বাংলাদেশের ভেজাল খাদ্য ও ফুড সেফটি ল্যাব: সংকট, সম্ভাবনা ও করণীয়

আকমল হোসেন  avatar   
আকমল হোসেন
বাংলাদেশের ভেজাল খাদ্য ও ফুড সেফটি ল্যাব: সংকট, সম্ভাবনা ও করণীয়
বাংলাদেশের ভেজাল খাদ্য ও ফুড সেফটি ল্যাব: সংকট, সম্ভাবনা ও করণীয়
ছবি: সংগৃহীত

সম্প্রতি, বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ (BFSA) কর্তৃক পরিচালিত এক অভিযানে রাজধানীর গুলশান এলাকার একটি অভিজাত রেস্তোরাঁর রান্নাঘরে মেয়াদোত্তীর্ণ ও পচা খাদ্য...

সম্প্রতি, বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ (BFSA) কর্তৃক পরিচালিত এক অভিযানে রাজধানীর গুলশান এলাকার একটি অভিজাত রেস্তোরাঁর রান্নাঘরে মেয়াদোত্তীর্ণ ও পচা খাদ্যসামগ্রী ব্যবহারের প্রমাণ মিলেছে, যা জনস্বাস্থ্য সুরক্ষায় বিদ্যমান কাঠামোগত দুর্বলতাকে আবারও স্পষ্ট করে তুলেছে। এই ঘটনা কেবল একটি বিচ্ছিন্ন চিত্র নয়, বরং দেশের খাদ্য নিরাপত্তা ব্যবস্থায় ব্যাপক ভেজাল খাদ্য চক্রের উপস্থিতি এবং কার্যকর ফুড সেফটি ল্যাবের অপ্রতুলতার গভীর সংকটের প্রতিচ্ছবি। একই সময়ে, বিশ্বব্যাংকের এক প্রতিবেদন অনুযায়ী, বাংলাদেশে প্রতি বছর খাদ্যজনিত অসুস্থতার কারণে প্রায় ৪.৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলার সমপরিমাণ অর্থনৈতিক ক্ষতি হয়, যা জিডিপির প্রায় ২ শতাংশের কাছাকাছি। এই পরিসংখ্যানগুলি কেবল অর্থনৈতিক ক্ষতির চিত্রই তুলে ধরে না, বরং খাদ্য ভেজালের কারণে সৃষ্ট দীর্ঘমেয়াদী স্বাস্থ্যগত ঝুঁকির ভয়াবহতাও নির্দেশ করে। দেশের প্রায় ৮০ শতাংশ খাদ্যপণ্যে কোনো না কোনোভাবে ভেজাল মেশানো হচ্ছে বলে বিভিন্ন গবেষণায় উঠে এসেছে, যার মধ্যে ফরমালিন, কার্বাইড, টেক্সটাইল ডাই ও কীটনাশকের মতো ক্ষতিকারক রাসায়নিক পদার্থ উল্লেখযোগ্য। এই ভেজাল শুধু ভোক্তাদের তাৎক্ষণিক অসুস্থতার কারণই নয়, বরং ক্যান্সার, কিডনি রোগ এবং স্নায়বিক বৈকল্যের মতো দীর্ঘমেয়াদী জটিল রোগের ঝুঁকিও বাড়াচ্ছে।

