বাংলাদেশের ভেজাল খাদ্য ও ফুড সেফটি ল্যাব: সংকট, সম্ভাবনা ও করণীয়

আকমল হোসেন  avatar   
আকমল হোসেন
বাংলাদেশের ভেজাল খাদ্য ও ফুড সেফটি ল্যাব: সংকট, সম্ভাবনা ও করণীয়
বাংলাদেশের ভেজাল খাদ্য ও ফুড সেফটি ল্যাব: সংকট, সম্ভাবনা ও করণীয়
ছবি: সংগৃহীত

সম্প্রতি বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ (BFSA) কর্তৃক পরিচালিত এক অভিযানে দেখা গেছে, রাজধানী ঢাকার কাঁচাবাজার ও সুপার শপগুলোতে বিক্রি হওয়া প্রায় ৩০% ফল ও ...

সম্প্রতি বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ (BFSA) কর্তৃক পরিচালিত এক অভিযানে দেখা গেছে, রাজধানী ঢাকার কাঁচাবাজার ও সুপার শপগুলোতে বিক্রি হওয়া প্রায় ৩০% ফল ও সবজিতে মাত্রাতিরিক্ত কীটনাশক ও ফরমালিন রয়েছে, যা জনস্বাস্থ্যের জন্য মারাত্মক হুমকি। এই উদ্বেগজনক চিত্র খাদ্যপণ্যের মান নিয়ন্ত্রণে বাংলাদেশের বিদ্যমান ল্যাবরেটরি ব্যবস্থার দুর্বলতা এবং ভেজাল খাদ্য প্রতিরোধের চ্যালেঞ্জগুলোকে আবারও সামনে এনেছে। প্রতি বছর কোটি কোটি টাকা স্বাস্থ্য খাতে ব্যয় হলেও, খাদ্যের উৎস মুখে এই ধরনের ভেজাল প্রতিরোধে কার্যকর পদক্ষেপের অভাব সামগ্রিক জনস্বাস্থ্যের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে, বিশেষ করে শিশুদের মধ্যে দীর্ঘমেয়াদী রোগব্যাধির ঝুঁকি বাড়াচ্ছে।

বাংলাদেশের খাদ্য নিরাপত্তা পরিস্থিতি এক জটিল সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে, যেখানে ভেজাল খাদ্য উৎপাদকরা প্রায়শই আইনের ফাঁক গলে বেরিয়ে যাচ্ছে। ফুড সেফটি ল্যাবরেটরিগুলো, যা খাদ্য পণ্যের মান যাচাই ও ভেজাল শনাক্তকরণের মূল স্তম্ভ, সেগুলো আধুনিক সরঞ্জাম, প্রশিক্ষিত জনবল এবং পর্যাপ্ত অর্থায়নের অভাবে ধুঁকছে। বাংলাদেশ বিজ্ঞান ও শিল্প গবেষণা পরিষদ (BCSIR), জনস্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট (IPH) এবং কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট (BARI)-এর অধীনে কিছু ল্যাব থাকলেও, তাদের সক্ষমতা দেশের বিশাল খাদ্য বাজারের চাহিদা পূরণের জন্য যথেষ্ট নয়। উদাহরণস্বরূপ, BFSCA-এর নিজস্ব ল্যাবরেটরি থাকলেও, তা এখনও পূর্ণাঙ্গভাবে কার্যকর নয় এবং অনেক জটিল পরীক্ষার জন্য বেসরকারি বা বিদেশি ল্যাবের ওপর নির্ভর করতে হয়। World Bank-এর এক সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, বাংলাদেশের ফুড সেফটি ল্যাবগুলোর মধ্যে মাত্র ১৫% আন্তর্জাতিক মান (ISO 17025) মেনে চলে, যা খাদ্য রপ্তানির ক্ষেত্রেও বড় বাধা সৃষ্টি করছে এবং দেশের অভ্যন্তরেও ভোক্তার আস্থা অর্জনে ব্যর্থ হচ্ছে। এই দুর্বল অবকাঠামো এবং সক্ষমতার অভাবের কারণে প্রায়শই ভেজাল খাদ্য উৎপাদকরা শাস্তির আওতার বাইরে থেকে যাচ্ছে, যা তাদের আরও বেপরোয়া করে তুলছে।

এই সংকট নিরসনে একটি সমন্বিত ও বহু-স্তরীয় পদ্ধতির প্রয়োজন। শুধুমাত্র ল্যাবরেটরির সংখ্যা বৃদ্ধি নয়, বরং বিদ্যমান ল্যাবগুলোর আধুনিকীকরণ, আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী ল্যাব কর্মীদের প্রশিক্ষণ এবং দ্রুত ফলাফল প্রদানের সক্ষমতা বৃদ্ধি অত্যাবশ্যক। ADB (Asian Development Bank) সম্প্রতি 'Food Safety Improvement Project'-এর অধীনে বাংলাদেশকে ১০০ মিলিয়ন ডলার ঋণ সহায়তা প্রদানের প্রস্তাব করেছে, যার একটি বড় অংশ ফুড সেফটি ল্যাবগুলোর সক্ষমতা বৃদ্ধিতে ব্যয় করার কথা বলা হয়েছে। এই অর্থ সঠিকভাবে ব্যবহার করে অত্যাধুনিক GC-MS (Gas Chromatography-Mass Spectrometry), HPLC (High-Performance Liquid Chromatography) এবং Atomic Absorption Spectrophotometer (AAS)-এর মতো যন্ত্রাংশ সংগ্রহ করা সম্ভব, যা জটিল ভেজাল যেমন ভারী ধাতু, কীটনাশকের অবশিষ্টাংশ এবং অ্যান্টিবায়োটিকের উপস্থিতি নির্ভুলভাবে শনাক্ত করতে পারে। এছাড়াও, প্রান্তিক পর্যায়ে খাদ্য উৎপাদনকারীদের মধ্যে সচেতনতা বৃদ্ধি এবং নিরাপদ খাদ্য উৎপাদন পদ্ধতির প্রচারে কৃষি মন্ত্রণালয় ও মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের ভূমিকা আরও জোরালো করতে হবে। বাংলাদেশ সরকার ইতোমধ্যে নিরাপদ খাদ্য আইন, ২০১৩ প্রণয়ন করেছে, কিন্তু এর বাস্তবায়ন এখনও কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় পৌঁছায়নি, যা আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলোর দুর্বল সমন্বয় এবং বিচার প্রক্রিয়ার দীর্ঘসূত্রিতার কারণে ব্যাহত হচ্ছে।

