সংক্রামক ও অসংক্রামক ব্যাধি নিয়ন্ত্রণ খাতে পরিবর্তনের ঢেউ: কারণ, প্রভাব ও প্রতিকার

ডা. তৌহিদ হাসান  avatar   
ডা. তৌহিদ হাসান
সংক্রামক ও অসংক্রামক ব্যাধি নিয়ন্ত্রণ খাতে পরিবর্তনের ঢেউ: কারণ, প্রভাব ও প্রতিকার
সংক্রামক ও অসংক্রামক ব্যাধি নিয়ন্ত্রণ খাতে পরিবর্তনের ঢেউ: কারণ, প্রভাব ও প্রতিকার
ছবি: সংগৃহীত

সম্প্রতি বিশ্বব্যাংকের (World Bank) এক প্রতিবেদনে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে সংক্রামক ব্যাধি নিয়ন্ত্রণে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি সত্ত্বেও, অসংক্রামক ব্যাধ...

সম্প্রতি বিশ্বব্যাংকের (World Bank) এক প্রতিবেদনে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে সংক্রামক ব্যাধি নিয়ন্ত্রণে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি সত্ত্বেও, অসংক্রামক ব্যাধি (NCDs) যেমন ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ, হৃদরোগ এবং ক্যান্সার দেশের স্বাস্থ্য খাতের ওপর ক্রমবর্ধমান চাপ সৃষ্টি করছে। সংস্থাটি উল্লেখ করেছে যে, গত দশকে সংক্রামক ব্যাধিজনিত মৃত্যুহার প্রায় ২০% কমে এলেও, একই সময়ে অসংক্রামক ব্যাধিজনিত মৃত্যুহার প্রায় ১৫% বৃদ্ধি পেয়েছে, যা দেশের জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনায় নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করছে। এই পরিবর্তনশীল স্বাস্থ্যচিত্র বাংলাদেশের স্বাস্থ্যসেবা কাঠামো, নীতি নির্ধারণ এবং বাজেট বরাদ্দের ওপর গভীর প্রভাব ফেলছে, যা দীর্ঘমেয়াদী টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে বাধা সৃষ্টি করতে পারে।

বাংলাদেশের স্বাস্থ্য খাতের এই পরিবর্তনের পেছনে রয়েছে বহুমুখী কারণ। প্রথমত, জীবনযাত্রার মান উন্নয়ন এবং গড় আয়ু বৃদ্ধির সাথে সাথে মানুষের খাদ্যাভ্যাসে পরিবর্তন এসেছে। প্রক্রিয়াজাত খাবার, অতিরিক্ত চিনি ও লবণের ব্যবহার এবং ফাস্ট ফুডের প্রতি ঝোঁক অসংক্রামক ব্যাধির ঝুঁকি বাড়াচ্ছে। একই সাথে, শহরায়ন এবং ডিজিটাল প্রযুক্তির প্রসারের ফলে শারীরিক শ্রমের অভাব ও স্থূলতা বৃদ্ধি পাচ্ছে। দ্বিতীয়ত, পরিবেশগত কারণ যেমন বায়ু দূষণ এবং পানি দূষণ ফুসফুসের রোগ এবং অন্যান্য দীর্ঘমেয়াদী অসুস্থতার কারণ হচ্ছে। স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয় কর্তৃক পরিচালিত এক সমীক্ষায় দেখা গেছে, শহরাঞ্চলের প্রায় ৪০% মানুষ পর্যাপ্ত শারীরিক ব্যায়াম করেন না, যা গ্রামীণ অঞ্চলের তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ। এই জীবনযাপন ও পরিবেশগত পরিবর্তনের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে স্বাস্থ্যসেবার অবকাঠামো এবং চিকিৎসকদের প্রশিক্ষণে এখনো যথেষ্ট আধুনিকীকরণ হয়নি, যা অসংক্রামক ব্যাধির ক্রমবর্ধমান চাপ মোকাবিলায় বড় ধরনের ঘাটতি তৈরি করছে। উদাহরণস্বরূপ, উপজেলা পর্যায়ে অসংক্রামক ব্যাধি স্ক্রিনিং এবং ব্যবস্থাপনার জন্য প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম ও প্রশিক্ষিত জনবলের অভাব প্রকট।

