বিশেষজ্ঞ চোখে জনস্বাস্থ্য ও মহামারী প্রতিরোধ: সত্য, মিথ ও গুরুত্বপূর্ণ পরামর্শ

ডা. আসিফ মাহমুদ  avatar   
ডা. আসিফ মাহমুদ
বিশেষজ্ঞ চোখে জনস্বাস্থ্য ও মহামারী প্রতিরোধ: সত্য, মিথ ও গুরুত্বপূর্ণ পরামর্শ
বিশেষজ্ঞ চোখে জনস্বাস্থ্য ও মহামারী প্রতিরোধ: সত্য, মিথ ও গুরুত্বপূর্ণ পরামর্শ
ছবি: সংগৃহীত

সম্প্রতি স্বাস্থ্য অধিদপ্তর (DGHS) প্রকাশিত সর্বশেষ কোভিড-১৯ পরিস্থিতি প্রতিবেদনে দেখা গেছে, গত এক বছরে নতুন ভ্যারিয়েন্টের সংক্রমণ এবং এর প্রভাবে সৃষ্ট জটিল...

সম্প্রতি স্বাস্থ্য অধিদপ্তর (DGHS) প্রকাশিত সর্বশেষ কোভিড-১৯ পরিস্থিতি প্রতিবেদনে দেখা গেছে, গত এক বছরে নতুন ভ্যারিয়েন্টের সংক্রমণ এবং এর প্রভাবে সৃষ্ট জটিলতা জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থাকে নতুন করে চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলেছে। যদিও বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO) কর্তৃক কোভিড-১৯-কে বৈশ্বিক জনস্বাস্থ্য জরুরি অবস্থা থেকে প্রত্যাহার করা হয়েছে, কিন্তু এর স্থানীয় ও আঞ্চলিক প্রভাব এখনো বিদ্যমান। বিশেষ করে, ডেঙ্গু, চিকুনগুনিয়া এবং ফ্লু-এর মতো স্থানীয় মহামারীগুলির সাথে কোভিড-১৯-এর সহাবস্থান জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনার দুর্বলতাগুলোকে আরও প্রকট করে তুলেছে, যা প্রতিরোধমূলক স্বাস্থ্যসেবার গুরুত্বকে পুনরায় সামনে নিয়ে এসেছে।

বাংলাদেশের জনস্বাস্থ্য কাঠামোতে মহামারী প্রতিরোধের ক্ষেত্রে দীর্ঘদিনের কিছু মৌলিক সমস্যা রয়ে গেছে। স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয় (MOHFW) এবং এর অধীনস্থ প্রতিষ্ঠানগুলো যেমন ডিজিএইচএস, আইইডিসিআর (ইনস্টিটিউট অফ এপিডেমিওলজি, ডিজিজ কন্ট্রোল অ্যান্ড রিসার্চ) এবং ডিজিডিএ (ডিরেক্টরেট জেনারেল অফ ড্রাগ অ্যাডমিনিস্ট্রেশন) তাদের নিজস্ব কর্মপরিধির মধ্যে কাজ করলেও, আন্তঃপ্রাতিষ্ঠানিক সমন্বয় এবং দ্রুত তথ্য বিনিময়ের অভাব প্রায়শই কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণে বিলম্ব ঘটায়। উদাহরণস্বরূপ, আইইডিসিআর রোগ শনাক্তকরণ ও গবেষণায় অগ্রণী ভূমিকা পালন করলেও, এর গবেষণালব্ধ তথ্যের ভিত্তিতে দ্রুত নীতি প্রণয়ন ও মাঠপর্যায়ে বাস্তবায়নে ডিজিএইচএস-এর সাথে সমন্বয় প্রক্রিয়ায় জটিলতা দেখা যায়। বিশেষত, প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা স্তরে রোগ নজরদারি এবং ডেটা সংগ্রহের দুর্বলতা মহামারীর প্রাথমিক পর্যায়ে কার্যকর প্রতিরোধ ব্যবস্থা গ্রহণে বড় বাধা তৈরি করে। জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা প্রায়শই এই সমন্বয়হীনতার সমালোচনা করেন, যা স্থানীয় পর্যায়ে মহামারীর বিস্তার রোধে জরুরি পদক্ষেপ গ্রহণে বাধা সৃষ্টি করে।

জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো মানুষের মধ্যে স্বাস্থ্য সচেতনতা এবং প্রচলিত মিথ ভাঙা। কোভিড-১৯ এবং ডেঙ্গু উভয় ক্ষেত্রেই দেখা গেছে, ভুল তথ্য এবং কুসংস্কার জনগণের মধ্যে রোগ প্রতিরোধমূলক আচরণ গ্রহণকে মারাত্মকভাবে ব্যাহত করেছে। মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট (NIMH) এর তথ্য অনুযায়ী, মহামারীর সময়ে সৃষ্ট মানসিক চাপ এবং ভুল তথ্যের প্রভাব জনস্বাস্থ্য আচরণে নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। অনেক সময়, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া গুজব সঠিক স্বাস্থ্য বার্তাগুলোকে ছাপিয়ে যায়, যার ফলে মাস্ক পরা, হাত ধোয়া বা ডেঙ্গু প্রতিরোধে লার্ভা ধ্বংস করার মতো মৌলিক পদক্ষেপগুলো উপেক্ষিত হয়। এছাড়া, ওষুধের অনিয়ন্ত্রিত ব্যবহার এবং অপ্রয়োজনীয় অ্যান্টিবায়োটিক সেবনের প্রবণতাও জনস্বাস্থ্যের জন্য একটি বড় হুমকি, যা ডিজিডিএ-এর কঠোর তদারকির অভাবে আরও জটিল আকার ধারণ করছে। এই পরিস্থিতি মোকাবেলায়, শুধুমাত্র চিকিৎসার দিকে মনোনিবেশ না করে, বরং জনস্বাস্থ্য শিক্ষা এবং সচেতনতা বৃদ্ধিতে বিনিয়োগ করা অপরিহার্য।

