‘বাবা’-মাত্র দুটি অক্ষরের এই শব্দটির গভীরতা পরিমাপ করা অসম্ভব। মায়ের ভালোবাসা যেখানে প্রকাশ্য এবং আবেগময়, বাবার ত্যাগ সেখানে অনেকটাই আড়ালে থাকা এক নিঃশব্দ গল্প। নিজের জীবনের সমস্ত রঙ ও ইচ্ছে বিসর্জন দিয়ে যিনি পরিবারের মুখে হাসি ফোটান, তিনিই বাবা। আজ জুনের তৃতীয় রবিবার, বিশ্ব বাবা দিবস। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম থেকে শুরু করে চারপাশ আজ মুখর বাবাকে নিয়ে স্মৃতিচারণ আর ভালোবাসার নানামুখী আয়োজনে।
তবে এই আনুষ্ঠানিকতার ভিড়ে একটি বড় প্রশ্ন রয়েই যায়-আমাদের ব্যস্ত ও যান্ত্রিক জীবনে বাবাদের এই আজীবন লড়াইয়ের মূল্য আমরা আসলেই কতটুকু দিতে পারছি?
পরিবারের মূল স্তম্ভ হলেন বাবা। নিজে রোদ-বৃষ্টির তীব্রতা সহ্য করেও সন্তানের মাথার ওপর ছায়া হয়ে দাঁড়িয়ে থাকেন তিনি। নিজের জন্য একটা নতুন শার্ট কেনার বাজেট কাটছাঁট করে যিনি সন্তানের স্কুলের বেতন কিংবা নতুন বইয়ের জোগান দেন, তিনিই বাবা।
বাবার অভিধানে কোনো ‘ছুটির দিন’ নেই। শরীরের ক্লান্তি, মনের ভেতরের উদ্বেগ কিংবা কর্মক্ষেত্রের হাজারো চাপ-সবকিছু তিনি এক নিমেষে আড়াল করে ফেলেন সন্তানের এক চিলতে হাসির মুখে। সন্তানের সাফল্যে যিনি পেছনের সারিতে দাঁড়িয়ে তৃপ্তির হাসি হাসেন, আর সন্তানের ব্যর্থতায় যখন গোটা সমাজ মুখ ফিরিয়ে নেয়, তখন তিনিই পরম ভরসায় হাতটা ধরে বলেন, “ভয় নেই, আমি তো আছি।” এই সামান্য আশ্বাসের মধ্যেই লুকিয়ে থাকে পৃথিবীর সবচেয়ে বড় শক্তি।
বাবা দিবসের আনুষ্ঠানিক যাত্রার ইতিহাসটা ভীষণ আবেগময়। বিংশ শতাব্দীর শুরুতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সোনোরা স্মার্ট ডড নামের এক নারীর হাত ধরে এই দিবসের সূচনা। সোনোরার মা যখন মারা যান, তখন তাঁর বাবা উইলিয়াম জ্যাকসন স্মার্ট (একজন যুদ্ধফেরত সৈনিক) একাই সোনোরাসহ তাঁর ছয় ভাইবোনকে পরম মমতায় বড় করে তোলেন।
বাবার এই অনন্য ত্যাগকে সম্মান জানাতেই সোনোরা ‘মা দিবস’-এর মতো ‘বাবা দিবস’-এরও দাবি তোলেন। ফলশ্রুতিতে, ১৯১০ সালের ১৯ জুন প্রথম বাবা দিবস পালিত হয় এবং পরবর্তীতে ১৯৭২ সালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে এটিকে রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি দেওয়া হয়।
সময়ের সাথে সাথে বাবার চিরাচরিত ধরনেও এসেছে আধুনিকতার ছোঁয়া। বর্তমান যুগে বাবা মানে শুধু ‘সংসারের খরচ জোগানো অভিভাবক’ নন। এখনকার বাবারা সন্তানের ডায়াপার বদলানো থেকে শুরু করে রান্না করা, পড়াশোনা করানো কিংবা বন্ধুর মতো তাদের মানসিক দোলাচলের সঙ্গী হচ্ছেন সমানতালে।
আধুনিকতার এই জয়গানের পাশাপাশি সমাজ দেখছে এক নির্মম বাস্তবতার উল্টো পিঠ। যে বাবা নিজের জীবনের সেরা সময় ও উপার্জনকে সন্তানের ভবিষ্যৎ গড়তে বিলিয়ে দিয়েছিলেন, জীবনের শেষ প্রান্তে এসে অনেক বাবারই শেষ আশ্রয় হচ্ছে ‘বৃদ্ধাশ্রম’। গণমাধ্যমে যখন কোনো বৃদ্ধ বাবার অবহেলা কিংবা একা পড়ে থাকার খবর আসে, তখন তা গোটা মানবতার স্তম্ভকে নাড়িয়ে দেয়।
বাবা দিবস কোনো নির্দিষ্ট একটি দিনের ফ্রেমে বন্দি থাকার বিষয় নয়। বছরের ৩৬৫ দিনই বাবার প্রতি শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা থাকা উচিত। বাবা যেমন নিঃশর্তভাবে তাঁর জীবন বিলিয়ে দেন, সন্তানেরও দায়িত্ব তাঁর শেষ বয়সে ততটাই যত্নে তাঁকে আগলে রাখা।
আজকের এই বিশেষ দিনে পৃথিবীর সব জীবিত বাবার প্রতি রইল বিনম্র শ্রদ্ধা ও দীর্ঘায়ুর প্রার্থনা। আর যে বাবারা পরপারে পাড়ি জমিয়েছেন, তাঁদের আত্মার চিরশান্তি কামনা করি। পৃথিবীর সব বাবা ভালো থাকুক।
মার্কেটপ্লেস পণ্যসমূহ (Marketplace)
সংবাদটির ওপর ভিত্তি করে তাৎক্ষণিক একটি ব্যঙ্গাত্মক রাজনৈতিক কার্টুন তৈরি করুন।