অপ্রকাশিত সত্য: দক্ষিণ এশীয় ভূ-রাজনীতি নিয়ে অনুসন্ধানী প্রতিবেদন

শাহেদ করিম  avatar   
শাহেদ করিম
অপ্রকাশিত সত্য: দক্ষিণ এশীয় ভূ-রাজনীতি নিয়ে অনুসন্ধানী প্রতিবেদন
অপ্রকাশিত সত্য: দক্ষিণ এশীয় ভূ-রাজনীতি নিয়ে অনুসন্ধানী প্রতিবেদন
ছবি: সংগৃহীত

সম্প্রতি, ২০২২ সালের নভেম্বরে ঢাকায় অনুষ্ঠিত ভারত-বাংলাদেশ পররাষ্ট্র সচিব পর্যায়ের বৈঠকে আঞ্চলিক নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক সহযোগিতা জোরদারের ওপর যে গুরুত্বারোপ...

সম্প্রতি, ২০২২ সালের নভেম্বরে ঢাকায় অনুষ্ঠিত ভারত-বাংলাদেশ পররাষ্ট্র সচিব পর্যায়ের বৈঠকে আঞ্চলিক নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক সহযোগিতা জোরদারের ওপর যে গুরুত্বারোপ করা হয়েছে, তা দক্ষিণ এশীয় ভূ-রাজনীতির বর্তমান জটিল প্রেক্ষাপটে বিশেষভাবে তাৎপর্যপূর্ণ। যদিও এই বৈঠক দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের একটি নিয়মিত অংশ, এর পেছনের মূল বার্তাটি হলো – আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা অর্জনে দ্বিপাক্ষিক উদ্যোগের সীমাবদ্ধতা এবং বৃহত্তর বহুপাক্ষিক কাঠামোর প্রয়োজনীয়তা। এই অঞ্চলের দেশগুলো দীর্ঘকাল ধরে আন্তঃরাষ্ট্রীয় অবিশ্বাস, সীমান্ত বিরোধ, এবং অর্থনৈতিক বৈষম্যের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করে আসছে, যা প্রায়শই বহিরাগত শক্তির হস্তক্ষেপের পথ খুলে দেয়। বিশেষ করে, চীনের 'বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ' (BRI) এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের 'ইন্দো-প্যাসিফিক স্ট্র্যাটেজি' (IPS) দক্ষিণ এশিয়ায় যে কৌশলগত প্রতিযোগিতা তৈরি করেছে, তা আঞ্চলিক দেশগুলোর পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়গুলোর জন্য এক নতুন কূটনৈতিক চ্যালেঞ্জ সৃষ্টি করেছে। এই ভূ-রাজনৈতিক টানাপোড়েনে, অভ্যন্তরীণ স্থিতিশীলতা এবং আঞ্চলিক সংহতি উভয়ই ঝুঁকির মুখে পড়েছে, যেখানে প্রতিটি দেশ তাদের জাতীয় স্বার্থ রক্ষায় সতর্ক পদক্ষেপ নিতে বাধ্য হচ্ছে।

