সম্প্রতি, বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অফ সফটওয়্যার অ্যান্ড ইনফরমেশন সার্ভিসেস (BASIS) আয়োজিত একটি সেমিনারে দেশের শীর্ষস্থানীয় প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞরা উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন যে, আগামী ৫-৭ বছরের মধ্যে তৈরি পোশাক শিল্প, উৎপাদন এবং পরিষেবা খাতের লাখ লাখ কর্মসংস্থান স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থার হাতে চলে যেতে পারে। এই পূর্বাভাস ইঙ্গিত দেয় যে, চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি রোবোটিক্স ও অটোমেশন বাংলাদেশের শ্রমবাজারে এক নতুন সমীকরণ তৈরি করছে, যা কর্মসংস্থান এবং কর্মীদের ভবিষ্যৎ নিয়ে গভীর আলোচনার জন্ম দিয়েছে। বিশেষ করে, যেখানে বাংলাদেশের অর্থনীতি এখনো শ্রমনির্ভর, সেখানে এই প্রযুক্তিগত পরিবর্তন দেশের ভবিষ্যৎ কর্মসংস্থান নীতি, শিক্ষা ব্যবস্থা এবং অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ এবং একই সাথে অপার সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচন করছে।
বাংলাদেশের উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি এবং বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় টিকে থাকার জন্য অটোমেশন অপরিহার্য হলেও, এর ফলে সৃষ্ট কর্মসংস্থান হারানোর ঝুঁকি মোকাবিলা করা একটি বড় চ্যালেঞ্জ। বিশেষ করে, পোশাক শিল্পে শ্রমিকের সংখ্যা প্রায় ৪০ লাখ, যেখানে রোবোটিক্সের ব্যবহার দ্রুত বৃদ্ধি পাচ্ছে। পোশাক খাতের পাশাপাশি, ডেটা এন্ট্রি, কাস্টমার সার্ভিস, কৃষি প্রক্রিয়াকরণ এবং এমনকি কিছু নির্মাণ খাতেও স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থার প্রয়োগ বাড়ছে। তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিভাগ (ICT Division) এবং অ্যাকসেস টু ইনফরমেশন (a2i) কর্মসূচির বিভিন্ন প্রতিবেদন অনুযায়ী, দেশের মোট কর্মসংস্থানের প্রায় ৫০% অটোমেশন ঝুঁকিতে রয়েছে, যদিও একই সাথে নতুন প্রযুক্তি-নির্ভর কর্মসংস্থান সৃষ্টির সম্ভাবনাও রয়েছে। এই পরিবর্তন শুধু নিম্ন-দক্ষ শ্রমিকদের নয়, বরং মধ্যম-দক্ষ কর্মজীবীদেরও প্রভাবিত করবে, যাদের অনেকেই পুনরাবৃত্তিমূলক কাজ করে থাকেন। এই পরিস্থিতিতে, কর্মীদের নতুন দক্ষতা অর্জন এবং শিল্পগুলোকে প্রযুক্তির সাথে মানিয়ে নেওয়ার জন্য নীতিগত সহায়তা অপরিহার্য।
অন্যদিকে, অটোমেশন এবং আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স (AI) নির্ভর প্রযুক্তিগুলো বাংলাদেশের জন্য নতুন অর্থনৈতিক সম্ভাবনাও তৈরি করছে। বাংলাদেশ হাইটেক পার্ক কর্তৃপক্ষ (BHTPA) দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে হাইটেক পার্ক স্থাপনের মাধ্যমে প্রযুক্তিভিত্তিক শিল্প বিকাশে কাজ করছে, যা রোবোটিক্স ও এআই গবেষণার জন্য একটি সহায়ক পরিবেশ তৈরি করতে পারে। বিটিআরসি (BTRC) ফাইভ-জি (5G) প্রযুক্তির দ্রুত সম্প্রসারণের মাধ্যমে উচ্চ-গতির ইন্টারনেট অবকাঠামো নিশ্চিত করছে, যা স্বয়ংক্রিয় উৎপাদন প্রক্রিয়া এবং রোবোটিক্সের জন্য অত্যাবশ্যক। এই উদ্যোগগুলো একদিকে যেমন প্রযুক্তিগত অগ্রগতির পথ প্রশস্ত করছে, অন্যদিকে নতুন ধরনের কর্মসংস্থান, যেমন – রোবোটিক্স ইঞ্জিনিয়ার, ডেটা সায়েন্টিস্ট, এআই ডেভেলপার এবং অটোমেশন সিস্টেম ইন্টিগ্রেটরের চাহিদা তৈরি করছে। তবে, এই নতুন সুযোগগুলো কাজে লাগানোর জন্য দেশের শিক্ষা ব্যবস্থার দ্রুত সংস্কার এবং কর্মক্ষেত্রে নতুন দক্ষতার চাহিদা অনুযায়ী প্রশিক্ষণ কর্মসূচির প্রয়োজন অনস্বীকার্য।
