নীলফামারীতে চাকরির একঘেয়েমি ছেড়ে স্বপ্নের পথে: মালচিংয়ে পেপসিক্যাম চাষ করে জীবন বদলে দিলেন সুমন মিয়া
যে মানুষটি ২১ বছর ধরে ইপিজেডের চাকরিতে জীবন কাটিয়েছেন, একঘেয়েমিতে হাঁপিয়ে উঠেছিলেন—তিনিই আজ গ্রামের মাটিতে নতুন স্বপ্ন বুনছেন। নীলফামারীর কিশোরগঞ্জ উপজেলার নিতাই ইউনিয়নের বানিয়াপাড়া গ্রামের সুমন মিয়া (৪০) পৈতৃক মাত্র ২৪ শতক জমিতে মালচিং পদ্ধতিতে পেপসিক্যাম চাষ করে এলাকায় তাক লাগিয়ে দিয়েছেন। এলাকায় এটি আধুনিক ও বৈচিত্র্যময় চাষ। ক্ষেতে থোকায় থোকায় ঝুলছে সবুজ, উজ্জ্বল পেপসিক্যাম, যেন ছোট ছোট সবুজ আপেলের মালা। বগুড়া এগ্রো ওয়ানের মাঠকর্মীদের দিকনির্দেশনায় চার মাস আগে শুরু করা এই চাষ থেকে ইতিমধ্যে দেড় লাখ টাকা উপার্জন করেছেন সুমন। আরও দুই মাস ফসল তোলার সুযোগ রয়েছে—আশা করছেন আরও এক লাখ টাকার ফসল পাবেন। চোখে-মুখে খুশির ঝিলিক, মনে স্বপ্নের আলো। শুধু পেপসিক্যাম নয়—দেড় বিঘায় তরমুজ, প্রায় দুই বিঘায় শশা ও টমেটো চাষ করেছেন। প্রতিটিতেই লাভের মুখ দেখেছেন। সুমনের কথায়,
গতানুগতিক চাষে লাভ কম। ভরা মৌসুমে সবাই একসঙ্গে ফসল তুললে বাজার ভেঙে পড়ে, দাম পড়ে যায়, লোকসান হয়। তাই আমি আগাম জাত আর ব্যতিক্রম সময়ে চাষ করি—লাভ নিশ্চিত হয়।
সুমন বলেন, এই পদ্ধতিতে পানি অনেক সাশ্রয় হয়, মাটিতে ১০-২৫ শতাংশ বেশি আর্দ্রতা থাকে, তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রিত হয়, আগাছা কমে। সবচেয়ে বড় সুবিধা—ফল মাটি স্পর্শ না করায় দাগহীন, চকচকে ও পরিষ্কার থাকে, বাজারে দাম বেশি পাওয়া যায়। এটি আধুনিক কৃষির এক সাশ্রয়ী ও লাভজনক উপায়। তবে পলিহাউস বা শেড থাকলে রোগ-বালাই আরও কমে, প্রতিকূল আবহাওয়াতেও অসাধারণ ফলন পাওয়া যায়। পলিহাউস না থাকায় বালাই নিয়ন্ত্রণে বেশি শ্রম ও খরচ করতে হয়—ফেরোমোন ফাঁদ, হলুদ আঠালো ট্র্যাপ ব্যবহার করছেন তিনি। সরকারের কাছে আবেদন জানিয়ে সুমন বলেন,
আমাদের মতো উদ্যোক্তাদের পলিহাউস স্থাপনে প্রণোদনা দিলে আরও অনেকে এগিয়ে আসবে, গ্রামের কৃষি বদলে যাবে।
পেপসিক্যামের বাজার শহরকেন্দ্রিক—রংপুর, সৈয়দপুর, নীলফামারীর সবজিবাজার, সুপারশপ, চাইনিজ ও অভিজাত রেস্তোরাঁয় এর চাহিদা প্রচুর। গ্রামে ব্যবহার কম হওয়ায় শহরে নিয়ে বিক্রি করতে হয়। সুমনের আশা—সবাই যদি এই পুষ্টিকর সবজি খেতে শুরু করে, গ্রামীণ চাষ আরও বাড়বে।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মো. মঞ্জুর রহমান জানান, খরচ বেশি হলেও উচ্চমূল্যে বিক্রি হয়। লাল-হলুদ রঙের পেপসিক্যামে পুষ্টিগুণ বেশি। এ বছর জেলায় মাত্র চারজন উদ্যোক্তা এটি চাষ করছেন—সদরে দুটি, কিশোরগঞ্জে একটি ও ডোমারে একটি।
কৃষি ও সিভিল সার্জন দপ্তর সূত্রে জানা যায়—ভিটামিন সি, এ, বি৬, অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট ও মিনারেলে ভরপুর এই সবজি রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ায়, ত্বক-চুল উজ্জ্বল রাখে, ওজন কমাতে সাহায্য করে, হৃদরোগের ঝুঁকি হ্রাস করে, চোখের স্বাস্থ্য রক্ষা করে, হজমশক্তি বাড়ায়, রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণ করে, মানসিক চাপ কমায়। ক্যাপসাইসিনের কারণে ক্যান্সার প্রতিরোধেও ভূমিকা রাখতে পারে।
সুমন মিয়ার গল্প শুধু একজনের সাফল্যের নয়—এটি প্রমাণ করে যে গ্রাম থেকেও স্বাবলম্বী, লাভজনক জীবন গড়া যায়। তার মতো আরও অনেকে এগিয়ে এলে বাংলাদেশের কৃষি আরও রঙিন ও সমৃদ্ধ হবে।
close
লাইক দিন পয়েন্ট জিতুন!
নীলফামারীতে চাকরির একঘেয়েমি ছেড়ে স্বপ্নের পথে: মালচিংয়ে পেপসিক্যাম চাষ করে জীবন বদলে দিলেন সুমন মিয়া..
কোন মন্তব্য পাওয়া যায়নি



















