গত ৩রা মে, ২০২৪ তারিখে প্রকাশিত বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন (ইউজিসি)-এর সর্বশেষ বার্ষিক প্রতিবেদনে দেখা গেছে, দেশের ৪৬টি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে মাত্র ১৭টি বিশ্ববিদ্যালয় গত অর্থ বছরে (২০২২-২৩) গবেষণা খাতে বরাদ্দকৃত অর্থের ৫০ শতাংশেরও বেশি ব্যয় করতে সক্ষম হয়েছে। এই তথ্য শুধু একটি পরিসংখ্যান নয়, বরং বাংলাদেশের গবেষণা ও উন্নয়ন (R&D) খাতের ভেতরের চিত্র উন্মোচন করে, যেখানে বরাদ্দকৃত অর্থের ব্যবহার এবং মাঠ পর্যায়ের গবেষণা কার্যক্রমে পদ্ধতিগত দুর্বলতা প্রকট। যেখানে দেশের উচ্চশিক্ষা ও শিল্প খাতের মধ্যে গবেষণা-ভিত্তিক সেতুবন্ধন তৈরির কথা, সেখানে এই অনুপাত আশানুরূপ নয়, যা আমাদের জাতীয় অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি এবং বৈশ্বিক প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতা অর্জনে বড় বাধা হিসেবে প্রতীয়মান হচ্ছে। বিশেষত, চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় প্রযুক্তিগত উদ্ভাবন এবং দক্ষ মানবসম্পদ তৈরিতে R&D-এর ভূমিকা অনস্বীকার্য হলেও, এই চিত্র ইঙ্গিত দেয় যে আমরা এখনও সেই কাঙ্ক্ষিত গতি অর্জন করতে পারিনি।
এই সীমাবদ্ধতার মূলে রয়েছে অর্থায়নের অপ্রতুলতা এবং বরাদ্দকৃত অর্থের কার্যকর ব্যবহার নিশ্চিত করার কাঠামোগত দুর্বলতা। যদিও সরকার প্রতি বছর R&D খাতে বাজেট বরাদ্দ বাড়াচ্ছে, যেমন, ন্যাশনাল স্কিলস ডেভেলপমেন্ট অথরিটি (NSDA) তাদের 'ন্যাশনাল স্কিলস ডেভেলপমেন্ট পলিসি ২০২০'-এর অধীনে কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষা ও প্রশিক্ষণে (TVET) গবেষণার ওপর জোর দিচ্ছে, কিন্তু মাঠ পর্যায়ে এর বাস্তবায়ন প্রায়শই বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে, গবেষণা প্রস্তাবনা প্রণয়ন, অনুমোদন প্রক্রিয়া এবং অর্থ ছাড়ের দীর্ঘসূত্রিতা গবেষকদের নিরুৎসাহিত করে। এছাড়া, গবেষণা প্রকল্পগুলোর ফলাফল শিল্প বা সমাজের বাস্তব প্রয়োজনে কতটুকু কাজে লাগছে, তার একটি নিয়মিত মূল্যায়ন এবং ফলো-আপ মেকানিজমের অভাব রয়েছে। কারিগরি শিক্ষা অধিদপ্তর (DTE) এবং Skills for Employment Investment Program (SEIP)-এর মতো প্রতিষ্ঠানগুলো দক্ষতা উন্নয়নের জন্য বিভিন্ন প্রকল্প হাতে নিলেও, এই প্রকল্পগুলোর মাধ্যমে উদ্ভাবিত প্রযুক্তি বা জ্ঞানের বাণিজ্যিকীকরণ এবং শিল্পে তার প্রয়োগের ক্ষেত্রে ব্যাপক ঘাটতি পরিলক্ষিত হয়। এর ফলে, গবেষণাগারে অর্জিত জ্ঞান অনেক ক্ষেত্রেই সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রায় বা অর্থনীতির মূল ধারায় সংযুক্ত হতে পারছে না, যা R&D-এর মূল উদ্দেশ্যকেই ব্যাহত করছে।