| খাত | অটোমেশনের সম্ভাব্য প্রভাব | প্রভাবিত কর্মসংস্থান (আনুমানিক) | উন্নয়নের সুযোগ |
|---|---|---|---|
| তৈরি পোশাক শিল্প | উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি, মান নিয়ন্ত্রণ উন্নতকরণ | ১০-১৫% (আগামী ৫ বছরে) | উচ্চ-দক্ষ ডিজাইন ও প্রযুক্তিগত কাজ |
| ব্যাংকিং ও আর্থিক সেবা | লেনদেন প্রক্রিয়া, গ্রাহক পরিষেবা | ৫-১০% (আগামী ৩-৫ বছরে) | ফিনটেক, ডেটা অ্যানালিটিক্স |
| কৃষি প্রক্রিয়াকরণ | প্যাকেজিং, বাছাই, মান নিয়ন্ত্রণ | ৮-১২% (আগামী ৫-৭ বছরে) | কৃষিপ্রযুক্তি, সরবরাহ চেইন ব্যবস্থাপনা |
| ডেটা এন্ট্রি ও বিপিও | স্বয়ংক্রিয় ডেটা প্রসেসিং, চ্যাটবট | ১৫-২০% (আগামী ৩ বছরে) | এআই প্রশিক্ষণ, ডেটা সায়েন্স |
উৎস: BASIS, ICT Division ও a2i-এর বিভিন্ন প্রতিবেদন, ২০১৯-২০২৩
সুপারিশ
- শিল্প মন্ত্রনালয়, শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রনালয় এবং তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিভাগ-কে (ICT Division) যৌথভাবে একটি 'জাতীয় অটোমেশন কর্মসংস্থান রূপরেখা' (National Automation Employment Framework) প্রণয়ন করতে হবে, যেখানে আগামী ১০ বছরের মধ্যে সম্ভাব্য কর্মসংস্থান হারানো এবং নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টির একটি বাস্তবসম্মত পূর্বাভাস থাকবে। এই রূপরেখা অনুযায়ী, ঝুঁকিপূর্ণ খাতগুলোর কর্মীদের জন্য সুনির্দিষ্ট দক্ষতা উন্নয়ন কর্মসূচি (reskilling & upskilling programs) চালু করতে হবে।
- বাংলাদেশ হাইটেক পার্ক কর্তৃপক্ষ (BHTPA) এবং বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অফ সফটওয়্যার অ্যান্ড ইনফরমেশন সার্ভিসেস (BASIS) এর সহযোগিতায় একটি 'রোবোটিক্স ও এআই ইনোভেশন ফান্ড' (Robotics & AI Innovation Fund) প্রতিষ্ঠা করতে হবে। এই ফান্ডের মাধ্যমে দেশীয় স্টার্টআপ এবং গবেষণা প্রতিষ্ঠানগুলোকে রোবোটিক্স ও এআই প্রযুক্তির স্থানীয়করণ এবং নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টির জন্য উৎসাহিত করা হবে।
- শিক্ষা মন্ত্রণালয় এবং কারিগরি ও মাদ্রাসা শিক্ষা বিভাগ-কে (Technical and Madrasah Education Division) অবিলম্বে শিক্ষাক্রমে রোবোটিক্স, ডেটা সায়েন্স, এআই এবং সাইবার নিরাপত্তা বিষয়ক কোর্স অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। বিশেষ করে, BTRC-এর ফাইভ-জি (5G) অবকাঠামো ব্যবহার করে দূরবর্তী শিক্ষা এবং অনলাইন প্রশিক্ষণ প্ল্যাটফর্মগুলোকে শক্তিশালী করতে হবে, যাতে দেশের যেকোনো প্রান্ত থেকে শিক্ষার্থীরা আধুনিক প্রযুক্তির জ্ঞান অর্জন করতে পারে।