মীর মোনায়েম সালেহীন সুবল- একজন স্বীকৃতিহীন মুক্তিযোদ্ধার গল্প ও গফরগাঁওয়ের যাত্রাশিল্প..

Motior Rahman Sumon avatar   
Motior Rahman Sumon
দীর্ঘ ৯ মাস পাহাড়ে জঙ্গলে কাটিয়ে জীবন বিপন্ন রেখে, হাজার মানুষের সেবা করার পরও কেন তিনি মুক্তিযোদ্ধার সনদ পেলেন না, ইহা আমাকে হতবাক করে। ভাবায় মুক্তিযুদ্ধোর স্বীকৃতি যারা পেয়েছেন তাদের থেকে মীর মোনায়ে..

মীর মোনায়েম সালেহীন সুবল- একজন স্বীকৃতিহীন মুক্তিযোদ্ধার গল্প ও গফরগাঁওয়ের যাত্রাশিল্প

 

মীর মোনায়েম সালেহীন যিনি সুবল চেয়ারম্যান নামে অধিক পরিচিত। ২০০৩ থেকে ২০১২ পর্যন্ত একটানা ছিলেন চেয়ারম্যান।

জনাব সুবল ১৯৩৪ সালের ২২ জানুয়ারি মামাবাড়ি বিদ্যাগঞ্জের অলীপুরের মিয়া বাড়িতে জন্মগ্রহণ করেন। (আইডি কার্ডে জন্মসাল ১৯৩৬)। পৈতৃক স্থান- গফরগাঁওয়ের রৌহার মীরবাড়ি। পিতা মো: নুর হোসেন মীর। মাতা- মোছা: আয়েশা আক্তার।

মীর মোনায়েম সালেহীন সুবল ১৯৫৬ সালে ময়মনসিংহের বড়বাজারের ব্যবসায়ী আব্দুল ওয়াদুদ সাহেবের যাত্রাপালা 'ভাই ভাই অপেরাতে' প্রথম যাত্রাভিনয় শুরু করেন। এরপর থেকে বিভিন্ন সময় বিভিন্ন জায়গায় বিভিন্ন যাত্রায় অভিনয় করেন।

গফরগাঁওয়ে ১৯৭৩ সালে 'মিতালী অপেরা' নামে একটি যাত্রা হয়। আব্দুল জব্বার(শিলাসী), সোবহান, কালাচান তাদের নিয়ে এই যাত্রাপালা হয়েছিলো।

সুবল সাহেব ৭০ -৮০ র, দশক পর্যন্ত গফরগাঁও, নান্দাইল, ঈশ্বরগঞ্জ, হোসেনপুর, ত্রিশাল ও ভালুকার উম্মক্ত নাট্য মঞ্চে- গরীব কেন মরে, একটি পয়সা দাও, নবাব সিরাজউদ্দৌলা, বাগদত্তা, গলি থেকে রাজপথ, গঙ্গা থেকে বুড়িগঙ্গা, মোগলে আযম ইত্যাদি বহু নাটক করেছেন।

১৯৭৩ এর শেষের দিকে বর্তমানের বিশিষ্ট অভিনেতা আমির সিরাজী সুবলদের সাথে যাত্রায় যুক্ত হয়েছিলেন। আমির সিরাজী তার সাক্ষাৎকারে মীর মোনায়েম সুবলকে তার ওস্তাদ এবং গুরু বলে সম্বোধন করেন। এরপর থেকে গফরগাঁও এ যাত্রা চলতে থাকে। ১৯৮৬/৮৭ সালে আমির সিরাজী এফডিসিতে নতুন মুখ প্রতিযোগিতায় নির্বাচিত হয়ে ঢাকায় চলে আসেন। গফরগাঁওয়েও যাত্রা থেমে যায় তবু আগে মাঝে মাঝে বিভিন্ন অনুষ্ঠান উপলক্ষ্যে যাত্রাপালা দেখা গেছে। বর্তমানে শুধু গফরগাঁও নয় পুরো বাংলাদেশেই যাত্রাপালা নেই। নতুন প্রজন্মের কাছে ইহা এক অবাস্তব কিছু।

 

১৭ এপ্রিল, ১৯৭১ গফরগাঁওয়ে বোমা ব্লাস্ট হয়। সেখানে উপস্থিত ছিলেন মীর মোনায়েম সালেহীন সুবল। তিনি হতাহতদের হাসপাতালে প্রেরণ ও মৃতদের লাশ দাফন করেন। পরে সেদিনই রাতের খাবার খেয়ে বাড়ি থেকে বিদায় নিয়ে ভারতের উদ্দেশ্যে রওনা হন। ভোর ছটায় ময়মনসিংহ পৌঁছান। সেখানে মানুষের আনাগোনা কম। শম্ভুগঞ্জ খেয়া পার হয়ে বাজারে পৌঁছান। উনার উদ্দেশ্য হালুয়াঘাট হয়ে ভারতে ঢুকা।

