গত ১ অক্টোবর বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সাবেক মুখপাত্র উমামা ফাতেমা তার ফেসবুক অ্যাকাউন্টে একটি দীর্ঘ স্ট্যাটাস দেওয়ার মাধ্যমে দেশের বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি ও আন্দোলনের অভ্যন্তরীণ প্রেক্ষাপট নিয়ে বিস্ফোরক মন্তব্য করেছেন। তিনি স্পষ্টত দাবি করেছেন যে, জামায়াতে ইসলামী ও আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক দর্শনের মধ্যে মৌলিক কোনো পার্থক্য নেই। তার ভাষ্যমতে, জামায়াত তাদের অতীত গণহত্যার কালিমা মুছে ফেলার জন্য দেশ ও রাষ্ট্রকে যেকোনো পর্যায়ে নিয়ে যেতে প্রস্তুত রয়েছে। আন্দোলনের দীর্ঘ ১৭ বছরের সংগ্রামের সঙ্গে সম্পৃক্ত নয় এমন ব্যক্তিদের হঠাৎ করে নেতৃত্বে চলে আসা এবং ৫ আগস্টের পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন মহলের ক্ষমতা দখলের যে প্রবণতা, তা নিয়ে তিনি তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। মূলত জুলাই বিপ্লবের চেতনাকে একটি নির্দিষ্ট গোষ্ঠী বা রাজনৈতিক দলের নিয়ন্ত্রণে বন্দি করার যে অপচেষ্টা চলছে, তা নিয়েই তিনি এই কঠোর অবস্থান গ্রহণ করেছেন বলে প্রতীয়মান হয়।
উমামা ফাতেমার অভিযোগের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে আন্দোলনের সমন্বয়ক কমিটিতে শিবির ও ছাত্রশক্তির মতো সংগঠনের প্রভাব বিস্তারের বিষয়টি। তিনি উল্লেখ করেছেন যে, জুলাই আন্দোলনের সময় পরিকল্পিতভাবে অন্যান্য ছাত্র সংগঠনকে পাশ কাটিয়ে একটি বিশেষ কোরামকে প্রাধান্য দেওয়া হয়েছিল, যার ফলে এখন নানা ধরনের সুবিধাভোগী ব্যক্তিরা ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুতে চলে এসেছে। ভুক্তভোগীদের পক্ষ থেকে এটি একটি বড় ধরনের রাজনৈতিক প্রতারণা হিসেবে দেখা হচ্ছে, কারণ আন্দোলনের মূল লক্ষ্য ছিল বৈষম্য দূর করা, অথচ এখন সেই আন্দোলনের ফসলই নির্দিষ্ট রাজনৈতিক গোষ্ঠীর কবজায় চলে গেছে। তিনি সোশ্যাল মিডিয়াকে পরিকল্পিতভাবে ম্যানিপুলেট করে তরুণ প্রজন্মের মাঝে কৃত্রিম 'হিরো' তৈরির যে ধারা শুরু হয়েছে, তাকে অত্যন্ত বিপজ্জনক হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। এই ম্যানিপুলেশন তরুণদের ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক সম্ভাবনাকে সংকুচিত করে ফেলছে বলেও তিনি মনে করেন।
সংশ্লিষ্ট মহলে এই মন্তব্যের প্রেক্ষিতে মিশ্র প্রতিক্রিয়া তৈরি হয়েছে। উমামা ফাতেমা তার পোস্টে সতর্ক করেছেন যে, মায়ানমারের রোহিঙ্গা গণহত্যার ক্ষেত্রে ফেসবুক যেভাবে একটি কার্যকর হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছিল, বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও একই ধরনের অস্থিতিশীলতা তৈরির অপচেষ্টা চলছে। তিনি দাবি করেছেন, বাংলাদেশের মধ্যবিত্ত শ্রেণীর রাজনৈতিক উদাসীনতা এবং সোশ্যাল মিডিয়ায় পরিকল্পিত কনটেন্ট তৈরির মাধ্যমে জনমতকে ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করার যে কৌশল নেওয়া হয়েছে, তা দেশের সার্বভৌমত্বের জন্য হুমকি। তবে এখন পর্যন্ত জামায়াতে ইসলামীর পক্ষ থেকে এই অভিযোগের বিষয়ে কোনো আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি। রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, আন্দোলনের ভেতরে থাকা এই অন্তর্দ্বন্দ্ব এবং পরস্পরবিরোধী অভিযোগের বিষয়টি সাধারণ মানুষের মধ্যে বিভ্রান্তি সৃষ্টি করছে এবং এর ফলে গণতান্ত্রিক উত্তরণ প্রক্রিয়া বাধাগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
পরিবহন ও রাষ্ট্র পরিচালনার মতো গুরুত্বপূর্ণ খাতগুলোতে যখন স্বচ্ছতা ও সংস্কারের দাবি জোরালো হচ্ছে, ঠিক সেই মুহূর্তে রাজনৈতিক নেতৃত্বের এই বিভাজন সাধারণ মানুষের মধ্যে এক ধরনের অনিশ্চয়তা তৈরি করেছে। উমামা ফাতেমার এই বক্তব্য শুধুমাত্র একজন ব্যক্তির ব্যক্তিগত অভিমত নয়, বরং এটি আন্দোলনের ভেতরে থাকা একটি বড় অংশের চাপা ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ। যদি রাজনৈতিক দলগুলো তাদের অতীত দায়বদ্ধতা এড়িয়ে কেবল ক্ষমতা দখলের লড়াইয়ে লিপ্ত থাকে, তবে জুলাই বিপ্লবের মূল লক্ষ্য অর্জিত হওয়া কঠিন হবে। দেশের ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করতে হলে সোশ্যাল মিডিয়ার অপপ্রচার এবং রাজনৈতিক ম্যানিপুলেশন বন্ধ করে একটি স্বচ্ছ ও অংশগ্রহণমূলক রাজনৈতিক সংস্কৃতি গড়ে তোলা এখন সময়ের দাবি।