এই ভয়াবহ পরিস্থিতির মূল কারণগুলির মধ্যে অন্যতম হলো আধুনিক ও পর্যাপ্ত ফুড সেফটি ল্যাবের অভাব এবং বিদ্যমান ল্যাবগুলির সক্ষমতার ঘাটতি। বর্তমানে দেশে বাংলাদেশ স্ট্যান্ডার্ডস অ্যান্ড টেস্টিং ইনস্টিটিউশন (BSTI), বিজ্ঞান ও শিল্প গবেষণা পরিষদ (BCSIR) এবং কিছু বিশ্ববিদ্যালয়ের ল্যাবসহ মোট প্রায় ৩৫-৪০টি ল্যাব খাদ্য পরীক্ষা-নিরীক্ষার কাজ করলেও, সেগুলোর বেশিরভাগই আধুনিক যন্ত্রপাতি, পর্যাপ্ত প্রশিক্ষিত জনবল এবং আন্তর্জাতিক মানের স্বীকৃতিপ্রাপ্ত পদ্ধতির অভাবে ধুঁকছে। উদাহরণস্বরূপ, BSTI-এর ল্যাবগুলিতে প্রতিদিন গড়ে সর্বোচ্চ ১০০-১৫০টি নমুনা পরীক্ষা করা সম্ভব হয়, যেখানে দেশের বিশাল জনসংখ্যার জন্য প্রতিদিন হাজার হাজার খাদ্যপণ্যের নমুনা পরীক্ষা করা অপরিহার্য। উপরন্তু, ল্যাবগুলির ভৌগোলিক বিস্তারও অত্যন্ত সীমিত; বেশিরভাগ ল্যাবই ঢাকা ও চট্টগ্রাম কেন্দ্রিক, যার ফলে প্রত্যন্ত অঞ্চলের খাদ্যপণ্যের গুণগত মান যাচাই করা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ে। এমনকি অনেক ল্যাবে অত্যাধুনিক ক্রোম্যাটোগ্রাফি ও স্পেকট্রোস্কোপি যন্ত্রপাতির অভাব রয়েছে, যা জটিল রাসায়নিক ভেজাল শনাক্তকরণের জন্য অপরিহার্য। এই সীমাবদ্ধতাগুলি ভেজালকারীদের জন্য এক প্রকার সবুজ সংকেত হিসেবে কাজ করছে, কারণ তারা জানে যে তাদের পণ্য পরীক্ষার আওতায় আসার সম্ভাবনা খুবই কম এবং ধরা পড়লেও প্রমাণ করা কঠিন হবে।

খাদ্য নিরাপত্তা ব্যবস্থার এই দুর্বলতা শুধু ল্যাবের অবকাঠামোগত ঘাটতিতেই সীমাবদ্ধ নয়, বরং আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলির সমন্বয়হীনতা এবং আইনি প্রক্রিয়ার দীর্ঘসূত্রতাও এর জন্য দায়ী। বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য আইন, ২০১৩ এবং এর অধীনে প্রণীত বিধিমালাগুলি যথেষ্ট শক্তিশালী হলেও, সেগুলোর বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া প্রায়শই দুর্বল থাকে। অ্যাডমিনিস্ট্রেটিভ কস্ট (Administrative Cost) এবং আইনি জটিলতার কারণে অনেক সময় ছোট ভেজালকারীদের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব হয় না। এশিয়ান ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক (ADB) পরিচালিত একটি সমীক্ষায় দেখা গেছে, খাদ্য নিরাপত্তা সংক্রান্ত মামলা নিষ্পত্তিতে গড়ে প্রায় ২-৩ বছর সময় লাগে, যা অপরাধীদের উৎসাহিত করে এবং জনমনে আস্থার সংকট তৈরি করে। উপরন্তু, সরকারের সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়, যেমন খাদ্য মন্ত্রণালয়, স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়, এবং কৃষি মন্ত্রণালয়ের মধ্যে কার্যকর সমন্বয়ের অভাব প্রায়শই দেখা যায়, যা খাদ্য উৎপাদন থেকে শুরু করে ভোক্তা পর্যন্ত পুরো সাপ্লাই চেইনে মনিটরিং ব্যবস্থাকে দুর্বল করে তোলে। উদাহরণস্বরূপ, কীটনাশক ও রাসায়নিকের ব্যবহার তদারকির দায়িত্ব কৃষি মন্ত্রণালয়ের, খাদ্য প্রক্রিয়াকরণের মান তদারকির দায়িত্ব শিল্প মন্ত্রণালয়ের এবং চূড়ান্ত পণ্য তদারকির দায়িত্ব নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের। এই বহুমুখী দায়িত্বের কারণে অনেক সময় ফাঁক তৈরি হয়, যা ভেজালকারীরা কাজে লাগায়।

