শীতে ভাপা পিঠার কদর বেড়েছে
রনজিৎ বর্মন শ্যামনগর(সাতক্ষীরা)প্রতিনিধি ঃ পিঠা বাঙালি সংস্কৃতির এক অন্যতম উপাদান। পিঠার কথা শুনলে কার না জিহব্বায় জল আসে। শীত কাল মানেই হল পিঠার সময়কাল। গ্রামীণ সংস্কৃতির এক অনবাদ্য অংশ বাড়ীতে বাড়ীতে পিঠা উৎসব। যদিও এখন শুধু গ্রাম নয় শহরেও ছড়িয়ে পড়েছে পিঠা উৎসব।
শীত মৌসুম এলেই রাস্তার পাশে নারী ,পুরুষ, ছেলে ও মেয়ে সব বয়সীদের ভাপা পিঠা সহ নানান পিঠা খাওয়ার ধূম পড়ে যায়। দেখা যায় শহর ,গ্রাম সবত্র রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে নারী ও পুরুষ ভাপা পিঠা তৈরী করে বিক্রী করছে। সাধারণত শীতের সময় ভাপা পিঠার কদর বেড়ে যায়। পিঠা নিয়ে অনেকে নানান বাণী ও উক্তি দিয়েছেন। অনেক সময় অনেক লেখক মনের মাধুরী মিশিয়ে লেখাও লিখেছেন।
পিঠার মধ্যে ভাপা পিঠা ও কুলি পিঠা বর্তমান শীত মৌসুমে রাস্তার পাশে বিক্রী করে অনেকে জীবন যাপন করার চেষ্টা করছেন। ঠিক এ রকম এক জন ব্যক্তি হল শেখ আরিজুল ইসলাম ডাক নাম আসলাম হোসেন (৪৫)। সাতক্ষীরার শ্যামনগর উপজেলার মাজাট গ্রামের শেখ জাফর আলীর পুত্র তিনি। শীতের শুরু থেকে উপজেলা সদরের চৌরাস্তা সংলগ্ন রাস্তার পাশে সন্ধ্যা থেকে রাত ১০টা ১১টা পর্যন্ত শীতের ভাপা পিঠা ও কুলি পিঠা বিক্রী করে চলেছেন। তিনি বলেন দৈনিক তিন শত থেকে চারশ পিচ পিঠা বিক্রী করেন। আবার কোন কোন দিন বেশীও বিক্রী হয়। ভাপা পিঠা এক পিচ বিক্রী করেন দশ টাকায় ও কুলি পিঠা বিক্রী করেন দশ টাকায়। পাঠি সাপটা বিক্রী প্রতি পিচ ২০টাকা, তেলের পিঠা প্রতি পিচ ১০ টাকা ও চিতোই পিঠ প্রতি পিচ ১৫ টাকা। তবে ভাপা পিঠার কদর বেশী। পিঠা তৈরীর কারিগর আসলাম হোসেন বলেন তার পিঠার স্বাদ গ্রহণের জন্য পাশ^বর্তী কালিগঞ্জ উপজেলা থেকেও পিঠা প্রেমিকরা আসেন। উপজেলার নওয়াবেঁকী, মুন্সিগঞ্জ, নুরনগর, হরিনগর, বংশীপুর, সোয়ালিয়া ,কাশিমাড়ী, বুড়িগোয়ালিনী সহ বিভিন্ন এলাকা থেকে পিঠা ভক্তরা আসেন। এছাড়া অনেক সরকারি বেসরকারী অনুষ্ঠানে অর্ডার গ্রহণ করেন পিঠা সাপ্লাই দেওয়ার জন্য। জেলা সদর সাতক্ষীরা পর্যন্ত তার পিঠার কদর রয়েছে বলে। বেশি চাহিদার কারণে পিঠার দোকানের ভাউচার পর্যন্ত ছাপাতে হয়েছে বলে জানান।
