গত মার্চ মাসে আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রণালয় কর্তৃক প্রকাশিত বার্ষিক প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে যে, ভার্চুয়াল কোর্ট পরিচালনার জন্য প্রয়োজনীয় অবকাঠামো নির্মাণে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি সাধিত হয়েছে, যার ফলস্বরূপ গত তিন বছরে ৪ লক্ষাধিক মামলা নিষ্পত্তি হয়েছে। এই পরিসংখ্যান বিচার বিভাগের ডিজিটাল রূপান্তরের পথে একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক নির্দেশ করে, তবে এর গভীরতর বিশ্লেষণ প্রয়োজন। কেবল মামলার সংখ্যা নয়, বরং এই প্রক্রিয়ায় অন্তর্ভুক্ত প্রযুক্তিগত সীমাবদ্ধতা, মানবসম্পদ উন্নয়ন এবং আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের সাথে সঙ্গতি বিধানের চ্যালেঞ্জগুলিও আলোচনা করা আবশ্যক।
বাংলাদেশের বিচার ব্যবস্থায় ডিজিটাল রূপান্তর প্রক্রিয়াটি কোভিড-১৯ মহামারীর সময় জরুরি প্রয়োজন থেকে শুরু হলেও, বর্তমানে এটি একটি কাঠামোগত সংস্কারের রূপ নিয়েছে। ভার্চুয়াল কোর্ট অধ্যাদেশ, ২০২০ (পরবর্তীতে আইন হিসেবে পাশকৃত) বিচারিক কার্যক্রমকে অনলাইনে পরিচালনার আইনি ভিত্তি প্রদান করেছে। এই আইনের আওতায় সুপ্রিম কোর্ট এবং নিম্ন আদালত উভয় স্তরেই ভার্চুয়াল শুনানি ও জামিন আবেদন গ্রহণ করা হচ্ছে। World Bank-এর 'Digital Bangladesh' প্রকল্পের অধীনে বিচার বিভাগের সক্ষমতা বৃদ্ধিতে আর্থিক ও প্রযুক্তিগত সহায়তা প্রদান একটি উল্লেখযোগ্য দিক। তাদের সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, e-judiciary প্রকল্পগুলির জন্য প্রায় ৫০০ মিলিয়ন ডলারের তহবিল বরাদ্দ করা হয়েছে, যার উদ্দেশ্য হলো ডিজিটাল নথি ব্যবস্থাপনা, অনলাইন মামলা ট্র্যাকিং সিস্টেম এবং বিচারকদের জন্য আধুনিক প্রশিক্ষণ সুবিধা স্থাপন করা। তবে, এই প্রযুক্তিগত অবকাঠামো দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলের আদালতগুলিতে সমানভাবে পৌঁছানো এখনো একটি বড় চ্যালেঞ্জ, যেখানে ইন্টারনেট সংযোগের দুর্বলতা এবং বিদ্যুৎ সরবরাহের অনিয়মিত অবস্থা ডিজিটাল বিচার সেবাকে ব্যাহত করছে।
ডিজিটাল রূপান্তরের এই যাত্রায় বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক গৃহীত পদক্ষেপগুলির মধ্যে রয়েছে বিচারকদের জন্য তথ্যপ্রযুক্তি প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা এবং আদালত প্রাঙ্গণে আধুনিক হার্ডওয়্যার ও সফটওয়্যার স্থাপন। যদিও এই উদ্যোগগুলি প্রশংসনীয়, তবে প্রশিক্ষিত মানবসম্পদের অভাব এবং সিস্টেম রক্ষণাবেক্ষণের জন্য পর্যাপ্ত কারিগরি সহায়তা নিশ্চিত করা এখনো একটি প্রধান দুর্বলতা। Asian