মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সাম্প্রতিক চীন সফর এবং দেশটির প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের সাথে তাঁর বৈঠক বৈশ্বিক ভূ-রাজনীতিতে এক বড় ধরণের আলোড়ন সৃষ্টি করেছে। এই হাই-প্রোফাইল বৈঠকের অফিশিয়াল ছবি এবং ভিডিওগুলো বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, ট্রাম্প অত্যন্ত দুর্বল এবং সুবিধাহীন অবস্থান (Weak Position) থেকে বেইজিংয়ে গিয়েছিলেন। শি জিনপিং স্বয়ং পুতিন বা কিম জং উনকে যেভাবে নিজে এগিয়ে এসে রিসিভ করেছিলেন, ট্রাম্পের ক্ষেত্রে তেমন কোনো রাজকীয় প্রোটোকল দেখা যায়নি। বিশ্লেষকদের মতে, ট্রাম্পের এই চীন সফর আসলে হোয়াইট হাউসের জন্য এক বড় ধরণের কূটনৈতিক পরাজয়।
১. ইরানের ছায়া যুদ্ধ এবং হরমূজ প্রণালী (Strait of Hormuz) নিয়ে দরকষাকষি
ট্রাম্পের এই সফরের প্রধান উদ্দেশ্য ছিল মধ্যপ্রাচ্যে চলমান ইরান যুদ্ধ এবং অবরুদ্ধ হরমূজ প্রণালী উন্মুক্ত করার বিষয়ে চীনের সহায়তা নেওয়া। ট্রাম্প দাবি করেছেন যে, চীন নেপথ্যে থেকে হরমূজ প্রণালী খুলে দিতে ইরানকে চাপ দেবে। কিন্তু বাস্তবতা হলো, ইরান সম্প্রতি হরমূজ প্রণালী থেকে যেসব বাণিজ্যিক জাহাজ ছেড়ে দিয়েছে, তার বেশিরভাগই ছিল চীনা জাহাজ। এটি মূলত বেইজিং ও তেহরানের যৌথ বার্তা যে, হরমূজ প্রণালী কেবল বৈরী দেশ বা শত্রুদের (যেমন যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল) জন্যই বন্ধ, অংশীদার বা বন্ধুদের জন্য নয়। উল্লেখ্য, এই সংকটের কারণে হরমূজ প্রণালীর কাছে ভারতের দুটি বাণিজ্যিক জাহাজ ইতিমধ্যেই ডুবে গেছে।
২. চীনের কাছে ট্রাম্পের সব অনুরোধ প্রত্যাখ্যান
বিশ্ব প্রতিরক্ষা ও অর্থনীতি বিশেষজ্ঞদের মতে, ট্রাম্প চীনের কাছে অনুরোধ করেছিলেন যেন তারা ইরানকে আর কোনো ব্যাক-এন্ড বা সামরিক সহায়তা না দেয়। কিন্তু চীন ট্রাম্পের সমস্ত অনুরোধ সরাসরি প্রত্যাখ্যান করেছে। সিএনএন (CNN)-এর সর্বশেষ রিপোর্ট অনুযায়ী, চীন থেকে খালি হাতে ফিরে এসে ট্রাম্প ইঙ্গিত দিয়েছেন যে ইরানের ওপর হামলা আবার শুরু হতে পারে। এদিকে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু, যাঁর সামনেও নির্বাচন রয়েছে, তিনি এই যুদ্ধ পুনরায় শুরু করার জন্য মুখিয়ে আছেন। কট্টরপন্থী ইসরায়েলি পত্রিকা ‘ওয়াইনেট’ (Ynet) এর দাবি অনুযায়ী, ইসরায়েল ইতিমধ্যেই ইরানের তেল শোধনাগার এবং পাওয়ার গ্রিডসহ নতুন ‘টার্গেট ব্যাংক’ বা লক্ষ্যবস্তুর তালিকা হালনাগাদ করেছে।
৩. বৈশ্বিক জ্বালানি ও অর্থনীতির জন্য মহাবিপর্যয়
বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করেছেন যে, ইসরায়েল বা যুক্তরাষ্ট্র যদি ইরানের জ্বালানি বা তেল অবকাঠামোতে বোমাবর্ষণ করে, তবে ইরানও পাল্টা আঘাত হিসেবে পারস্য উপসাগরের জিসিসি (GCC) ভুক্ত আরব দেশগুলোর তেল শোধনাগার এবং বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলো ধ্বংস করে দেবে। এর চেয়েও বড় বিপর্যয় ঘটবে যদি ইসরায়েল বা আরব দেশগুলোর সমুদ্রের পানি মিষ্টি করার প্ল্যান্ট বা ‘ডিল্যালিনেশন প্ল্যান্ট’ (Desalination Plants) গুলোকে লক্ষ্যবস্তু করা হয় (ইসরায়েলের মাত্র ৫টি ডিল্যালিনেশন প্ল্যান্ট রয়েছে)। এই অবকাঠামোগুলো ধ্বংস হলে বিশ্ব অর্থনীতি কয়েক বছরের জন্য এক প্রলয়ঙ্কারী মহামন্দা বা ‘গ্রেট ডিপ্রেশন’-এর কবলে পড়বে।
