ভারতের জম্মু ও কাশ্মীরের কাঠুয়া জেলার বাসোহলি এলাকার মাশকা গ্রামে অবস্থিত সেওয়া জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের নিরাপত্তা শিবিরে গত ৩০ সেপ্টেম্বর সন্ধ্যায় এক ভয়াবহ হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটে। দায়িত্ব হস্তান্তরের সময় সন্ধ্যা সাড়ে ৬টা থেকে সাড়ে ৭টার মধ্যে সিআইএসএফের এক হেড কনস্টেবল তার সার্ভিস রাইফেল থেকে এলোপাতাড়ি গুলি চালালে ঘটনাস্থলেই চারজন উচ্চপদস্থ ও সাধারণ সদস্য গুরুতর আহত হন। নিহতদের মধ্যে অ্যাসিস্ট্যান্ট কমান্ড্যান্ট অঙ্কিত কুমার পান্ডে, সাব-ইন্সপেক্টর লক্ষ্মণ সিং এবং কনস্টেবল সঞ্জীব কুমার ও মোহাম্মদ রফিক রয়েছেন। গুরুতর আহত অবস্থায় তাদের প্রতিবেশী হিমাচল প্রদেশের একটি এনএইচপিসি হাসপাতালে নেওয়া হলে কর্তব্যরত চিকিৎসকরা তাদের মৃত ঘোষণা করেন। এই নৃশংস ঘটনাটি নিরাপত্তা বাহিনীর অভ্যন্তরে চরম অস্থিরতা ও পেশাদারিত্বের অভাবকে স্পষ্টভাবে সামনে নিয়ে এসেছে, যেখানে সুরক্ষিত একটি প্রকল্পের ভেতরেই সহকর্মীরা একে অপরের প্রাণহানির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছেন।
প্রাথমিক তদন্ত ও প্রত্যক্ষদর্শীদের তথ্যানুসারে, অভিযুক্ত হেড কনস্টেবল আওধেশ সিংয়ের সাথে নিহত কোম্পানি কমান্ডার অঙ্কিত কুমার পান্ডের ব্যক্তিগত ও পেশাগত বিষয়ে তীব্র তর্ক-বিতর্ক চলছিল বলে জানা গেছে। পারিবারিক বিষয়, বিশেষ করে সন্তানকে প্রকল্প এলাকায় নিয়ে আসা সংক্রান্ত জটিলতাকে কেন্দ্র করে এই দ্বন্দ্বের সূত্রপাত হয়েছিল বলে প্রাথমিক ধারণা করছে পুলিশ। ভুক্তভোগী সদস্যদের সহকর্মীরা জানিয়েছেন, দায়িত্ব পালনকালীন সময়ে এমন একটি তুচ্ছ বিষয়ে বিতর্কের জেরে স্বয়ংক্রিয় রাইফেল দিয়ে সহকর্মীদের ওপর গুলি চালানোর ঘটনাটি অত্যন্ত অস্বাভাবিক ও ভীতিকর। এই ঘটনার পর ক্যাম্পের ভেতরে থাকা অন্যান্য সদস্যরা দ্রুত তৎপর হয়ে অভিযুক্তকে নিরস্ত্র করেন এবং তাকে পুলিশের কাছে সোপর্দ করেন। নিরাপত্তা বাহিনীর অভ্যন্তরে এই ধরনের ফ্র্যাট্রিসাইড বা সহকর্মী হত্যার ঘটনা বাহিনীর মনোবলকে ক্ষতিগ্রস্ত করার পাশাপাশি ক্যাম্পে কর্মরত সদস্যদের মানসিক স্বাস্থ্যের অবনতিকেও নির্দেশ করছে, যা দীর্ঘ মেয়াদে নিরাপত্তা ঝুঁকি বাড়িয়ে তুলছে।
ঘটনার ভয়াবহতা বিবেচনায় নিয়ে সিআইএসএফ সদর দপ্তর অবিলম্বে একটি উচ্চপর্যায়ের 'কোর্ট অব ইনকোয়ারি' গঠনের নির্দেশ দিয়েছে। পাশাপাশি কাঠুয়া জেলা পুলিশও ঘটনার পেছনের সুনির্দিষ্ট কারণ অনুসন্ধানে মাঠে নেমেছে। সিআইএসএফের মহাপরিচালকসহ বাহিনীর ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা পুরো পরিস্থিতির ওপর কঠোর নজর রাখছেন। অভিযুক্ত আওধেশ সিংয়ের সার্ভিস রাইফেল বাজেয়াপ্ত করা হয়েছে এবং তার বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা গ্রহণের প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে। তবে কেবল অভিযুক্তকে বিচারের মুখোমুখি করাই যথেষ্ট নয়, বরং এই ধরনের ঘটনা যাতে ভবিষ্যতে আর না ঘটে, সেজন্য নিরাপত্তা বাহিনীর প্রতিটি ক্যাম্পে সদস্যদের মানসিক কাউন্সিলিং, কাজের চাপ কমানো এবং পারস্পরিক সম্পর্কের উন্নয়নের ওপর জোর দেওয়ার দাবি উঠেছে। প্রশাসনের পক্ষ থেকে আশ্বাস দেওয়া হয়েছে যে, তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত কারণ উদঘাটন করে বাহিনীর শৃঙ্খলা পুনর্প্রতিষ্ঠায় প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হবে।
এই মর্মান্তিক ঘটনাটি কেবল একটি বিচ্ছিন্ন অপরাধ নয়, বরং এটি ভারতের সামরিক ও আধাসামরিক বাহিনীর অভ্যন্তরীণ পরিবেশ ও মানসিক চাপের একটি অশনি সংকেত। একই ইউনিটের সদস্যদের মধ্যে এমন চরম বিদ্বেষপূর্ণ আচরণের ফলে বাহিনীর চেইন অব কমান্ডের ওপর সাধারণ মানুষের আস্থায় চিড় ধরতে পারে। বিশেষ করে জম্মু-কাশ্মীরের মতো সংবেদনশীল এলাকায় যেখানে নিরাপত্তা নিশ্চিত করাটাই প্রধান চ্যালেঞ্জ, সেখানে বাহিনীর অভ্যন্তরে এমন বিশৃঙ্খলা জাতীয় নিরাপত্তার জন্য বাড়তি উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। ভবিষ্যতে এ ধরনের সহিংসতা রোধে কেবল প্রযুক্তিগত নজরদারি নয়, বরং সদস্যদের মনস্তাত্ত্বিক ও ব্যক্তিগত সমস্যার সমাধানে প্রাতিষ্ঠানিক মনিটরিং ব্যবস্থা আরও জোরদার করা এখন সময়ের দাবি হয়ে দাঁড়িয়েছে।