প্রায় দুই দশক ধরে অচল থাকা বাংলাদেশ-পাকিস্তান যৌথ অর্থনৈতিক কমিশন (জেইসি) অবশেষে আবারও কার্যকর হতে যাচ্ছে। দুই দেশের অর্থনৈতিক সম্পর্ক নতুনভাবে জোরদার করার অংশ হিসেবে আগামী ২৬ ও ২৭ অক্টোবর ঢাকায় অনুষ্ঠিত হবে জেইসির উচ্চপর্যায়ের বৈঠক। এই বৈঠকে বাংলাদেশের পক্ষের নেতৃত্ব দেবেন সাবেক গভর্নর ও প্রধানমন্ত্রীর অর্থ উপদেষ্টা ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ এবং পাকিস্তানের পক্ষের নেতৃত্বে থাকবেন দেশটির বর্তমান অর্থমন্ত্রী মুহাম্মদ আওরঙ্গজেব।
অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগ (ইআরডি) সূত্রে জানা গেছে, বৈঠকে দুই দেশের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে স্থবির হয়ে থাকা ব্যবসা-বাণিজ্য সম্প্রসারণ, বিনিয়োগ বৃদ্ধির কৌশল এবং অর্থনৈতিক সহযোগিতার নতুন খাত চিহ্নিত করার বিষয়ে আলোচনা হবে। পাশাপাশি যোগাযোগ ও কূটনৈতিক সম্পর্কের নতুন দিগন্ত উন্মোচনেরও সুযোগ তৈরি হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
ইআরডি কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, জেইসির আওতায় বাণিজ্য, বিনিয়োগ ও অর্থনৈতিক স্বার্থকে সামনে রেখে লাভজনক কৌশল প্রণয়ন করা হবে। একই সঙ্গে বিদ্যমান বাণিজ্য প্রতিবন্ধকতা দূর করার পদক্ষেপও নেওয়া হবে। এরই মধ্যে ইআরডি পররাষ্ট্র, শিল্প, বাণিজ্য, বস্ত্র ও পাট, শিক্ষা ও স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়, বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অঞ্চল কর্তৃপক্ষ (বেজা), বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (বিডা) সহ সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন দপ্তরের কাছে বৈঠকের আলোচ্যসূচির জন্য প্রস্তাব চেয়ে চিঠি দিয়েছে।
চলতি বৈঠকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হতে পারে বাণিজ্য ঘাটতি কমানোর ইস্যুতে। বাংলাদেশ চাইবে পাকিস্তান আরও বেশি পরিমাণে চা, পাটজাত পণ্য, ওষুধ, রেডিমেড গার্মেন্টস, ইলেকট্রনিকস সামগ্রী আমদানি করুক। এ ছাড়া শিক্ষাখাত, স্বাস্থ্যসেবা, টেক্সটাইল শিল্প এবং প্রযুক্তি খাতে সহযোগিতা বৃদ্ধির বিষয়ে আলোচনা হবে বলে জানা গেছে।
অতীতে জেইসির বৈঠকগুলোয় উচ্চাভিলাষী পরিকল্পনা করা হলেও তা বাস্তবায়িত হয়নি। ২০০৫ সালের বৈঠকে দুই দেশের বাণিজ্য ২০ কোটি ডলার থেকে ২০০৭ সালের মধ্যে ১০০ কোটি ডলারে উন্নীত করার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছিল। একই বৈঠকে বাংলাদেশ পাকিস্তানের বাজারে শতাধিক পণ্যের জন্য শুল্কমুক্ত বাজার সুবিধা দাবি করেছিল। অন্যদিকে পাকিস্তান প্রস্তাব দিয়েছিল মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি (এফটিএ) স্বাক্ষরের। কিন্তু নানা রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক টানাপোড়েনের কারণে পরিকল্পনা আলোর মুখ দেখেনি।
বিশ্লেষকদের মতে, বর্তমান বৈঠকটি দুই দেশের অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক সম্পর্কে নতুন করে প্রাণ সঞ্চার করবে। সাম্প্রতিক সময়ে দক্ষিণ এশিয়ার ভূরাজনীতি এবং বৈশ্বিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতি বিবেচনায় বাংলাদেশ-পাকিস্তান উভয় দেশই পারস্পরিক সহযোগিতা বাড়াতে আগ্রহী। বাণিজ্য ঘাটতি কমানোর পাশাপাশি নতুন বাজার খোঁজা, শিল্প পণ্য রপ্তানি বৃদ্ধি, বিনিয়োগ আকর্ষণ এবং কৌশলগত অংশীদারিত্ব গড়ে তোলা বৈঠকের প্রধান অগ্রাধিকার হতে পারে।
সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, যদি এ বৈঠক বাস্তবমুখী সিদ্ধান্তে উপনীত হয়, তবে এটি শুধু দুই দেশের মধ্যে নয়, গোটা দক্ষিণ এশিয়ার আঞ্চলিক অর্থনৈতিক সহযোগিতার জন্য একটি নতুন মাইলফলক হয়ে দাঁড়াতে পারে। দীর্ঘ দুই দশক পর বাংলাদেশ-পাকিস্তান যৌথ অর্থনৈতিক কমিশনের পুনরুজ্জীবন তাই কেবল একটি বৈঠক নয়, বরং ভবিষ্যৎ সম্ভাবনার নতুন দুয়ার খুলে দেওয়ার ইঙ্গিত।