দক্ষিণ এশিয়ার ভূ-রাজনৈতিক চালচিত্র কেবল দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়, বরং আঞ্চলিক জোটগুলোর কার্যকারিতাও এর একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ। উদাহরণস্বরূপ, সার্ক (SAARC) জোট, যা ১৯৮৫ সালে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল, বর্তমানে কার্যকারিতার দিক থেকে প্রায় স্থবির। সর্বশেষ সার্ক শীর্ষ সম্মেলন ২০১৪ সালে কাঠমান্ডুতে অনুষ্ঠিত হয়েছিল, এবং তারপর থেকে ভারত-পাকিস্তান উত্তেজনার কারণে কোনো শীর্ষ সম্মেলন আয়োজন করা সম্ভব হয়নি। এই স্থবিরতার ফলস্বরূপ, আঞ্চলিক বাণিজ্য, যোগাযোগ এবং সাংস্কৃতিক আদান-প্রদান ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে, যা এই অঞ্চলের সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। এর বিপরীতে, BIMSTEC (Bay of Bengal Initiative for Multi-Sectoral Technical and Economic Cooperation) জোট, যা ১৯৯৭ সালে গঠিত হয়েছিল, তুলনামূলকভাবে অধিক সক্রিয়তা দেখাচ্ছে। বঙ্গোপসাগর উপকূলবর্তী দেশগুলোকে নিয়ে গঠিত এই জোট সমুদ্র-বাণিজ্য, জ্বালানি নিরাপত্তা, এবং সন্ত্রাসবাদ দমনের মতো ক্ষেত্রগুলোতে সহযোগিতার নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছে। ২০২২ সালের মার্চ মাসে কলম্বোতে অনুষ্ঠিত পঞ্চম BIMSTEC শীর্ষ সম্মেলনে, নেতারা জোটের সনদ গ্রহণ এবং একটি মাস্টার প্ল্যান ফর ট্রান্সপোর্ট কানেক্টিভিটি অনুমোদন করেন, যা আঞ্চলিক সংহতির প্রতি তাদের অঙ্গীকারের প্রমাণ। এই দুই আঞ্চলিক জোটের ভিন্ন গতিপথ দক্ষিণ এশীয় ভূ-রাজনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক তুলে ধরে – যেখানে একটি পুরনো কাঠামো দুর্বল হয়ে পড়েছে, সেখানে নতুন একটি কাঠামো আশার আলো দেখাচ্ছে, তবে উভয়ই বহিরাগত শক্তির প্রভাবমুক্ত নয়।

আঞ্চলিক নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর ভূমিকা আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও প্রসারিত। বিশেষত, UN Peacekeeping মিশনে এই অঞ্চলের দেশগুলোর অবদান অনস্বীকার্য। বাংলাদেশ, ভারত, পাকিস্তান, নেপাল ও শ্রীলঙ্কা বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় UN Peacekeeping কন্ট্রিবিউটিং দেশগুলোর মধ্যে অন্যতম। উদাহরণস্বরূপ, ২০২৩ সালের সেপ্টেম্বর মাস পর্যন্ত, বাংলাদেশ UN Peacekeeping মিশনে সর্বোচ্চ সংখ্যক শান্তিরক্ষী প্রেরণকারী দেশগুলোর মধ্যে অন্যতম, যেখানে প্রায় ৭,০০০ এর অধিক সদস্য বিভিন্ন মিশনে কর্মরত আছেন। এই অংশগ্রহণ কেবল আন্তর্জাতিক শান্তি ও নিরাপত্তা রক্ষায় অবদান রাখে না, বরং এটি এই দেশগুলোর পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে একটি গুরুত্বপূর্ণ অবস্থান এনে দেয়। তবে, এই সামরিক সহযোগিতা আঞ্চলিক পর্যায়ে প্রায়শই অনুপস্থিত থাকে, যা দক্ষিণ এশীয় দেশগুলোর মধ্যে পারস্পরিক বিশ্বাস ও সংহতি প্রতিষ্ঠায় একটি বড় বাধা। এই অঞ্চলের দেশগুলোর মধ্যে আন্তঃসীমান্ত অপরাধ, অবৈধ অভিবাসন, এবং সন্ত্রাসবাদের মতো অভিন্ন চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় আরও সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন, যা UN Peacekeeping-এর মতো আন্তর্জাতিক প্ল্যাটফর্মে অর্জিত অভিজ্ঞতার আলোকে গড়ে তোলা যেতে পারে। ভূ-রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করেন, আঞ্চলিক নিরাপত্তা কাঠামো জোরদার করার জন্য এই অভিজ্ঞতা কাজে লাগানো অত্যন্ত জরুরি, অন্যথায় বহিরাগত শক্তির প্রভাব আরও বাড়তে পারে।

