোগের অপ্রাপ্যতা এখনও এই সুবিধার পূর্ণাঙ্গ প্রসারে একটি বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে রয়ে গেছে, যার সমাধানে বাংলাদেশ সরকার নিরন্তর কাজ করে যাচ্ছে।
এই ডিজিটাল রূপান্তরের দ্বিতীয় ধাপে, ডেটা ইন্টিগ্রেশন এবং আন্তঃবিভাগীয় সংযোগের উপর বিশেষ জোর দেওয়া হচ্ছে। বিচার বিভাগের সাথে পুলিশ, কারা অধিদপ্তর এবং আইন প্রয়োগকারী অন্যান্য সংস্থার ডিজিটাল ডেটাবেসের সংযোগ স্থাপন একটি অভিন্ন প্ল্যাটফর্ম তৈরির মাধ্যমে মামলার তদন্ত, চার্জশিট দাখিল, এবং অভিযুক্তদের আদালতে উপস্থাপন প্রক্রিয়াকে আরও সুসংহত করবে। বর্তমানে, প্রায় সকল জেলা ও দায়রা জজ আদালত এবং মহানগর হাকিম আদালতগুলোকে একটি সেন্ট্রালাইজড নেটওয়ার্কের আওতায় আনার প্রচেষ্টা চলছে, যা মামলার প্রতিটি ধাপের তথ্য অনলাইনে আপলোড ও ট্র্যাক করার সুযোগ করে দেবে। ওয়ার্ল্ড ব্যাংক কর্তৃক প্রস্তাবিত 'বাংলাদেশ জাস্টিস সেক্টর ডিজিটাল ট্রান্সফরমেশন' (BJSDT) প্রকল্পের মাধ্যমে বিচারিক প্রক্রিয়াকে আরও স্বয়ংক্রিয় করার জন্য আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স (AI) এবং মেশিন লার্নিং (ML) এর মতো অত্যাধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার নিয়ে সম্ভাব্যতা যাচাই করা হচ্ছে। এর ফলে বিচারকদের জন্য পূর্ববর্তী মামলার নজির (precedents) এবং প্রাসঙ্গিক আইন খুঁজে বের করা সহজ হবে, যা বিচারিক সিদ্ধান্ত গ্রহণে সময় কমাবে এবং সামঞ্জস্যতা আনবে। তবে, এই ব্যাপক ডেটাবেসের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং ব্যক্তিগত তথ্যের সুরক্ষা বিধান করা একটি জটিল কাজ, যার জন্য বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক প্রণীত ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন-২০১৮ এর কঠোর প্রয়োগ এবং একটি শক্তিশালী ডেটা গভর্নেন্স ফ্রেমওয়ার্ক অপরিহার্য।
| সূচক | ২০২০ সাল (প্রারম্ভিক) | ২০২৩ সাল (বর্তমান) | ২০২৫ সাল (লক্ষ্যমাত্রা) |
|---|---|---|---|
| ই-ফাইল সিস্টেম চালু থাকা আদালতের সংখ্যা | ৩০ | ৩৫০ | ৫০০+ |
| ভার্চুয়াল শুনানির মাধ্যমে নিষ্পত্তি হওয়া মামলার সংখ্যা | ১,৫০,০০০ | ৮,০০,০০০+ | ১,৫০০,০০০+ |
| অনলাইন কোর্ট ফি পেমেন্টের মাধ্যমে সংগৃহীত রাজস্ব (কোটি টাকা) | ৫ | ৫০ | ১০০+ |
| বিচারক ও সহায়ক কর্মীদের ডিজিটাল প্রশিক্ষণ সম্পন্নকারীর সংখ্যা | ৫,০০০ | ২৫,০০০ | ৪০,০০০+ |
| ডিজিটাল কেস ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম (CMS) ব্যবহারকারী আদালতের শতাংশ | ১০% | ৬০% | ১০০% |
উৎস: আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রণালয়; বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট; World Bank ও ADB এর যৌথ প্রতিবেদন।
সুপারিশ
- জাতীয় তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি নীতিমালা-২০১৮ (সংশোধিত) এর আলোকে দেশের প্রতিটি আদালতকে নিরবচ্ছিন্ন উচ্চগতির ইন্টারনেট সংযোগ এবং আধুনিক ডিজিটাল অবকাঠামো (যেমন: সার্ভার, কম্পিউটার, স্ক্যানার, বায়োমেট্রিক ডিভাইস) সরবরাহ নিশ্চিত করা এবং এর নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণের জন্য সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় কর্তৃক একটি স্থায়ী তহবিল গঠন করা।
- আইন মন্ত্রণালয়, বিচার বিভাগ এবং বাংলাদেশ জুডিশিয়াল সার্ভিস কমিশনের যৌথ উদ্যোগে বিচারক, আইনজীবী, আদালত কর্মী ও সহায়ক কর্মীদের জন্য ডিজিটাল সাক্ষরতা এবং ই-আদালত প্ল্যাটফর্ম ব্যবহারের উপর বাধ্যতামূলক ও নিয়মিত প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা, যা জুডিশিয়াল সার্ভিস রুলস-এর আওতায় এনে কর্মদক্ষতা মূল্যায়নের একটি অংশ হিসেবে গণ্য করা যেতে পারে।
- বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক প্রণীত ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন-২০১৮ এর অধীনে সাইবার নিরাপত্তা প্রোটোকল জোরদার করে বিচার বিভাগের সকল ডিজিটাল ডেটাবেসকে আন্তঃসংযুক্ত ও সুরক্ষিত করা এবং ওয়ার্ল্ড ব্যাংক ও এডিবি'র প্রযুক্তিগত সহায়তায় একটি সেন্ট্রালাইজড কেস ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম (CMS) বাস্তবায়ন করা যা মামলার প্রতিটি ধাপের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করবে।