প্রতিষ্ঠানের নাম মোট ল্যাব সংখ্যা আন্তর্জাতিক মান (ISO 17025) প্রাপ্ত ল্যাব বার্ষিক নমুনা পরীক্ষার সক্ষমতা (আনুমানিক) প্রধান চ্যালেঞ্জ
বাংলাদেশ বিজ্ঞান ও শিল্প গবেষণা পরিষদ (BCSIR) ৮ (বিভিন্ন কেন্দ্রে) ২৫,০০০ আধুনিক যন্ত্রপাতির অভাব, জনবল সংকট
জনস্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট (IPH) ১০,০০০ অর্থায়ন সংকট, পুরাতন যন্ত্রপাতি
কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট (BARI) ৮,০০০ কৃষি পণ্যে সীমাবদ্ধতা, সমন্বয়ের অভাব
বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ (BFSA) ১ (কেন্দ্রীয়) ০ (প্রক্রিয়াধীন) ৫,০০০ পূর্ণাঙ্গ কার্যকারিতার অভাব, জনবল নিয়োগে ধীরগতি
মৎস্য অধিদপ্তর ৬ (বিভিন্ন জেলায়) ১২,০০০ বিশেষায়িত পরীক্ষার অভাব, সক্ষমতার সীমাবদ্ধতা

উৎস: সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়, World Bank, এবং বিভিন্ন গবেষণা প্রতিবেদন (২০২২-২০২৩ সালের তথ্যভিত্তিক)

সুপারিশ

  • বাংলাদেশের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়, কৃষি মন্ত্রণালয় এবং মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের সমন্বয়ে একটি জাতীয় ফুড সেফটি ল্যাবরেটরি নেটওয়ার্ক প্রতিষ্ঠা করা। এই নেটওয়ার্কের অধীনে বিদ্যমান ল্যাবগুলোকে ISO 17025 মানদণ্ডে উন্নীত করতে World Bank এবং ADB-এর আর্থিক সহায়তা ব্যবহার করে আধুনিক যন্ত্রপাতি ও প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বৃদ্ধি করতে হবে এবং বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ (BFSA)-এর তত্ত্বাবধানে একটি কেন্দ্রীয় ডেটাবেজ তৈরি করতে হবে।
  • বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক প্রণীত নিরাপদ খাদ্য আইন, ২০১৩-এর কঠোর প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে। এর অংশ হিসেবে, আইন প্রয়োগকারী সংস্থা (যেমন র‍্যাব, পুলিশ) এবং BFSA-এর কর্মকর্তাদের জন্য নিয়মিত প্রশিক্ষণ কর্মসূচির আয়োজন করতে হবে, যেখানে ভেজাল শনাক্তকরণের অত্যাধুনিক পদ্ধতি এবং আইনগত প্রক্রিয়াজাতকরণ সম্পর্কে বিশদ ধারণা দেওয়া হবে। এছাড়াও, দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনাল গঠন করে ভেজাল খাদ্য সংক্রান্ত মামলাগুলো দ্রুত নিষ্পত্তি করার ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।
  • জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর এবং বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ (BFSA)-এর যৌথ উদ্যোগে একটি জাতীয় জনসচেতনতা কর্মসূচি চালু করা। এই কর্মসূচির মাধ্যমে উৎপাদনকারী, বিক্রেতা এবং ভোক্তা — সকল স্তরের মানুষকে নিরাপদ খাদ্যের গুরুত্ব, ভেজাল খাদ্যের স্বাস্থ্যঝুঁকি এবং বিদ্যমান আইন সম্পর্কে অবহিত করতে হবে। বিশেষ করে, স্থানীয় পর্যায়ের বাজার কমিটি এবং জনপ্রতিনিধিদের সম্পৃক্ত করে খাদ্য উৎপাদন ও বিপণন প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার জন্য একটি প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো তৈরি করতে হবে।

✍️ নিবন্ধ লেখক: আকমল হোসেন

আকমল হোসেন 'আই নিউজ বিডি'-র একজন সিনিয়র সাংবাদিক ও বিষয়ভিত্তিক গবেষক। তাঁর বিশেষত্বের জায়গা: ভেজাল খাদ্য ও ফুড সেফটি ল্যাব। এই নিবন্ধটি তাঁর নিজস্ব গবেষণা ও বিশ্লেষণ থেকে সংকলিত।

কোন মন্তব্য পাওয়া যায়নি


News Card Generator