৪. ট্রাম্পের হীনম্মন্যতা এবং এলাইদের দূরত্ব
ট্রাম্পের অভ্যন্তরীণ জনপ্রিয়তার গ্রাফ এখন তলানিতে, যার ফলে আন্তর্জাতিক বার্গেনিংয়ে তিনি পিছিয়ে পড়েছেন। এমনকি আমেরিকার দীর্ঘদিনের মিত্র দেশগুলোও এখন তাঁর বিরুদ্ধে চলে যাচ্ছে। সৌদি আরব স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছে যে, আমেরিকার চালানো ‘অপারেশন ফ্রিডম’-এর জন্য তারা নিজেদের আকাশসীমা ব্যবহার করতে দেবে না। তদুপরি, রিয়াদ এখন ইরানের সাথে একটি ‘নন-অ্যাগ্রেশন প্যাক্ট’ বা অনাক্রমণ চুক্তি করার বিষয়ে আঞ্চলিক দেশগুলোর সাথে আলোচনা করছে। আরব দেশগুলো বুঝতে পেরেছে যে তেলের সবচেয়ে বড় ক্রেতা এখন আমেরিকা নয়, বরং চীন। আর আমেরিকা যে নিরাপত্তা দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিত, তা এখন অচল; কারণ মার্কিন প্রশাসন মধ্যপ্রাচ্যে নিজেদের সামরিক ঘাঁটিগুলোকেই রক্ষা করতে পারছে না।
৫. চীনের হাতে থাকা শক্তিশালী তাস (Economic Cards)
আমেরিকার নিষেধাজ্ঞা বা 'ট্যারিফ ওয়ার' এর জবাবে চীন একমাত্র দেশ যারা সমপরিমাণ পাল্টা নিষেধাজ্ঞা দিয়ে সেই অর্থনৈতিক যুদ্ধে জয়ী হয়েছে। চীনের কাছে বেশ কয়েকটি শক্তিশালী অর্থনৈতিক কার্ড রয়েছে:
-
রেয়ার আর্থ উপাদান (Rare Earth Elements): আমেরিকার ফ্ল্যাগশিপ যুদ্ধবিমান F-35 তৈরির প্রধান কাঁচামাল এই রেয়ার আর্থ, যা সম্পূর্ণ চীনের নিয়ন্ত্রণে।
-
জ্বালানি তেল মজুত: চীনের কাছে বর্তমানে বিশ্বের বৃহত্তম কৌশলগত তেল মজুত রয়েছে (১.৪ বিলিয়ন ব্যারেল), যা আমেরিকার চেয়ে অনেক বেশি। অন্যদিকে, আমেরিকায় ইতিমধ্যেই মোটর অয়েলের তীব্র সংকট শুরু হয়েছে এবং টয়োটা (Toyota) এ নিয়ে বিশেষ সতর্কতা জারি করেছে।
-
বিকল্প জ্বালানি রুট: রাশিয়া থেকে সরাসরি ‘পাওয়ার অফ সাইবেরিয়া’ পাইপলাইনের মাধ্যমে চীন গ্যাস ও তেল পাচ্ছে এবং এর দ্বিতীয় পাইপলাইন তৈরির কাজও দ্রুত চলছে। চীন ভেনিজুয়েলা ও ইরানের মতো নিষেধাজ্ঞাপ্রাপ্ত দেশগুলো থেকেও দেদারসে তেল কিনছে এবং নিজেদের মুদ্রা ‘ইউয়ান’কে বৈশ্বিক রিজার্ভ কারেন্সি করার পথে এগিয়ে যাচ্ছে।
৬. বোয়িং চুক্তি ও ফার্টলাইজার সংকট
এই সফরের হেডলাইন হিসেবে কেবল দুটি বাণিজ্যিক চুক্তি সামনে এসেছে। চীন ও আমেরিকার মধ্যে চুক্তির অংশ হিসেবে বেইজিং ২০০টি বোয়িং জেট (Boeing Jets) এবং বিলিয়ন ডলার মূল্যের মার্কিন কৃষি পণ্য কেনার বিষয়ে সম্মতি জানিয়েছে। তবে বৈশ্বিক ফার্টিলাইজার বা সার সংকটের মুখে চীন স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছে যে, তারা নিজেদের তৈরি সার আর বিশ্বের কোথাও রপ্তানি করবে না, যা বিশ্ব কৃষির জন্য আরেকটি চিন্তার কারণ।
ডোনাল্ড ট্রাম্প চীন সফরে গিয়ে শি জিনপিংকে হরমূজ প্রণালী খোলার অনুরোধ করেছিলেন, কিন্তু ব্যর্থ হয়ে এখন দেশে ফিরে দাবি করছেন, আমেরিকার জন্য হরমূজ প্রণালী খোলা থাকা অতটা জরুরি নয়, চীনেরই এতে বেশি সমস্যা। ট্রাম্পের এই দ্বিচারিতা এবং কোনো বিকল্প না থাকা ইঙ্গিত দিচ্ছে যে, মধ্যপ্রাচ্যের এই যুদ্ধ যেকোনো মুহূর্তে এক চরম ও ভয়াবহ রূপ নিতে পারে। বিশ্ববাসী এখন এক বড় ধরণের অর্থনৈতিক ও মানবিক সংকটের দ্বারপ্রান্তে দাঁড়িয়ে আছে।



