খাদ্য নিরাপত্তা সংক্রান্ত সূচক ২০১৭ ২০১৯ ২০২২ উন্নতির হার (২০১৭-২০২২)
জাতিসংঘের খাদ্য নিরাপত্তা সূচক (GFSI) ৫৭.২ ৬০.৮ ৬৪.৫ +৭.৩
খাদ্য ভেজাল শনাক্তকরণ ল্যাবের সংখ্যা ২২ ২৯ ৩৫ +১৩
প্রতি বছর পরীক্ষিত খাদ্য নমুনার সংখ্যা (লক্ষ) ১.৫ ২.১ ৩.২ +১.৭
খাদ্যজনিত অসুস্থতায় অর্থনৈতিক ক্ষতি (বিলিয়ন USD) ৪.৮ ৪.৬ ৪.৫ -০.৩
ফুড সেফটি কর্মকর্তাদের প্রশিক্ষণ হার (%) ৪৫% ৫৫% ৬২% +১৭%

উৎস: বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ (BFSA), বিশ্বব্যাংক এবং জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা (FAO) এর প্রতিবেদন থেকে সংগৃহীত।

সুপারিশ

  • বাংলাদেশ সরকার অবিলম্বে বিদ্যমান সকল খাদ্য পরীক্ষাগার, বিশেষ করে বাংলাদেশ বিজ্ঞান ও শিল্প গবেষণা পরিষদ (BCSIR) এবং বাংলাদেশ স্ট্যান্ডার্ডস অ্যান্ড টেস্টিং ইনস্টিটিউশন (BSTI)-এর ল্যাবগুলিকে আন্তর্জাতিক মান ISO/IEC 17025 অনুযায়ী আপগ্রেড করার জন্য একটি সুনির্দিষ্ট সময়বদ্ধ কর্মপরিকল্পনা প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন করবে। এর পাশাপাশি, প্রতিটি জেলায় অন্তত একটি করে পূর্ণাঙ্গ ও আধুনিক ফুড টেস্টিং ল্যাব স্থাপনের জন্য খাদ্য মন্ত্রণালয় একটি প্রকল্প গ্রহণ করবে এবং প্রয়োজনীয় বাজেট বরাদ্দ নিশ্চিত করবে।
  • বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ (BFSA) এবং স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয় যৌথভাবে 'জাতীয় খাদ্য নিরাপত্তা মনিটরিং ও এনফোর্সমেন্ট টাস্কফোর্স' গঠন করবে, যার আওতায় মোবাইল কোর্ট পরিচালনার ক্ষমতা বৃদ্ধি করা হবে এবং ভেজালকারীদের বিরুদ্ধে বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য আইন, ২০১৩ এর অধীনে দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনাল গঠন করে সর্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিত করার প্রক্রিয়া সহজ করা হবে। এই টাস্কফোর্সকে নিয়মিতভাবে তথ্য আদান-প্রদানের জন্য একটি সমন্বিত ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম তৈরি করতে হবে।
  • বিশ্বব্যাংক এবং এশিয়ান ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক (ADB) এর আর্থিক ও কারিগরি সহায়তায়, কৃষি মন্ত্রণালয়, শিল্প মন্ত্রণালয় এবং বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ (BFSA) যৌথভাবে খাদ্য উৎপাদনকারী কৃষক, প্রক্রিয়াজাতকারী শিল্প এবং খুচরা বিক্রেতাদের জন্য 'ভালো কৃষি পদ্ধতি' (Good Agricultural Practices - GAP) এবং 'ভালো উৎপাদন পদ্ধতি' (Good Manufacturing Practices - GMP) এর উপর ব্যাপক প্রশিক্ষণ কর্মসূচি চালু করবে। এই কর্মসূচির অংশ হিসেবে, খাদ্যশৃঙ্খলের প্রতিটি ধাপে মান নিয়ন্ত্রণের জন্য একটি বাধ্যতামূলক সার্টিফিকেশন সিস্টেম চালু করতে হবে এবং এর ব্যত্যয়ে কঠোর শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে।

✍️ নিবন্ধ লেখক: আকমল হোসেন

আকমল হোসেন 'আই নিউজ বিডি'-র একজন সিনিয়র সাংবাদিক ও বিষয়ভিত্তিক গবেষক। তাঁর বিশেষত্বের জায়গা: ভেজাল খাদ্য ও ফুড সেফটি ল্যাব। এই নিবন্ধটি তাঁর নিজস্ব গবেষণা ও বিশ্লেষণ থেকে সংকলিত।

কোন মন্তব্য পাওয়া যায়নি


News Card Generator