পুলিশ ও গোয়েন্দা সূত্রে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, দেশের এক কোর গ্রুপ ভারতের তত্ত্বাবধানে চলমান ছক আঁকছে—ধানমন্ডি-৩২ এ এক ঘণ্টার মধ্যে বিশ থেকে পঁচিশ হাজার জন জড়ো করে অন্তর্বর্তী সরকারকে উৎখাত করা লক্ষ্য। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ইতোমধ্যেই বেশ কিছু সদস্য গ্রেফতার করেছে; সাইবার ও মাঠ পর্যায়ে সতর্কতা জোরদার করা হয়েছে।
পুলিশ ও গোয়েন্দা সূত্রে মিলেছে চাঞ্চল্যকর তথ্য: ধানমন্ডি-৩২ এলাকায় এক ঘণ্টার ব্যবধানে বিশ থেকে পঁচিশ হাজার জনকে হঠাৎ করে জড়ো করে রাজধানীর আইনশৃঙ্খলা বিঘ্নিত করার একটি সংগঠিত পরিকল্পনা চলছে। প্রধান উদ্দেশ্য—অন্তর্বর্তী সরকারকে চাকচিক্যবিহীন করে ফেলতে এবং ক্ষমতাচ্যুত রাজনৈতিক দলকে পূর্বাবস্থায় ফিরিয়ে আনার চক্রান্ত। উপলব্ধি করা তথ্য অনুযায়ী এই নাশকতার নকশা ভারতের মধ্যে অবস্থানরত দলের এক কোর গ্রুপ থেকেই তত্ত্বাবধানে পরিচালিত হচ্ছে বলে পুলিশের ধারণা।
গণজমায়েত, আকস্মিক মিছিল ও জবাবী সহিংসতার মাধ্যমে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর আত্মবিশ্বাস ধ্বংস করা এবং সামাজিক অস্থিরতা সৃষ্টি করে সরকারপ্রতিষ্ঠানগুলোকে চাপে ফেলে দেওয়া এই পরিকল্পনার মূল লক্ষ্য। সূত্র বলে, মাঠ পর্যায়ে যুবক ও ছাত্রশিষ্যদের ছোট দলে বিভক্ত করে প্রায় প্রতিদিনই ঝটিকা মিছিল বের করা হচ্ছে—যেগুলো ধানমন্ডি-৩২ সহ দেশের বিভিন্ন স্ট্র্যাটেজিক স্থানে সংগ্রহে রূপ নেবে। এসব সংগঠিত কার্যক্রমে অংশগ্রহণকারীদের মধ্যে অনেকেই আত্মগোপনে আছে; ইতোমধ্যেই পুলিশের হাতে অনেক সদস্য ধরা পড়েছে, বাকিদের গ্রেফতারে অভিযান অব্যাহত রয়েছে।
পুলিশের অভ্যন্তরে তথ্য ফাঁসের অভিযোগও পাওয়া গেছে। এই অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে পুলিশ নিজেদের মধ্যেই বিশেষ কাউন্টার-ইন্টেলিজেন্স টিম গঠন করে সন্দেহভাজন ক্যানেকশনের গতি-প্রকৃতি পর্যবেক্ষণ শুরু করেছে। সূত্র বলছে, কিছু ক্ষেত্রে অভিযান পরিকল্পনার তথ্য গোপন না থাকায় লক্ষণীয়ভাবে ব্যর্থ হয়েছে—এজন্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আরও সার্বিক গোপনীয়তা ও সতর্কতা বজায় রাখতে সচেষ্ট।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা জানিয়েছেন, গত ২৪ সেপ্টেম্বর রাজধানীর কয়েকটি গণজমায়েত রুখে দেওয়ার সময় ২৪৪ জনকে গ্রেফতার করা হয়েছিল। তাদের জিজ্ঞাসাবাদে উদ্ধারকৃত তথ্য অনুসারে সংগঠনের একাংশ গ্রিন রোড ও পান্থপথ পেরিয়ে ধানমন্ডিকে লক্ষ্য করে ব্যাপক জমায়েত করার পরিকল্পনা করেছিল। তৎপর পুলিশি কার্যক্রমের কারণে ওই পরিকল্পনার জট রুদ্ধ হয়েছিল—তবুও গোয়েন্দা তথ্য অনুযায়ী অক্টোবর মাসে বড় ধরনের পরিকল্পনা মোকাবিলার চেষ্টা করা হবে বলে আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।