সংস্থা/উদ্যোগ সর্বশেষ শীর্ষ সম্মেলন/গুরুত্বপূর্ণ ইভেন্ট প্রধান সিদ্ধান্ত/ফলাফল কার্যকারিতার বর্তমান অবস্থা
সার্ক (SAARC) ২০১৪ সালের কাঠমান্ডু শীর্ষ সম্মেলন সার্ক স্যাটেলাইট প্রস্তাব, আঞ্চলিক রেলওয়ে চুক্তি অনুমোদন কার্যত নিষ্ক্রিয়; ভারত-পাকিস্তান উত্তেজনার কারণে কোনো শীর্ষ সম্মেলন হয়নি
BIMSTEC ২০২২ সালের কলম্বো শীর্ষ সম্মেলন (পঞ্চম) BIMSTEC সনদ গ্রহণ, পরিবহন সংযোগের জন্য মাস্টার প্ল্যান অনুমোদন ক্রমবর্ধমান সক্রিয়তা; আঞ্চলিক যোগাযোগ ও বাণিজ্য বৃদ্ধিতে সচেষ্ট
UN Peacekeeping (দক্ষিণ এশীয় অবদান) ২০২৩ সালের সেপ্টেম্বর (সর্বশেষ ডেটা) বাংলাদেশ, ভারত, নেপাল, পাকিস্তান বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় কন্ট্রিবিউটিং দেশ আন্তর্জাতিক শান্তি ও নিরাপত্তা রক্ষায় উচ্চ অবদান; আঞ্চলিক সহযোগিতায় তুলনামূলকভাবে কম প্রভাব

উৎস: UN Peacekeeping Official Website, SAARC Secretariat, BIMSTEC Secretariat, Ministry of Foreign Affairs (Bangladesh, India)

সুপারিশ

  • সার্ক সচিবালয়ের মাধ্যমে সদস্য রাষ্ট্রগুলোর পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে একটি উচ্চ পর্যায়ের 'ট্র্যাক ২ ডায়ালগ' কমিটি গঠন করতে হবে, যেখানে প্রাক্তন কূটনীতিবিদ, শিক্ষাবিদ এবং সামরিক বিশেষজ্ঞরা ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যেকার বিদ্যমান অবিশ্বাস নিরসনে সুনির্দিষ্ট রোডম্যাপ প্রস্তাব করবেন।
  • BIMSTEC-এর অধীনে 'BIMSTEC মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি' (BIMSTEC FTA) দ্রুত বাস্তবায়নের জন্য সদস্য দেশগুলোর বাণিজ্য মন্ত্রণালয় ও শুল্ক বিভাগকে সমন্বিতভাবে একটি টাইম-বাউন্ড অ্যাকশন প্ল্যান তৈরি করতে হবে, যা ২০২৩ সালের মধ্যে সকল সদস্য রাষ্ট্রের অনুমোদন নিশ্চিত করবে।
  • UN Peacekeeping মিশনে দক্ষিণ এশীয় দেশগুলোর অর্জিত অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে, এই অঞ্চলের দেশগুলোর সশস্ত্র বাহিনী এবং পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে নিয়ে একটি 'আঞ্চলিক দুর্যোগ প্রতিক্রিয়া ও মানবিক সহায়তা টাস্কফোর্স' গঠন করতে হবে, যা SAARC-এর কাঠামোর অধীনে কাজ করবে এবং নিয়মিত যৌথ মহড়া পরিচালনা করবে।

✍️ নিবন্ধ লেখক: শাহেদ করিম

শাহেদ করিম 'আই নিউজ বিডি'-র একজন সিনিয়র সাংবাদিক ও বিষয়ভিত্তিক গবেষক। তাঁর বিশেষত্বের জায়গা: দক্ষিণ এশীয় ভূ-রাজনীতি। এই নিবন্ধটি তাঁর নিজস্ব গবেষণা ও বিশ্লেষণ থেকে সংকলিত।

কোন মন্তব্য পাওয়া যায়নি


News Card Generator