Development Bank (ADB) তাদের 'Strengthening Governance and Legal Reforms Program' এর আওতায় বিচার বিভাগের কর্মীদের জন্য ডিজিটাল লিটারেসি ও সাইবার নিরাপত্তা বিষয়ে প্রশিক্ষণ প্রদানের জন্য প্রায় ৫০ মিলিয়ন ডলারের একটি প্রকল্প হাতে নিয়েছে। এই প্রকল্পের লক্ষ্য হলো বিচারক, আইনজীবী এবং আদালত কর্মচারীদের ডিজিটাল দক্ষতা বৃদ্ধি করা, যা অনলাইন বিচার ব্যবস্থার কার্যকর পরিচালনায় অপরিহার্য। তবে, এই প্রশিক্ষণ কর্মসূচির কার্যকারিতা এবং এর মাধ্যমে অর্জিত দক্ষতার দীর্ঘমেয়াদী প্রয়োগ নিশ্চিত করার জন্য একটি সুসংহত মূল্যায়ন পদ্ধতির অভাব পরিলক্ষিত হয়। অনেক ক্ষেত্রে, নতুন প্রযুক্তি স্থাপন করা হলেও এর পূর্ণাঙ্গ ব্যবহার বা রক্ষণাবেক্ষণের জন্য প্রয়োজনীয় জ্ঞান ও দক্ষতার অভাবে তা অকেজো হয়ে পড়ছে, যা বিনিয়োগের সদ্ব্যবহারকে প্রশ্নবিদ্ধ করছে।
| সূচক | ২০২০ | ২০২১ | ২০২২ | ২০২৩ |
|---|---|---|---|---|
| ভার্চুয়াল কোর্টে নিষ্পত্তিকৃত মামলার সংখ্যা | ১,২০,৬৫০ | ১,৪০,১০০ | ১,৬০,৩৫০ | ১,৮৫,৭০০ |
| অনলাইন জামিন আবেদন | ৪৫,২০০ | ৬৫,৩০০ | ৭৮,৫০০ | ৯২,৪৫০ |
| ডিজিটাল নথি ব্যবস্থাপনার আওতাভুক্ত আদালতের শতাংশ | ১৫% | ২৫% | ৩৫% | ৫০% |
| বিচারকদের জন্য আইটি প্রশিক্ষণে অংশগ্রহণকারীর সংখ্যা | ২,৫০০ | ৩,৮০০ | ৫,২০০ | ৬,৫০০ |
উৎস: আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রণালয়; World Bank; ADB
সুপারিশ
- বিচার বিভাগের ডিজিটাল অবকাঠামো উন্নয়নের জন্য আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রণালয় এবং তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিভাগকে সমন্বিতভাবে একটি পাঁচ বছর মেয়াদী 'জাতীয় ই-বিচার কৌশলপত্র' প্রণয়ন করতে হবে, যেখানে সাইবার নিরাপত্তা আইন, ২০২৩ এর অধীনে ডাটা সুরক্ষা ও গোপনীয়তা নিশ্চিত করার সুনির্দিষ্ট কর্মপরিকল্পনা অন্তর্ভুক্ত থাকবে।
- বাংলাদেশ জুডিশিয়াল সার্ভিস কমিশনকে সকল বিচারকের জন্য প্রতি বছর বাধ্যতামূলকভাবে অন্তত দুটি করে উন্নত প্রযুক্তিগত প্রশিক্ষণ মডিউল (যেমন – কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা চালিত কেস ম্যানেজমেন্ট, ডিজিটাল ফরেনসিকস) চালু করতে হবে, যার সফল সমাপ্তি পদোন্নতির অন্যতম মানদণ্ড হিসেবে বিবেচিত হবে।
- World Bank ও ADB-এর আর্থিক সহায়তায় চলমান প্রকল্পগুলোর স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে একটি স্বাধীন 'প্রকল্প মূল্যায়ন ও নিরীক্ষা কমিটি' গঠন করতে হবে, যা বাংলাদেশ সরকারের অর্থ মন্ত্রণালয়ের সরাসরি তত্ত্বাবধানে কাজ করবে এবং প্রতি ৬ মাস অন্তর জনসম্মুখে অগ্রগতি প্রতিবেদন প্রকাশ করবে।