নির্বাসন থেকে ক্ষমতার দোরগোড়ায় তারেক রহমান

Shazzadul Alam Khan  avatar   
Shazzadul Alam Khan
বাংলাদেশের রাজনীতিতে এমন সময় আসে, যখন ঘটনাপ্রবাহকে আর বিচ্ছিন্নভাবে দেখা যায় না।..

এ.আর.ইমরান: আগামীকাল ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে জাতীয় নির্বাচন-একটি নির্বাচন, যা বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে কেবল একটি সাংবিধানিক প্রক্রিয়া হিসেবে নয়, বরং দীর্ঘদিনের অচলাবস্থা কাটিয়ে নতুন দিকনির্দেশ নির্ধারণের এক গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্ত হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। এই প্রেক্ষাপটে দীর্ঘ নির্বাসন শেষে দেশে ফেরা বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান আজ রাজনীতির কেন্দ্রে, ক্ষমতার দোরগোড়ায় অবস্থান করছেন।

বাংলাদেশের রাজনীতিতে এমন সময় আসে, যখন ঘটনাপ্রবাহকে আর বিচ্ছিন্নভাবে দেখা যায় না। সময়, জনমত ও বাস্তবতা তখন একই স্রোতে প্রবাহিত হয়। দীর্ঘ প্রায় দুই দশকের নির্বাসন, মামলা ও রাজনৈতিক বিতর্কের পর তারেক রহমানের বর্তমান অবস্থান সেই স্রোতেরই ফল। এটি কোনো আকস্মিক উত্থান নয়; বরং দীর্ঘ রাজনৈতিক টানাপোড়েনের পরিণত প্রকাশ।
শেখ হাসিনার দীর্ঘ শাসনামলের অবসানের পর দেশের রাজনীতিতে যে শূন্যতা তৈরি হয়েছে, তা পূরণে বিকল্প নেতৃত্বের প্রশ্ন সামনে এসেছে। এই প্রশ্নের উত্তরে তারেক রহমানের নাম ক্রমেই স্পষ্ট হয়ে উঠছে। কারণ, সাম্প্রতিক সময়ে তার বক্তব্য ও আচরণে যে সংযম ও দায়িত্ববোধ প্রতিফলিত হয়েছে, তা অতীতের উত্তপ্ত রাজনীতির সঙ্গে একটি সুস্পষ্ট পার্থক্য নির্দেশ করে।

তারেক রহমান বারবার প্রতিশোধের রাজনীতি পরিহারের কথা বলেছেন। তিনি শান্তি, স্থিতিশীলতা ও গণতান্ত্রিক চর্চাকে অগ্রাধিকার দেওয়ার অঙ্গীকার ব্যক্ত করেছেন। রাষ্ট্রের মালিকানা জনগণের হাতে ফিরিয়ে দেওয়ার যে বক্তব্য তিনি তুলে ধরছেন, তা কেবল রাজনৈতিক উচ্চারণ নয়; এটি রাষ্ট্র পরিচালনার দর্শন নিয়ে একটি সুসংহত অবস্থান।

প্রধানমন্ত্রী পদের মেয়াদ সর্বোচ্চ দুই মেয়াদে সীমিত করার প্রস্তাব এই অবস্থানেরই একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিফলন। বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে যেখানে দীর্ঘস্থায়ী ক্ষমতার প্রবণতা প্রায় নিয়মে পরিণত হয়েছে, সেখানে এমন প্রস্তাব প্রাতিষ্ঠানিক ভারসাম্য ও জবাবদিহিতার গুরুত্ব নতুন করে স্মরণ করিয়ে দেয়। এটি ক্ষমতাকে সীমাবদ্ধ করার মাধ্যমে গণতন্ত্রকে টেকসই করার একটি তাৎপর্যপূর্ণ ইঙ্গিত।

অর্থনৈতিক প্রশ্নে তারেক রহমানের দৃষ্টিভঙ্গি বাস্তবতানুগ। পোশাক খাতের ওপর অতিনির্ভরতা কমিয়ে বহুমুখী শিল্পায়ন, নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জন্য সামাজিক সহায়তা জোরদারের যে কথা তিনি বলছেন, তা দেশের দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়ন চ্যালেঞ্জের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে ভারসাম্য রক্ষার যে অবস্থান তিনি তুলে ধরছেন, তা বাংলাদেশের ভূরাজনৈতিক বাস্তবতাকে গুরুত্ব দেওয়ারই প্রতিফলন।

দলীয় রাজনীতির ভেতরে তারেক রহমানের নেতৃত্ব বর্তমানে সুসংহত। বিএনপির সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় তার প্রত্যক্ষ সম্পৃক্ততা দলকে একটি স্পষ্ট দিকনির্দেশ দিয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে দমন ও সংকটে থাকা দলটির মধ্যে যে নতুন আত্মবিশ্বাস দেখা যাচ্ছে, তা নির্বাচনী বাস্তবতাতেও প্রতিফলিত হচ্ছে।

তারেক রহমানের ব্যক্তিগত জীবনের মানবিক দিক-দীর্ঘ নির্বাসনের পর পরিবার নিয়ে দেশে ফেরা, সংযত উপস্থিতি ও পরিমিত ভাষা-তার রাজনৈতিক ভাবমূর্তিকে নতুনভাবে সংজ্ঞায়িত করেছে। এতে তিনি কেবল একটি দলের নেতা হিসেবে নয়, বরং বৃহত্তর রাজনৈতিক বাস্তবতার অংশ হিসেবেও সামনে আসছেন।

আগামীকাল অনুষ্ঠিত জাতীয় নির্বাচন তাই শুধু ক্ষমতা নির্ধারণের প্রশ্ন নয়; এটি দেশের ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক পথচলার দিকনির্দেশ নির্ধারণের মুহূর্ত। নির্বাসন থেকে ক্ষমতার দোরগোড়ায় এসে দাঁড়ানো তারেক রহমানের এই যাত্রা সময়, জনমত ও রাজনৈতিক বাস্তবতার সম্মিলিত প্রতিফলন।
এখন মূল প্রশ্ন সম্ভাবনা নিয়ে নয়, দায়িত্ব নিয়ে। যদি এই নির্বাচনের মাধ্যমে তিনি রাষ্ট্র পরিচালনার ভার গ্রহণ করেন, তবে গণতন্ত্র পুনর্গঠন, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানকে শক্তিশালী করা এবং জনগণের আস্থা পুনঃপ্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়েই এই যাত্রার সার্থকতা নির্ধারিত হবে। নির্বাসনের দীর্ঘ অধ্যায় শেষে ক্ষমতার দোরগোড়ায় দাঁড়িয়ে তারেক রহমানের সামনে এখন সেই ঐতিহাসিক দায়িত্বই অপেক্ষা করছে।

Nessun commento trovato


News Card Generator