সাইবার স্পেসেও নিয়ন্ত্রণ তৈরি করার পরিকল্পনা করছেন ওই চক্র—সোশ্যাল মিডিয়া ও মেসেজিং প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করে দ্রুত কলে, দলবেঁধে রাজধানীর চারদিক থেকে নেতাকর্মীদের হঠাৎ ঢল নামানো হচ্ছিল। পুলিশের সাইবার ইউনিটের কাছে আগত সংকেতগুলো বিশ্লেষণ করে অনলাইনেও বেশ কিছু নেতা ও সমন্বয়কারীর অবস্থান শনাক্ত করা হয়েছে; ফলে ক্রমিকভাবে ডিজিটাল নজরদারি জোরদার করা হয়েছে। কর্তৃপক্ষ জানায়, সাইবার তদন্ত ও মেসেজিং ট্রেসিংয়ের মাধ্যমে অভিযানের পরিকল্পনা ও সংশ্লিষ্টদের খোঁজে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি এসেছে।
পুলিশ প্রশাসনের শীর্ষরা হুশিয়ারি দিয়েছেন যে, ধর্মীয় উৎসব বা ধর্মীয় সেন্টিটিভিটি ব্যবহার করে সাম্প্রদায়িক সহিংসতা উসকে দেয়া হতে পারে—এমন আশঙ্কাও গোয়েন্দা রিপোর্টে উঠে এসেছে। অতিরিক্ত আইজিপি (অপরাধ ও অপস) খোন্দকার রফিকুল ইসলাম বলেছেন, ‘‘পরাজিত দল বা গোষ্ঠী বিভিন্ন উপায়ে আইনশৃঙ্খলা ও সামাজিক শান্তি বিঘ্নিত করার অপচেষ্টা করছে। বিদেশি সহায়তাও থাকতে পারে—এ বিষয়টি গোয়েন্দা সংস্থাগুলো সমীক্ষা করছেন।’’ তিনি আরও জোর দিয়ে বলেছেন, এসব চক্রান্ত রুখতে সকল আইনশৃঙ্খলা কর্মীকে সজাগ থাকতে হবে।
ঢাকা রেঞ্জের ডিসি-রও দায়িত্বশীল বক্তব্যে বলা হয়েছে, ‘‘ফ্যাসিস্ট বা সন্ত্রাসবিরোধী কার্যকলাপে যারা লিপ্ত হবে, তাদের বিরুদ্ধে কোনোরকম ছাড় দেয়া হবে না।’’ এদিকে ডিএমপি’র ক্রাইম ডিভিশনের সিনিয়র কর্মকর্তারা মাঠ পর্যায়ে এসি, এডিসি, ডিসি ও ওসিসহ অন্যান্য কর্মকর্তা-অফিসারদের সময়মতো নির্দেশনা ও তদারকির জন্য সর্তক রেখেছেন। জরুরি পরিস্থিতিতে দ্রুত জুম মিটিং এবং হোয়াটসঅ্যাপ মাধ্যমে সার্বক্ষণিক আপডেট শেয়ার করা হচ্ছে এবং বিশুদ্ধ গোয়েন্দা তথ্য বিশ্লেষণ করে কেন্দ্রীয় কোর টিম অ্যাকশন প্ল্যান প্রণয়ন করছে।
কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা পর্যায় থেকে পাওয়া নথিতে উল্লেখ রয়েছে—দেশি কোনো বড় অস্থিরতা সৃষ্টি হলে তা দ্রুত ছড়িয়ে পড়তে পারে এবং রাষ্ট্রীয় স্বার্থে ক্ষতিকর হতে পারে। এ কারণে সরকারের উচ্চপর্যায়েও বিভিন্ন বিভাগের সঙ্গে সমন্বয় করে মুহূর্তিক প্রতিক্রিয়া পরিকল্পনা প্রস্তুত রাখা হয়েছে। গোয়েন্দা সূত্র জানায়, যুদ্ধকালীন তৎপরতা অনুযায়ী গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের নিরাপত্তা জোরদার করা হবে, প্রধান সড়কগুলোর নিয়ন্ত্রণ-চেকপোস্ট বৃদ্ধি করা হবে এবং প্রয়োজনে দ্রুত মোতায়েনযোগ্য রিজার্ভ ফোর্স প্রস্তুত রাখা হবে।
