বিশেষজ্ঞ চোখে সাপ্লাই চেইন ও লজিস্টিকস ব্যবস্থাপনা: সত্য, মিথ ও গুরুত্বপূর্ণ পরামর্শ | আই নিউজ বিডি | বাংলাদেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ ও ভিডিও

বিশেষজ্ঞ চোখে সাপ্লাই চেইন ও লজিস্টিকস ব্যবস্থাপনা: সত্য, মিথ ও গুরুত্বপূর্ণ পরামর্শ

আরিফুল ইসলাম  avatar   
আরিফুল ইসলাম
বিশেষজ্ঞ চোখে সাপ্লাই চেইন ও লজিস্টিকস ব্যবস্থাপনা: সত্য, মিথ ও গুরুত্বপূর্ণ পরামর্শ
বিশেষজ্ঞ চোখে সাপ্লাই চেইন ও লজিস্টিকস ব্যবস্থাপনা: সত্য, মিথ ও গুরুত্বপূর্ণ পরামর্শ
ছবি: সংগৃহীত

সম্প্রতি বিশ্বব্যাংকের লজিস্টিকস পারফরম্যান্স ইনডেক্স (LPI) ২০২৩-এর প্রকাশিত ফলাফলে বাংলাদেশের অবস্থান ১০৭তম, যা লজিস্টিকস সক্ষমতা এবং সাপ্লাই চেইন ব্যবস্থাপ...

সম্প্রতি বিশ্বব্যাংকের লজিস্টিকস পারফরম্যান্স ইনডেক্স (LPI) ২০২৩-এর প্রকাশিত ফলাফলে বাংলাদেশের অবস্থান ১০৭তম, যা লজিস্টিকস সক্ষমতা এবং সাপ্লাই চেইন ব্যবস্থাপনায় আমাদের দীর্ঘদিনের দুর্বলতাকে পুনরায় সামনে এনেছে। একই সময়ে, বৈশ্বিক ভূ-রাজনৈতিক অস্থিরতা, বিশেষ করে লোহিত সাগরের সংকট, আন্তর্জাতিক শিপিং খরচ এবং পণ্য পরিবহনের সময়কে নাটকীয়ভাবে বাড়িয়ে দিয়েছে, যার সরাসরি প্রভাব পড়েছে বাংলাদেশের রপ্তানি ও আমদানি বাণিজ্যে। রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরো (EPB)-এর তথ্য অনুযায়ী, পোশাক খাতের রপ্তানি আদেশ পূরণে সময়মতো পণ্য জাহাজীকরণে বিলম্ব এবং অতিরিক্ত খরচ আমাদের আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতামূলক অবস্থানকে চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলেছে। এই পরিস্থিতিতে, সাপ্লাই চেইন ও লজিস্টিকস ব্যবস্থাপনার প্রচলিত ধারণা, এর পেছনের সত্য এবং কার্যকরী পরামর্শ নিয়ে একটি গভীর বিশ্লেষণ এখন সময়ের দাবি।

বাংলাদেশের সাপ্লাই চেইন ব্যবস্থাপনায় অন্যতম প্রধান একটি মিথ হলো, অবকাঠামোগত উন্নয়নই সকল সমস্যার সমাধান। বাস্তবতা হলো, শুধুমাত্র সড়ক, সেতু বা বন্দরের মতো ভৌত অবকাঠামো নির্মাণ করলেই লজিস্টিকস দক্ষতা রাতারাতি বৃদ্ধি পায় না। চট্টগ্রাম বন্দরের সাম্প্রতিক সক্ষমতা বৃদ্ধি সত্ত্বেও, কন্টেইনার জট, জাহাজ অপেক্ষার দীর্ঘ সময় এবং পণ্য খালাসে বিলম্ব একটি নিয়মিত চিত্র। জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (NBR) পরিচালিত কাস্টমস প্রক্রিয়ায় বিদ্যমান জটিলতা, বহুস্তরীয় অনুমোদন প্রক্রিয়া এবং অটোমেশনের অভাব পণ্য খালাসে দীর্ঘসূত্রিতা তৈরি করে, যা ব্যবসার পরিচালন ব্যয় (Cost of Doing Business) উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়িয়ে দেয়। সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (CPD)-এর এক গবেষণায় দেখা গেছে, বাংলাদেশের লজিস্টিকস ব্যয় জিডিপির প্রায় ১৫-১৭ শতাংশ, যা উন্নত দেশগুলোর তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ। এই অতিরিক্ত ব্যয় শেষ পর্যন্ত পণ্যের মূল্য বৃদ্ধি করে ভোক্তা এবং রপ্তানিকারক উভয়কেই ক্ষতিগ্রস্ত করে। লজিস্টিকস সক্ষমতা বৃদ্ধির জন্য শুধুমাত্র অবকাঠামো নয়, বরং প্রক্রিয়ার সরলীকরণ, আন্তঃসংস্থা সমন্বয় এবং মানবসম্পদের দক্ষতা বৃদ্ধি অপরিহার্য, যা প্রায়শই উপেক্ষিত থেকে যায়।