গবেষণার মান এবং প্রাসঙ্গিকতার দিক থেকেও বেশ কিছু চ্যালেঞ্জ বিদ্যমান। BANBEIS (বাংলাদেশ শিক্ষা তথ্য ও পরিসংখ্যান ব্যুরো)-এর তথ্য অনুযায়ী, উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে প্রকাশিত গবেষণাপত্রের সংখ্যা বৃদ্ধি পেলেও, আন্তর্জাতিক মানের জার্নালে প্রকাশিত গবেষণাপত্রের সংখ্যা এবং পেটেন্ট নিবন্ধনের হার এখনও অনেক কম। এর একটি কারণ হলো, গবেষণা প্রকল্পগুলো প্রায়শই মৌলিক বা প্রায়োগিক গবেষণার পরিবর্তে কেবল ডিগ্রি অর্জনের উদ্দেশ্যেই পরিচালিত হয়, যার ফলে শিল্প বা জাতীয় অগ্রাধিকারের সঙ্গে এর সম্পর্ক দুর্বল থাকে। দেশের শিল্প খাত এবং গবেষণা প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে কার্যকর সংযোগের অভাবও একটি বড় সমস্যা। অনেক শিল্প প্রতিষ্ঠান নিজস্ব R&D ইউনিটে বিনিয়োগ না করে বিদেশি প্রযুক্তির ওপর নির্ভরশীল, যা দেশের অভ্যন্তরীণ উদ্ভাবনী সক্ষমতাকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে। অন্যদিকে, গবেষকরাও শিল্প খাতের সুনির্দিষ্ট চাহিদা সম্পর্কে পর্যাপ্ত ওয়াকিবহাল নন, যার ফলে তাদের গবেষণাগুলো শিল্প-বান্ধব হয় না। এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্য গবেষণা সংস্কৃতিতে পরিবর্তন আনা এবং শিল্প-একাডেমিক অংশীদারিত্ব জোরদার করা অপরিহার্য।
| খাত | ২০১৮-১৯ অর্থ বছর (ব্যয়কৃত অর্থ) | ২০২২-২৩ অর্থ বছর (ব্যয়কৃত অর্থ) | পরিবর্তনের হার (%) | উল্লেখযোগ্য প্রতিষ্ঠান |
|---|---|---|---|---|
| ইউজিসি-এর মাধ্যমে বিশ্ববিদ্যালয় গবেষণা | ৳ ১৫০ কোটি | ৳ ২০০ কোটি | +৩৩.৩৩% | ইউজিসি |
| কারিগরি শিক্ষা গবেষণা ও উন্নয়ন | ৳ ২০ কোটি | ৳ ৩৫ কোটি | +৭৫% | কারিগরি শিক্ষা অধিদপ্তর, NSDA |
| SEIP এর অধীনে দক্ষতা উন্নয়ন গবেষণা | ৳ ১৫ কোটি | ৳ ২৫ কোটি | +৬৬.৬৭% | SEIP |
| মোট জাতীয় R&D ব্যয় (আনুমানিক) | ৳ ৪৫০ কোটি | ৳ ৬০০ কোটি | +৩৩.৩৩% | বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও সংস্থা |
উৎস: ইউজিসি বার্ষিক প্রতিবেদন (২০১৯, ২০২৩), কারিগরি শিক্ষা অধিদপ্তর ও SEIP এর বাজেট ও কার্যক্রম পর্যালোচনা (২০২২-২৩)।
সুপারিশ
- জাতীয় গবেষণা ও উদ্ভাবন নীতি (National Research and Innovation Policy) প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন করা, যেখানে ইউজিসি, NSDA এবং শিল্প প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিদের সমন্বয়ে একটি কেন্দ্রীয় কমিটি গঠন করে গবেষণা প্রকল্প অনুমোদন ও অর্থায়নের প্রক্রিয়াকে আরও স্বচ্ছ ও দ্রুত করা হবে এবং গবেষণা ফলাফল বাণিজ্যিকীকরণের জন্য একটি নির্দিষ্ট কর্মপরিকল্পনা থাকবে।
- কারিগরি শিক্ষা অধিদপ্তর এবং SEIP-কে নির্দেশ দেওয়া হোক যেন তাদের গবেষণা ও উন্নয়ন প্রকল্পগুলোতে বেসরকারি শিল্প খাতের সরাসরি অংশগ্রহণ বাধ্যতামূলক করা হয় এবং শিল্প-বান্ধব প্রযুক্তি উদ্ভাবনের জন্য সুনির্দিষ্ট লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়, যার অগ্রগতি প্রতি বছর BANBEIS কর্তৃক প্রকাশিত শিক্ষা তথ্য ও পরিসংখ্যান প্রতিবেদনে অন্তর্ভুক্ত করা হবে।
- বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে গবেষণা খাতে বরাদ্দকৃত অর্থের কার্যকর ব্যবহার নিশ্চিত করতে এবং আন্তর্জাতিক মানের প্রকাশনা ও পেটেন্ট বৃদ্ধিতে উৎসাহিত করার জন্য ইউজিসি একটি 'গবেষণা পারফরম্যান্স ইনডেক্স' (Research Performance Index) চালু করুক, যা প্রতি বছর বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর জন্য অর্থ বরাদ্দ এবং মূল্যায়নের একটি গুরুত্বপূর্ণ মানদণ্ড হিসেবে বিবেচিত হবে।