বর্তমান বিশ্ব রাজনীতিতে এক চরম অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। ডোনাল্ড ট্রাম্পের চীন সফর এবং এরপর যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে চলমান উত্তেজনা এক অত্যন্ত বিপজ্জনক পর্যায়ে পৌঁছেছে। সাংবাদিক অভিসার শর্মা তাঁর সাম্প্রতিক বিশ্লেষণে দেখিয়েছেন কীভাবে ট্রাম্পের চীন সফর কোনো প্রকার যৌথ ঘোষণা বা চুক্তি ছাড়াই ব্যর্থতায় পর্যবসিত হয়েছে এবং এর ফলে ট্রাম্প নিজের রাজনৈতিক ইমেজ বাঁচাতে ইরানের ওপর সামরিক বা 'সার্জিক্যাল স্ট্রাইক'-এর মতো কোনো দুঃসাহসিক পদক্ষেপ নিতে পারেন।
মার্কেটপ্লেস পণ্যসমূহ (Marketplace)
১. ট্রাম্পের চীন সফর: তাইওয়ান ইস্যুতে বড় ধাক্কা
সিএনএন (CNN)-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং এবং ডোনাল্ড ট্রাম্পের মধ্যে কোনো থমথমে সমস্যার সমাধান হয়নি। ট্রাম্পের সাথে অ্যাপল-এর টিম কুক বা টেসলার ইলন মাস্কের মতো শীর্ষ ব্যবসায়ীরা থাকলেও এই হাই-প্রোফাইল সফরের কোনো ইতিবাচক ফলাফল আসেনি। সবচেয়ে বড় বিষয় হলো, ট্রাম্প চীনকে আশ্বস্ত করেছেন যে তিনি তাইওয়ানের কাছে আর কোনো নতুন অস্ত্র বিক্রি করবেন না—যা বেইজিংয়ের জন্য এক বিশাল কৌশলগত বিজয় হিসেবে দেখা হচ্ছে। আগামী নভেম্বরে আমেরিকার মিড-টার্ম নির্বাচনকে সামনে রেখে এই রাজনৈতিক পরাজয় ঢাকতেই ট্রাম্প মধ্যপ্রাচ্যে নতুন কোনো সামরিক উত্তেজনা তৈরি করতে পারেন বলে বিশেষজ্ঞরা আশঙ্কা করছেন।
২. ইরানের পাল্টা হুংকার: প্রক্সি নেটওয়ার্ক ও অবকাঠামো ধ্বংসের হুমকি
ইরানের বিশিষ্ট বিশ্লেষক সৈয়দ মোহাম্মদ মারান্দি সিএনএন এবং আল-জাজিরায় স্পষ্ট ভাষায় ওয়াশিংটনকে সতর্ক করেছেন। তিনি জানিয়েছেন, মার্কিন প্রশাসন যদি ইরানের পাওয়ার প্ল্যান্ট বা সেতুগুলোর মতো বেসামরিক অবকাঠামোতে হামলা চালায়, তবে ইরান পারস্য উপসাগরে (Persian Gulf) থাকা মার্কিন ও ইসরায়েলি সমস্ত প্রক্সি নেটওয়ার্ক এবং গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক অবকাঠামো মুহূর্তের মধ্যে গুঁড়িয়ে দেবে। মারান্দির মতে, এই পাল্টা আঘাতের ফলে বিশ্ব অর্থনীতিতে এমন এক প্রলয়ঙ্কারী মন্দা আসবে যা মানবজাতি আগে কখনো দেখেনি।
৩. রাশিয়ার ড্রোন সরবরাহ ও ইরানের পুরোদমে প্রস্তুতি
৪০ দিনের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের পর ইরানের সামরিক খাতে যে ক্ষয়ক্ষতি হয়েছিল, তা ইতিমধ্যেই পূরণ করা হচ্ছে। ক্যাস্পিয়ান সাগর (Caspian Sea) রুট ব্যবহার করে রাশিয়া প্রতিনিয়ত ইরানকে ড্রোনের যন্ত্রাংশ ও সামরিক সহায়তা পাঠাচ্ছে। চীনও আমেরিকার চাপের মুখে ইরানকে অস্ত্র সরবরাহ বন্ধ করার বিষয়ে ট্রাম্পের কাছে কোনো প্রকার লিখিত প্রতিশ্রুতি দেয়নি। ফলে সামরিক ও কৌশলগতভাবে ইরান যেকোনো আক্রমণের জবাব দিতে সম্পূর্ণ প্রস্তুত।