এই পরিবর্তনের প্রভাব সুদূরপ্রসারী এবং বহুমাত্রিক। অর্থনৈতিকভাবে, অসংক্রামক ব্যাধি দীর্ঘমেয়াদী চিকিৎসা ব্যয় এবং উৎপাদনশীলতা হ্রাসের মাধ্যমে দেশের অর্থনীতিকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে। বাংলাদেশ সরকার ও এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (ADB) এর যৌথ সমীক্ষা অনুযায়ী, অসংক্রামক ব্যাধিজনিত কারণে প্রতি বছর জিডিপি'র প্রায় ২% ক্ষতি হচ্ছে, যা সরাসরি স্বাস্থ্যসেবা ব্যয়, অকালমৃত্যু এবং কর্মক্ষমতা হ্রাসের ফল। সামাজিক দৃষ্টিকোণ থেকে, এসব ব্যাধি পরিবারগুলোর ওপর মানসিক ও আর্থিক চাপ সৃষ্টি করছে, বিশেষ করে দরিদ্র জনগোষ্ঠীর জন্য এটি একটি বড় বোঝা। স্বাস্থ্য খাতের ওপর চাপ বাড়ার কারণে সংক্রামক ব্যাধি নিয়ন্ত্রণ কর্মসূচীগুলোও ঝুঁকির মুখে পড়ছে, কারণ সীমিত সম্পদ উভয় দিকেই বন্টন করতে হচ্ছে। উপরন্তু, প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থায় অসংক্রামক ব্যাধি শনাক্তকরণ ও প্রতিরোধের জন্য পর্যাপ্ত বিনিয়োগের অভাব রয়েছে, যার ফলে রোগীরা প্রায়শই জটিল পর্যায়ে এসে চিকিৎসা নিতে বাধ্য হন, যা ব্যয়বহুল এবং কার্যকারিতায় কম। এই পরিস্থিতি দেশের সার্বিক স্বাস্থ্য সূচক এবং জনস্বাস্থ্যকে চ্যালেঞ্জের মুখে ঠেলে দিচ্ছে।

সূচক ২০১০ ২০২০ পরিবর্তন (শতাংশে)
সংক্রামক ব্যাধিজনিত মৃত্যুহার (প্রতি ১,০০,০০০ জনে) ২২০ ১৭৬ -২০%
অসংক্রামক ব্যাধিজনিত মৃত্যুহার (প্রতি ১,০০,০০০ জনে) ৪০০ ৪৬০ +১৫%
ডায়াবেটিস আক্রান্ত জনসংখ্যা (শতাংশে) ৫.৮% ৮.৫% +৪৬.৫%
উচ্চ রক্তচাপে আক্রান্ত জনসংখ্যা (শতাংশে) ২০.১% ২৫.৬% +২৭.৪%
স্বাস্থ্য খাতে অসংক্রামক ব্যাধি বাজেট বরাদ্দ (মোট স্বাস্থ্য বাজেটের শতাংশ) ১০% ১২% +২০%

উৎস: বিশ্বব্যাংক, বাংলাদেশ স্বাস্থ্য পরিসংখ্যান ব্যুরো (HSSB) এবং স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়

সুপারিশ

  • স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়কে 'জাতীয় অসংক্রামক ব্যাধি নিয়ন্ত্রণ কৌশলপত্র ২০৩০' এর অধীনে একটি সুনির্দিষ্ট বাজেট বরাদ্দ নিশ্চিত করতে হবে, যেখানে প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা স্তরে ব্যাপক স্ক্রিনিং, জীবনযাপন পরিবর্তনের ওপর কাউন্সিলিং এবং কমিউনিটি ক্লিনিকগুলোতে অত্যাবশ্যকীয় ঔষধের সহজলভ্যতা বাড়ানোর ওপর জোর দিতে হবে।
  • বাংলাদেশ সরকারকে 'জনস্বাস্থ্য আইন, ২০১৯' এর অধীনে তামাক, চিনি এবং প্রক্রিয়াজাত খাদ্যের ওপর বর্ধিত কর আরোপ করে একটি তহবিল গঠন করতে হবে, যা অসংক্রামক ব্যাধি প্রতিরোধ ও নিয়ন্ত্রণে গবেষণায় এবং স্বাস্থ্য কর্মীদের প্রশিক্ষণে ব্যবহৃত হবে।
  • বিশ্বব্যাংক এবং এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (ADB) এর সহায়তায়, সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়কে একটি জাতীয় ডিজিটাল স্বাস্থ্য প্ল্যাটফর্ম (যেমন: স্বাস্থ্য বাতায়ন) তৈরি ও সম্প্রসারণ করতে হবে, যা অসংক্রামক ব্যাধি রোগীদের তথ্য সংরক্ষণ, পর্যবেক্ষণ এবং দূরবর্তী পরামর্শ প্রদানে সক্ষম হবে, পাশাপাশি প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রগুলোকে উন্নত ডায়াগনস্টিক সরঞ্জাম সরবরাহ নিশ্চিত করবে।

✍️ নিবন্ধ লেখক: ডা. তৌহিদ হাসান

ডা. তৌহিদ হাসান 'আই নিউজ বিডি'-র একজন সিনিয়র সাংবাদিক ও বিষয়ভিত্তিক গবেষক। তাঁর বিশেষত্বের জায়গা: সংক্রামক ও অসংক্রামক ব্যাধি নিয়ন্ত্রণ। এই নিবন্ধটি তাঁর নিজস্ব গবেষণা ও বিশ্লেষণ থেকে সংকলিত।

কোন মন্তব্য পাওয়া যায়নি


News Card Generator