প্রতিষ্ঠানের নাম ভূমিকা সাম্প্রতিক ডেটা/সিদ্ধান্ত (২০২৩-২০২৪)
DGHS (স্বাস্থ্য অধিদপ্তর) রোগ নিয়ন্ত্রণ, স্বাস্থ্যসেবা পরিচালনা, জনস্বাস্থ্য কর্মসূচি বাস্তবায়ন। ২০২৩ সালে ডেঙ্গু আক্রান্তের সংখ্যা ছিল ৩ লক্ষ ২১ হাজার, যা পূর্ববর্তী বছরের তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ। ২০২৪ সালের প্রথম তিন মাসে প্রায় ২০ হাজার ডেঙ্গু রোগী শনাক্ত।
MOHFW (স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়) জাতীয় স্বাস্থ্য নীতি প্রণয়ন, স্বাস্থ্যখাতে বাজেট বরাদ্দ ও তত্ত্বাবধান। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে স্বাস্থ্যখাতে মোট বাজেট বরাদ্দ ছিল ৩৮,৫২ কোটি টাকা, যা জিডিপি'র ১.৬১%।
IEDCR (রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউট) সংক্রামক রোগের গবেষণা, রোগ নির্ণয় ও জনস্বাস্থ্য নজরদারি। ২০২৩ সালে শ্বাসতন্ত্রের বিভিন্ন ভাইরাসের (ইনফ্লুয়েঞ্জা, RSV) প্রায় ১৫,০০০ নমুনা পরীক্ষা, যার মধ্যে প্রায় ৩০% পজিটিভ শনাক্ত হয়েছে।
NIMH (জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট) মানসিক স্বাস্থ্য সেবা, গবেষণা ও জনসচেতনতা। কোভিড-১৯ পরবর্তী সময়ে মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যায় আক্রান্তদের সংখ্যা প্রায় ২০% বৃদ্ধি পেয়েছে, বিশেষত উদ্বেগ ও বিষণ্নতা।
DGDA (ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তর) ঔষধের মান নিয়ন্ত্রণ, উৎপাদন, আমদানি ও বিক্রয় লাইসেন্স প্রদান। ২০২৩ সালে প্রায় ৩০০টি ঔষধ উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানের লাইসেন্স নবায়ন ও মান যাচাই করা হয়েছে। প্রায় ৫০টি কোম্পানির বিরুদ্ধে মান লঙ্ঘনের অভিযোগে ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।

উৎস: স্বাস্থ্য অধিদপ্তর, স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়, আইইডিসিআর, জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট, ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তর, ২০২৩-২৪ সালের বার্ষিক প্রতিবেদন ও প্রেস রিলিজ।

সুপারিশ

  • রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউট (IEDCR)-এর অধীনে একটি 'জাতীয় মহামারী প্রস্তুতি ও প্রতিক্রিয়া কেন্দ্র' প্রতিষ্ঠা করা হোক, যা স্বাস্থ্য অধিদপ্তর (DGHS)-এর সাথে সরাসরি তথ্য বিনিময় প্রোটোকল মেনে কাজ করবে। এই কেন্দ্রটি 'সংক্রামক রোগ (প্রতিরোধ, নিয়ন্ত্রণ ও নির্মূল) আইন, ২০১৮'-এর আওতায় দ্রুত সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও বাস্তবায়নের ক্ষমতা পাবে।
  • স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয় (MOHFW) কর্তৃক একটি 'ব্যাপক জনস্বাস্থ্য সচেতনতা কর্মসূচি' চালু করা হোক, যা জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট (NIMH)-এর সহায়তায় মানসিক স্বাস্থ্য এবং ভুল তথ্যের প্রভাব মোকাবেলায় কাজ করবে। এই কর্মসূচি 'জাতীয় স্বাস্থ্য নীতি, ২০১১'-এর আলোকে প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা স্তরে কমিউনিটি ক্লিনিকগুলোর মাধ্যমে স্বাস্থ্য বার্তা ছড়িয়ে দেবে।
  • ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তর (DGDA)-কে শক্তিশালী করে 'ঔষধ আইন, ২০২২'-এর আওতায় অননুমোদিত ঔষধ বিক্রয়, অ্যান্টিবায়োটিকের অপব্যবহার এবং নকল ঔষধের বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণ করা হোক। এর জন্য নিয়মিত বাজার পর্যবেক্ষণ এবং অপরাধীদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির বিধান নিশ্চিত করা জরুরি।

✍️ নিবন্ধ লেখক: ডা. আসিফ মাহমুদ

ডা. আসিফ মাহমুদ 'আই নিউজ বিডি'-র একজন সিনিয়র সাংবাদিক ও বিষয়ভিত্তিক গবেষক। তাঁর বিশেষত্বের জায়গা: জনস্বাস্থ্য ও মহামারী প্রতিরোধ। এই নিবন্ধটি তাঁর নিজস্ব গবেষণা ও বিশ্লেষণ থেকে সংকলিত।

কোন মন্তব্য পাওয়া যায়নি


News Card Generator