পুলিশ সূত্র বলেছে, যদি প্রধান রাজনৈতিক দলগুলো নির্বাচনী মনোভাব নিয়ে একাধিক জায়গায় ঐক্যবদ্ধ না হন তবে ষড়যন্ত্রকারীরা আরও জোরালোভাবে ঘাতক পরিকল্পনা উপলব্ধি করে নিতে পারে। ভেতরে-বাইরে থেকে প্ররোচনার আশঙ্কা থাকায় রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দকেও সংহত অবস্থানে থাকা জরুরি—এটি দেশের স্থিতিশীলতার জন্য অপরিহার্য বলে বিশেষজ্ঞদের মত।
এদিকে নিরাপত্তা বাহিনীর তথ্যভাণ্ডারে অভিযোগ এসেছে যে পুলিশের ভেতরে এখনও অনেকে অতীতীকৃত রাজনৈতিক আনুগত্যে ভুগছেন; এমন কিছু কর্মী রয়েছেন যারা দায়িত্ব পালনকালে গোপনে সংবেদনশীল তথ্য ফাঁস করে দেন। এই ধরনের বিষয় মোকাবিলায় কঠোর মনোযোগী পর্যবেক্ষণ চালানো হচ্ছে এবং সন্দেহভাজনদের গতিবিধি চিহ্নিত করতে বিশেষ টিম গঠন করা হয়েছে। পুলিশের শীর্ষ কর্তা আশা প্রকাশ করেছেন যে, ধাপে ধাপে এই ধরনের অভ্যন্তরীণ দুর্বৃত্ততা কমে আসবে এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনী আরও স্বচ্ছ ও কার্যকরভাবে কাজ করবে।
অভিযান সংক্রান্ত একটি বন্ধ সূত্র জানায়, গ্রেফতারকৃতদের জয়েন্ট ইন্টারোগেশনে অক্টোবরে বড় পরিকল্পনা বাস্তবায়নের লক্ষ্যে যে-রকম লজিস্টিক ও কম্যান্ড-স্ট্রাকচার আভ্যন্তরীণভাবে নির্মিত হয়েছিল, তার বিবরণ পাওয়া গেছে—যা এখন বিশ্লেষণ ও ভাঙচুরের পর্যায়ে রয়েছে। পুলিশ বলেছে, উদ্ধারকৃত তথ্যের ভিত্তিতে আগামী দিনের সম্ভাব্য কড়াকড়া পদক্ষেপ ও প্রতিরোধ প্রক্রিয়া চূড়ান্ত করা হচ্ছে।
সরকারি এবং গোয়েন্দা সংস্থার কাছে এখন মূল চ্যালেঞ্জটি হলো: মাঠে সক্রিয় থাকা নেতাকর্মীদের ধরে তৎক্ষণাৎ খণ্ডিত করা, সাইবার ফাঁদে আটকে রাখার পূর্বে তাদের সংগঠিত সংযোগ বিচ্ছিন্ন করা এবং ক্রস-বর্ডার সহায়তার শিকড় চিহ্নিত করে বন্ধ করা। এই কাজগুলো সফল হলে রাজধানী ও সারাদেশে বড় ধরনের অশান্তি ঠেকানো সম্ভব হবে—তাই পুলিশ, গোয়েন্দা ও সমন্বিত প্রশাসনিক ইউনিটগুলো সতর্ক ও গতিশীল অবস্থায় রয়েছে।
শেষপর্যায়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী জনগণকে আপিল করেছে—যে কোনো উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বিশৃঙ্খলা বা অহেতুক উত্তেজনায় কেউ অংশগ্রহণ না করে এবং সন্দেহভাজন কোনো তথ্য পেলে নিকটস্থ থানায় বা হটলাইনে জানাতে নেতৃত্ব দিয়েছে। কর্তৃপক্ষ বলছে, দেশের স্থিতিশীলতা রক্ষা করাই সবার সম্মিলিত দায়িত্ব এবং এই দায়িত্ব পালনেই তারা দিনরাত কাজ করে যাচ্ছে।