সরজমিনে দেখা যায় ভাপা পিঠার কারিগর আসলামের কথা বলার সময় টুকুও কম। এক দিকে হাতে কাজ চলছে অন্য দিকে মুখে পিঠা বানানোর উপকরণ নিয়ে এই প্রতিবেদকের সাথে কথা বলছেন। পিঠার স্বাদ গ্রহণ করছেন খানপুর এলাকার রুমি আক্তার সহ তার সহপাঠিরা। রুমি আক্তার বলেন শীতের প্রিয় খাবার ভাপা পিঠা। শীতের কুয়াশার মত দেখতে তাইতো তার প্রিয় ভাপা পিঠা। কিছুক্ষণ পরেই এলেন পিঠার স্বাদ গ্রহণ করতে সোয়ালিয়া থেকে আব্দুল্লাহ আল মামুন। তিনি বললেন ভাপা পিঠার গল্প শুনে স্বাদ গ্রহণের জন্য সন্ধ্যায় চলে এসেছি। এবং আজ তার প্রথম ভাপা পিঠা খাওয়া এটাও তিনি জানান। কলেজ পড়–য়া ছাত্র রায়হান রসিকতার সুরে বলেন বিড়াল যেমন মাছেন জন্য অপেক্ষা করে আমি তেমনি শীত কালে ভাপা পিঠা খাওয়ার জন্য অপেক্ষা করি। এভাবে একর পর এক নারী ,পুরুষ শিশু সব বয়সী পিঠা খাওয়ার জন্য আসেন বলে পিঠার কারিগর জানান।
ভাপা পিঠা তৈরীর উপকরণ বিষয়ে বলেন চালের গুড়া, কোরানো নারকেল,মিষ্টি ও কুলি পিঠাতে লাগে প্রায় একই উপকরণ। গত পাঁচ থেকে সাত বছর যাবত এই পিঠা তৈরীর কাজ করছেন। তার মামাত ভাইয়ের নিকট থেকে ভাপা পিঠা তৈরীর প্রশিক্ষণ নিয়েছিলেন। তিনি বলেন ভাপা পিঠা তৈরীর চালের গুড়া মান সম্মত ও পরিস্কার পরিচ্ছন্ন না হলে পিঠার স্বাদ লাগবে না। সব কিছুতে পরিমানমত না হলে স্বাদ লাগার প্রশ্নই আসেনা বলে জানান। তার পিঠা তৈরীর সুনামের জন্য শীত মৌসুমে বিভিন্ন স্থানে পিঠা তৈরীর জন্য নিয়ে যাওয়া হয়। এমনকি উপজেলা প্রশাসন থেকেও কয়েকবার তাকে পিঠা তৈরীর জন্য পিঠা উৎসবে নিয়ে যাওয়া হয়েছে বলে জানান। আসলাম বলেন ভাল চাল,নারকেল,মিষ্টি এসবের দাম বেড়ে যাওয়ায় লাভ ঠিক মত পাচ্ছেননা। দৈনিক সব খরচ বাদে যা থাকে সেটা দিয়েই পরিবারের খরচ চালান। তার এক ছেলে ও এক মেয়ে রয়েছে। মেয়ে উচ্চ মাধ্যমিক পর্যন্ত লেখাপড়া শেষে বিবাহ দিয়েছেন ও ছেলে ৭ম শ্রেণিতে লেখা পড়া করে। শুধু শীত কাল নয় বছরের প্রায়ই সময় এই পিঠা বিক্রী করার কাজ করেন বলে জানান। বছরের অন্য সময় কৃষি কাজ করেন। আগে পিঠা তৈরী করে ভাল লাভ পেয়েছেন বলে জানান। বর্তমানে উপকরণের মূল্য বৃদ্ধি পেলেও পিঠার দাম বৃদ্ধি না পাওয়ায় লাভ কমে গেছে। এরপরেও পিঠা তৈরীর কাজটি তার খুব ভাল লাগে বিভিন্ন স্থান থেকে তার পিঠার স্বাদ গ্রহণের জন্য বিভিন্ন ব্যক্তিরা আসেন এ জন্য কাজটি ছাড়তে চাননা।
নকশীকাঁথার পরিচালক চন্দ্রিকা ব্যানাজী বলেন ভোজন প্রিয় বাঙালীর পিঠার ইতিহাস পুরানো হলেও বর্তমানে পিঠা তৈরীতে নানান বৈচিত্র্যতা ও কৌশলে পরিবর্তন এসেছে। মানুষের জীবন দুঃখ কষ্টের হলেও শীতের পিঠা খাওয়ার কমতি নাই, পিঠা উৎসবের কমতি থাকে না। বিভিন্ন উৎসবে বাঙালীরা ঘরে ঘরে পিঠা উৎসবে মেতে উঠেন।
ছবি- শ্যামনগরে শীতের সন্ধ্যায় ভাপা পিঠা তৈরীতে ব্যস্ত পিঠার কারিগর আরিজুল ইসলাম।



















