পটুয়াখালীর লোহালিয়া নদীতীরে মাটি কেটে নিচ্ছে প্রভাবশালী চক্র। এলাকাবাসীর অভিযোগ—আগে আওয়ামী লীগ করলেও এখন স্থানীয় বিএনপি নেতারা এই ব্যবসায় জড়িয়ে পড়েছেন। ঝুঁকিতে বেড়িবাঁধ, কৃষিজমি ও বাজার।
পটুয়াখালীর লোহালিয়া নদীতীরে আবারও শুরু হয়েছে অবৈধভাবে মাটি কাটার ভয়াবহ ব্যবসা। একসময় ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের প্রভাবশালীরা এই কাজ করলেও এখন নিয়ন্ত্রণ নিয়েছে স্থানীয় বিএনপি নেতারা—এমন অভিযোগ তুলেছেন এলাকাবাসী। তাদের আশঙ্কা, এভাবে চলতে থাকলে কৃষিজমি, বাজার এবং বেড়িবাঁধ যে কোনো সময় নদীগর্ভে বিলীন হতে পারে।
লোহালিয়া নদীর উত্তর-পশ্চিমে পটুয়াখালী জেলা শহর এবং দক্ষিণ-পূর্বে সদর উপজেলার লোহালিয়া ইউনিয়ন অবস্থিত। এই ইউনিয়নের নদীতীরে সরকারি ও ব্যক্তিমালিকানাধীন জমি রয়েছে। অভিযোগ উঠেছে, এক্সক্যাভেটর দিয়ে দিন-রাত মাটি কেটে ডাম্পট্রাকে করে তা বিক্রি করা হচ্ছে আশপাশের ইটভাটায়। স্থানীয়দের মতে, প্রতিদিন নদীতীর থেকে মাটি তোলা হলে বেড়িবাঁধের রাস্তা ও পালপাড়া বাজারসহ গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা মুহূর্তেই ঝুঁকির মুখে পড়বে।
৭০ বছরের প্রবীণ বাসিন্দা মো. মকবুল হোসেন বলেন, “আগে আওয়ামী লীগের লোকজন মাটি কেটে নিয়ে যেত, এখন বিএনপির কর্মীরা সেই কাজ করছে। কখনো রাতে, কখনো আবার দিনের বেলায় মাটি কাটছে তারা। আমি বাধা দিতে গেলে আমাকে মারার হুমকি দেওয়া হয়।
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর থেকেই লোহালিয়া ইউনিয়ন বিএনপির সভাপতি মো. কামাল হোসেন মৃধা এ ব্যবসার নিয়ন্ত্রণ নিয়েছেন বলে অভিযোগ। স্থানীয়রা জানান, তাঁর লোকজনই প্রতিদিন নদীতীর থেকে মাটি কাটছেন এবং তা বিক্রি করে লাভবান হচ্ছেন।
মো. জাকির হোসেন নামে এক ভুক্তভোগী জানান, “আমরা অনেকবার বাধা দিয়েছি, কিন্তু উল্টো আমাদের ওপর চাপ সৃষ্টি করা হয়েছে। মাটি কাটা বন্ধ না হলে রাস্তা একেবারেই হারিয়ে যাবে। এখনই রাস্তা ভাঙনের মুখে।
একই অভিজ্ঞতার কথা শোনান শাওন খান। তাঁর অভিযোগ, আওয়ামী লীগের সময় মাটি কাটার বিরুদ্ধে দাঁড়াতে পারেননি, আর এখন বিএনপির সময়ও একই পরিস্থিতি। “আমি বাধা দিলে তারা আমাকে মারতে উদ্যত হয়। পরে কামাল মৃধা ভাইসহ কয়েকজন নেতা ফোন দিয়ে বলেন, মাটি কাটা নিয়ে আমার সমস্যা কী?
এমনকি, জাফর হাওলাদার নামে আরেকজন বাসিন্দা জানান, “কামাল মৃধা আমার বাবাকে সরাসরি বলে, মাটি কাটতে আমাদের ঠেকাতে তোমার সমস্যা কী? তুমি দোকান করো, দোকান করতেই থাকো।”
তবে অভিযোগ অস্বীকার করেছেন ইউনিয়ন বিএনপির সভাপতি কামাল হোসেন মৃধা। তাঁর দাবি, ওই জমি তাঁদের পৈতৃক সম্পত্তি। তিনি বলেন, “আমি আমার নিজের জমি থেকে কিছু মাটি বিক্রি করেছি। এটি রাতের আঁধারে নয়, দিনের আলোতেই করা হয়েছে।
অন্যদিকে, প্রশাসনের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, ব্যক্তিমালিকানাধীন হোক বা সরকারি জমি—নদীতীর থেকে অনুমতি ছাড়া মাটি কাটার কোনো নিয়ম নেই। পটুয়াখালী সদর উপজেলার সহকারী কমিশনার (ভূমি) চন্দন কর বলেন, “যদি কারও মাটি কাটার প্রয়োজন হয়, তবে জেলা বা উপজেলা প্রশাসনের অনুমতি নিতে হবে। অনুমতি ছাড়া কেউ মাটি কাটলে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
এ বিষয়ে পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. রাকিব বলেন, “যেখানে বেড়িবাঁধ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ঝুঁকি আছে, সেখান থেকে মাটি কাটা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। জেলা প্রশাসনের সঙ্গে সমন্বয় করে দ্রুত আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
এলাকাবাসীর দাবি, রাজনৈতিক দলের নাম ভাঙিয়ে যেভাবে প্রভাবশালীরা নদীতীরের মাটি কেটে নিচ্ছে, তা বন্ধ করতে না পারলে অচিরেই ভয়াবহ ভাঙনের মুখে পড়বে পুরো অঞ্চল। কৃষিজমি ধ্বংস হয়ে যাবে, বাজার নিশ্চিহ্ন হবে, আর বেড়িবাঁধ ভেঙে গেলে মানুষের বসতভিটাই হারিয়ে যাবে নদীগর্ভে।