আরেকটি প্রচলিত ভুল ধারণা হলো, ডিজিটাল প্রযুক্তির ব্যবহার ব্যয়বহুল এবং ছোট ব্যবসার জন্য অপ্রয়োজনীয়। কিন্তু আধুনিক সাপ্লাই চেইন ব্যবস্থাপনায় প্রযুক্তির ব্যবহার শুধু খরচ কমায় না, বরং দক্ষতা, স্বচ্ছতা এবং নির্ভরযোগ্যতাও বৃদ্ধি করে। উদাহরণস্বরূপ, ইনভেন্টরি ব্যবস্থাপনায় অটোমেশন, ট্র্যাকিং সিস্টেম, এবং ডেটা অ্যানালিটিক্স ব্যবহার করে সাপ্লাই চেইনকে আরও কার্যকর করা সম্ভব। দুঃখজনকভাবে, বাংলাদেশের অধিকাংশ লজিস্টিকস প্রতিষ্ঠান এখনও এনালগ পদ্ধতিতেই কাজ করে, যেখানে তথ্যের আদান-প্রদান ম্যানুয়াল এবং সময়সাপেক্ষ। বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (BSEC) যদিও প্রযুক্তিভিত্তিক স্টার্টআপে বিনিয়োগের সুযোগ তৈরি করছে, লজিস্টিকস খাতের জন্য সুনির্দিষ্ট প্রযুক্তিগত উদ্ভাবনে বিনিয়োগের অভাব সুস্পষ্ট। ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে কাস্টমস ক্লিয়ারেন্স, ভেসেল ট্র্যাকিং, ওয়্যারহাউস ম্যানেজমেন্ট এবং ফ্রেট ফরওয়ার্ডিং-এর মতো পরিষেবাগুলো একীভূত করতে পারলে তা পুরো সাপ্লাই চেইনকে গতিশীল করতে পারত। এই খাতের প্রযুক্তিগত রূপান্তরকে উৎসাহিত করার জন্য নীতিগত সহায়তা এবং আর্থিক প্রণোদনা প্রদান অত্যাবশ্যক, যা দীর্ঘমেয়াদে দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে।

তৃতীয়ত, সাপ্লাই চেইনকে শুধুমাত্র পণ্য পরিবহন ও মজুদের মধ্যে সীমাবদ্ধ বলে মনে করা হয়, যা একটি সংকীর্ণ দৃষ্টিভঙ্গি। প্রকৃতপক্ষে, এটি কাঁচামাল সংগ্রহ থেকে শুরু করে চূড়ান্ত ভোক্তার কাছে পণ্য পৌঁছানো পর্যন্ত একটি সমন্বিত প্রক্রিয়া। বাণিজ্য মন্ত্রণালয় যদিও দেশের আমদানি-রপ্তানি নীতি এবং বাণিজ্য চুক্তি নিয়ে কাজ করে, লজিস্টিকস ব্যবস্থাপনাকে সামগ্রিক বাণিজ্য নীতির অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে দেখা এবং একটি জাতীয় লজিস্টিকস নীতি প্রণয়নের বিষয়টি এখনও উপেক্ষিত। বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও সংস্থার মধ্যে সমন্বয়ের অভাব, যেমন সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয়, নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়, রেলওয়ে মন্ত্রণালয় এবং NBR-এর মধ্যে তথ্য আদান-প্রদান ও সিদ্ধান্ত গ্রহণে সমন্বয়হীনতা প্রায়শই সাপ্লাই চেইনের প্রতিটি স্তরে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে। এই খণ্ডিত দৃষ্টিভঙ্গি দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক সক্ষমতাকে দুর্বল করে দেয় এবং আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারীদের কাছে বাংলাদেশকে কম আকর্ষণীয় করে তোলে। একটি সুসংহত এবং দূরদর্শী জাতীয় লজিস্টিকস নীতি ছাড়া বাংলাদেশের পক্ষে বৈশ্বিক সাপ্লাই চেইন প্রতিযোগিতায় টিকে থাকা কঠিন হবে।