৪. মার্কিন জনগণের প্রতি ইরানি পররাষ্ট্রমন্ত্রীর অর্থনৈতিক সতর্কবার্তা
ভারতের মাটিতে সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাকচি মার্কিন জনগণকে উদ্দেশ্য করে এক বড় বার্তা দিয়েছেন। তিনি বলেন, ট্রাম্প ও নেতানিয়াহুর এই চাপিয়ে দেওয়া যুদ্ধের খেসারত শেষ পর্যন্ত আমেরিকার সাধারণ জনগণকেই দিতে হবে। যুদ্ধের কারণে যুক্তরাষ্ট্রে সরকারি বন্ডের সুদের হার (Treasury Yields) ২ বছর, ১০ বছর এবং ৩০ বছরের মেয়াদে আশঙ্কাজনকভাবে বাড়ছে। এর ফলে আমেরিকার সাধারণ মানুষের হোম লোন, কার লোন এবং সমস্ত বাণিজ্যিক ঋণ অত্যন্ত ব্যয়বহুল হয়ে পড়বে এবং মার্কিন অর্থনীতি বড় ধসের মুখে পড়বে।
৫. পরমাণু অস্ত্র ও হরমূজ প্রণালী (Strait of Hormuz) নিয়ে ইরানের অবস্থান
ভারতীয় সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে আব্বাস আরাকচি পরিষ্কার করেছেন যে, ২০১৫ সালের পরমাণু চুক্তিতেই (JCPOA) ইরান প্রমাণ করেছে তারা কখনো পারমাণবিক বোমা তৈরি করতে চায়নি। ইরানের পরমাণু কর্মসূচি সম্পূর্ণ শান্তিপূর্ণ ও বেসামরিক উদ্দেশ্যে পরিচালিত।
হরমূজ প্রণালী নিয়ে তিনি বলেন, ইরান চায় এই আন্তর্জাতিক নৌপথটি সম্পূর্ণ উন্মুক্ত থাকুক। তবে যেসব দেশ ইরানের সাথে সরাসরি যুদ্ধে লিপ্ত, তাদের বাণিজ্যিক বা সামরিক জাহাজ পারস্য উপসাগর দিয়ে পার হতে হলে অবশ্যই ইরানি নৌবাহিনীর সাথে সমন্বয় করতে হবে। আরাকচি উদাহরণ টেনে বলেন, ভারতীয় বাণিজ্যিক জাহাজগুলোকে নিরাপদ পথ (Safe Passage) দিতে ইরান সবসময় সহযোগিতা করেছে এবং ভবিষ্যতেও করবে।
৬. আইআরজিসির (IRGC) শর্ত: আলোচনার আগে লিখিত গ্যারান্টি
ইসলামিক রেভোলিউশনারি গার্ড কোরের (IRGC) সাবেক প্রধান মেজর জেনারেল মোহাম্মদ আলী জাফরি এক সাক্ষাৎকারে স্পষ্ট জানিয়েছেন যে, আমেরিকা যদি ইরানের ফ্রিজ বা আটকে রাখা বিপুল অর্থ আনফ্রিজ না করে এবং অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা (Economic Sanctions) প্রত্যাহার না করে, তবে তেহরান কোনো আলোচনায় বসবে না। শত্রুদেশ বারবার প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করেছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, এবার আলোচনা করতে হলে আমেরিকাকে যুদ্ধের হুমকি বন্ধের বিষয়ে লিখিত গ্যারান্টি দিতে হবে এবং চুক্তিতে স্বাক্ষর করতে হবে।
ডোনাল্ড ট্রাম্প ও বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক সংকট এই অঞ্চলের উত্তেজনাকে আরও বাড়িয়ে তুলছে। ট্রাম্প চীন থেকে খালি হাতে ফিরে এসে মধ্যপ্রাচ্যে নিজের আধিপত্য দেখানোর চেষ্টা করছেন। পারস্য উপসাগরের এই ঘনীভূত মেঘ আগামী দিনে বিশ্ব রাজনীতি ও অর্থনীতিকে কোন দিকে নিয়ে যায়, তা এই মুহূর্তে এক বড় প্রশ্ন।