কক্সবাজারের পেকুয়া থানায় ঘুষের টাকা ফেরত চাওয়াকে কেন্দ্র করে মা–মেয়েকে হেনেস্তা ও পরে মোবাইল কোর্টের মাধ্যমে এক মাসের কারাদণ্ড দেওয়ার অভিযোগে আলোড়ন সৃষ্টি হয়েছে। এ ঘটনায় পেকুয়া থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি)কে তলব করেছেন কক্সবাজারের জাস্টিস অব দি পিস ও চীফ জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট মোহাম্মদ শফিউল আযম।
বিভিন্ন জাতীয় ও আঞ্চলিক গণমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদন নজরে আসার পর গত ৮ মার্চ আদালত স্বপ্রণোদিত হয়ে এ আদেশ দেন। আদালতের নির্দেশ অনুযায়ী আগামী ১৬ মার্চ সংশ্লিষ্ট থানার ওসিকে আদালতে হাজির হয়ে ঘটনার বিস্তারিত লিখিত ব্যাখ্যা দিতে হবে।
অভিযোগের পটভূমি
গণমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়, গত ৪ মার্চ পেকুয়া থানায় রেহেনা মোস্তফা রানু ও জুবাইদা বেগম নামের দুই নারীকে আটক করে থানায় শারীরিকভাবে নির্যাতন করা হয়। অভিযোগ রয়েছে, তারা পুলিশের কাছে দেওয়া ঘুষের টাকা ফেরত চাইলে এ ঘটনার সূত্রপাত হয়।
পরবর্তীতে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের মাধ্যমে মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করে ওই দুই নারীকে এক মাসের কারাদণ্ড দেওয়া হয়। ঘটনাটি প্রকাশ্যে আসার পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও বিভিন্ন মহলে ব্যাপক সমালোচনা শুরু হয়।
আইনি প্রক্রিয়া নিয়ে আদালতের পর্যবেক্ষণ
জাস্টিস অব দি পিসের আদেশে বলা হয়েছে, অভিযুক্তরা যদি থানায় গিয়ে পুলিশ সদস্যদের সঙ্গে বাকবিতণ্ডা, গালিগালাজ বা হামলার মতো কোনো ঘটনা ঘটিয়ে থাকেন, তবে তাদের বিরুদ্ধে সরকারি কাজে বাধা প্রদান বা সরকারি কর্মচারীর ওপর হামলার অভিযোগে মামলা করা যেত।
সে ক্ষেত্রে ১৮৯৮ সালের ফৌজদারি কার্যবিধির ১৫৪ ধারায় মামলা রুজু এবং ১৫৭ ধারায় তদন্তের জন্য জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেটের কাছে প্রতিবেদন পাঠানোর বিধান রয়েছে। প্রয়োজনে অভিযুক্তদের গ্রেপ্তার করে আদালতে সোপর্দ করার আইনগত ব্যবস্থাও নেওয়া সম্ভব।
আদেশে আরও উল্লেখ করা হয়, নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট মোবাইল কোর্ট পরিচালনার সময় তার সম্মুখে সংঘটিত অপরাধের ক্ষেত্রে দোষ স্বীকারোক্তির ভিত্তিতে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নিতে পারেন। কিন্তু পূর্বে গ্রেপ্তার করা বা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হেফাজতে থাকা কাউকে মোবাইল কোর্টে উপস্থাপন করার সুযোগ আইনে নেই। এ বিষয়ে উচ্চ আদালতের সুস্পষ্ট নির্দেশনা রয়েছে।
গণমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, আলোচিত ঘটনাটি নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের উপস্থিতিতে ঘটেনি এবং দুই নারীকে থানায় আটক করার পর মোবাইল কোর্টে উপস্থাপন করা হয়েছে। ফলে আইনগত প্রক্রিয়া যথাযথভাবে অনুসরণ করা হয়নি বলে আদালতের প্রাথমিক ধারণা।
লিখিত ব্যাখ্যা ও নথি দাখিলের নির্দেশ
আইনের শাসন নিশ্চিত করা এবং অভিযোগের সত্যতা যাচাইয়ের লক্ষ্যে ফৌজদারি কার্যবিধির ২৫ ধারার ক্ষমতাবলে সংশ্লিষ্ট থানার ওসির কাছে লিখিত ব্যাখ্যা তলব করা হয়েছে।
আদালতের নির্দেশ অনুযায়ী ওসিকে ঘটনাটির পূর্ণাঙ্গ বিবরণ, অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে নেওয়া আইনগত ব্যবস্থা, থানায় রুজুকৃত জিডি বা মামলা, গ্রেপ্তারের কারণ এবং মোবাইল কোর্ট পরিচালনার প্রক্রিয়া সম্পর্কে বিস্তারিত ব্যাখ্যা দিতে হবে।
এ ছাড়া সংশ্লিষ্ট জিডি বা মামলা, গ্রেপ্তার সংক্রান্ত নথি, ডিউটি রোস্টার, সিসিটিভি ফুটেজসহ প্রাসঙ্গিক কাগজপত্রের সত্যায়িত অনুলিপি দাখিল করে আগামী ১৬ মার্চ আদালতে হাজির হতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
আইনজীবী ও নাগরিক সমাজের প্রতিক্রিয়া
এ বিষয়ে কক্সবাজার জেলা আইনজীবী সমিতির সভাপতি অ্যাডভোকেট আবদুল মন্নান বলেন,
“এটি একটি সাহসী ও সময়োপযোগী পদক্ষেপ। এতে আইনের শাসন আরও শক্তিশালী হবে এবং বিচার বিভাগের প্রতি মানুষের আস্থা বাড়বে।”
কক্সবাজার প্রেসক্লাবের সভাপতি ও দৈনিক সৈকত সম্পাদক মাহবুবুর রহমান বলেন,
“এই আদেশ সুশাসন প্রতিষ্ঠায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।”
কক্সবাজার সিভিল সোসাইটির সভাপতি আ.ন.ম. হেলাল উদ্দিন বলেন,
“অনেক সময় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কিছু সদস্য সাধারণ মানুষের অধিকার ক্ষুণ্ন করেন। জাস্টিস অব দি পিসের এ উদ্যোগ এ ধরনের নেতিবাচক প্রবণতা কমাতে সহায়ক হবে।”
আইনের শাসন প্রতিষ্ঠায় গুরুত্ব
বিশ্লেষকদের মতে, এ ধরনের ঘটনার ক্ষেত্রে বিচার বিভাগের সক্রিয় ভূমিকা আইনের শাসন ও মানবাধিকার রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ দৃষ্টান্ত স্থাপন করে। আদালতের এই পদক্ষেপের মাধ্যমে ঘটনার প্রকৃত সত্য উদঘাটন এবং আইনগত জবাবদিহিতা নিশ্চিত হবে বলেও মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।



