সূচক ২০১৮ সালের তথ্য ২০২৩ সালের তথ্য মন্তব্য
লজিস্টিকস পারফরম্যান্স ইনডেক্স (LPI) র্যাঙ্কিং (বিশ্বব্যাংক) ১০০তম ১০৭তম বৈশ্বিক অবস্থানে অবনতি, যা লজিস্টিকস সক্ষমতার দুর্বলতা নির্দেশ করে।
কাস্টমস ক্লিয়ারেন্সের গড় সময় (দিন) ৭-১০ দিন ৬-৮ দিন সামান্য উন্নতি হলেও, আঞ্চলিক প্রতিযোগীদের (যেমন ভিয়েতনাম: ২-৩ দিন) চেয়ে অনেক বেশি।
লজিস্টিকস ব্যয় (জিডিপির শতাংশ) প্রায় ১৬% প্রায় ১৫-১৭% উচ্চ ব্যয় বজায় রয়েছে, যা পণ্যের প্রতিযোগিতামূলক মূল্যকে প্রভাবিত করে।
রপ্তানি প্রবৃদ্ধি (EPB রিপোর্ট) ১০.৪৫% (FY18) ৬.৬৭% (FY23) বৈশ্বিক ও অভ্যন্তরীণ লজিস্টিকস চ্যালেঞ্জের কারণে প্রবৃদ্ধির হার কমেছে।

উৎস: বিশ্বব্যাংকের লজিস্টিকস পারফরম্যান্স ইনডেক্স রিপোর্ট, জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের বার্ষিক প্রতিবেদন, রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (EPB) পরিসংখ্যান এবং সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (CPD)-এর গবেষণা পত্র।

সুপারিশ

  • বাণিজ্য মন্ত্রণালয়কে অবিলম্বে একটি জাতীয় লজিস্টিকস নীতি (National Logistics Policy) প্রণয়ন করতে হবে, যেখানে আন্তঃমন্ত্রণালয় সমন্বয়কে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া হবে। এই নীতির অধীনে, EPB-এর সাথে যৌথভাবে রপ্তানিমুখী শিল্পের জন্য বিশেষ লজিস্টিকস করিডোর এবং সাপ্লাই চেইন সক্ষমতা বৃদ্ধির কৌশল অন্তর্ভুক্ত করতে হবে, যার একটি নির্দিষ্ট সময়সীমা ও কর্মপরিকল্পনা থাকবে।
  • জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (NBR) কর্তৃক কাস্টমস অটোমেশন প্রক্রিয়াকে সম্পূর্ণ ডিজিটালাইজড করার জন্য ন্যাশনাল সিঙ্গেল উইন্ডো (NSW) প্রকল্পের পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়ন এবং বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সাথে সমন্বয় করে শুল্ক ছাড়পত্র প্রক্রিয়াকে ৭২ ঘণ্টার মধ্যে নিয়ে আসার জন্য একটি সময়বদ্ধ কর্মপরিকল্পনা প্রণয়ন করা। এই প্রক্রিয়ায় ব্লকচেইন প্রযুক্তি ব্যবহারের সম্ভাব্যতা যাচাই করে পাইলট প্রকল্প চালু করা যেতে পারে।
  • বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (BSEC)-এর তত্ত্বাবধানে একটি বিশেষ ভেঞ্চার ক্যাপিটাল ফান্ড (Venture Capital Fund) গঠন করা যা সাপ্লাই চেইন প্রযুক্তিতে বিনিয়োগ করবে এবং সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (CPD)-এর গবেষণার ভিত্তিতে উদ্ভাবনী লজিস্টিকস সমাধানগুলোর জন্য নীতি সহায়তা প্রদান করবে। এর মাধ্যমে আধুনিক ওয়্যারহাউস ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম, ফ্লিট অপটিমাইজেশন সফটওয়্যার এবং ইন্টিগ্রেটেড সাপ্লাই চেইন প্ল্যাটফর্মগুলোর উন্নয়নে বিনিয়োগ আকর্ষণ করা সম্ভব হবে।

✍️ নিবন্ধ লেখক: আরিফুল ইসলাম

আরিফুল ইসলাম 'আই নিউজ বিডি'-র একজন সিনিয়র সাংবাদিক ও বিষয়ভিত্তিক গবেষক। তাঁর বিশেষত্বের জায়গা: সাপ্লাই চেইন ও লজিস্টিকস ব্যবস্থাপনা। এই নিবন্ধটি তাঁর নিজস্ব গবেষণা ও বিশ্লেষণ থেকে সংকলিত।

Keine Kommentare gefunden


News Card Generator