মীর মোনায়েম সালেহীনের ভাষ্যেই যদি বলি-

বাজারে এক যুবকের সাথে দেখা হলো সে যাত্রা দলের নায়ক(হেম ঘোষ), সিলেট থেকে এসেছে। সেও ভারত যাবে মনের সাহস দ্বিগুণ হয়ে গেল। দুজনে হালুয়াঘাটের দিকে রওনা দিলাম, পথে একটি ট্রাক পেয়ে সেটিতে উঠে পড়ি। ১৮ এপ্রিল গাছুরি পাড়া হয়ে ডালুতে পৌঁছালাম। ডালু ভারতের সীমান্তবর্তী জায়গা। সেখানে দেখা গেল গফরগাঁওয়ের প্রথম শহীদ(মুক্তিযোদ্ধাদের মধ্যে) বেলালের ছোট ভাই ছাত্র নেতা আলালের সাথে। সেখানে দুইদিন অবস্থান করে অন্যদিকে হাটা শুরু করলাম। পাহাড়ের পাদদেশ দিয়ে হাটতে হাটতে বাঘমারা শরনার্থী শিবিরে পৌছালাম। সেখানে শুনলাম মোহনগঞ্জ(নেত্রকোনা) 'নবজোড়'-অপেরার (যাত্রাদলের নাম) মেয়েদের আটকে রেখেছে। আমি ও যাত্রাদলের নায়ক হেম ঘোষকে সাথে নিয়ে হেটে ও লঞ্চে করে মহিষগুলা হয়ে ধর্মপাশা হয়ে মোহনগঞ্জে পৌছালাম সন্ধ্যায়। পৌছে যাত্রা দলের মেয়েদের খুঁজতে লাগলাম। তাদেরকে পেয়েও গেলাম। তাদেরকে কেউ আটকে রাখেনি। জীবন বাঁচাতে তারা একটি গোদামে আশ্রয় নিয়েছিল। তাদের অভিভাবকদের সাথে আলাপ করে রাতেই নৌকায় করে রওনা দিলাম। তাদের সব অলংকার আমার কাছে রক্ষিত ছিল।

নৌকা চলছে কারো চোখে ঘুম নেই।

 

মুক্তারপুর নামে এক জায়গায় দেখলাম তিনচারটে নৌকা আমাদের দিকে আসছে। মাঝিরা বলল এরা বোধহয় ডাকাত, একথা বলার কিছুক্ষণের মধ্যেই নৌকা গুলো আমাদের ঘিরে ফেলেছে। আমি আস্তে করে পানিতে নেমে গেলাম এবং ডুব দিয়ে, সাঁতার কেটে ডাঙায় উঠলাম। সকালে নৌকার খোঁজ করলাম কিন্তু কোথাও পেলাম না। সারারাত পানিতে থেকে শরীর সাদা হয়ে গেছে কোনো শক্তি পাচ্ছিলাম না। রোদের তাপে কিছুক্ষণ পর একটু বল আসলো আমি নদীর পাড় ধরে হাটতে লাগলাম। কিছুক্ষণ পর একটি বস্তি পেলাম, মনে হল হিন্দু অধ্যুষিত এলাকা। তারা জানালো এ এলাকার নাম নজরপুর।

আরো জানতে পারলাম এ গ্রামের সবচেয়ে ধনী ব্যক্তি হেমচন্দ্র দাশের বাড়িতে কিছু যাত্রার মেয়ে আশ্রয় নিয়েছে। আমার কথা কেউ মনে করেনি। খুব কষ্ট লাগলো।

 

ভাগ্য ভালো যে বাড়িতে মেয়েগুলো আশ্রয় নিয়েছে সেই হেমচন্দ্র গফরগাঁওয়ে আঠারদানা গ্রামের দাস বাড়িতে বিয়ে করেছে। সেই সুবাদে হেম বাবু আমাকে বড় শ্যালক বলে সম্বোধন করতেন। নজরপুর গ্রামটা নদীর ধারে। দিনে স্পীডবোট দিয়ে পাঞ্জাবিরা আনাগোনা করতো। তাই মনের মধ্যে ভয় ছিলো কখন যেন পাঞ্জাবিরা আক্রমণ করে। সবাই মিলে স্থির করলাম আজ রাতেই ভারত রওনা হব।

 

সবাই আল্লাহর নাম নিয়ে মধ্যরাতে নৌকা ছেড়ে দিলাম। সকালে আমরা বাধাঘাটে পৌছায়, সেখান থেকে পায়ে হেটে ভারতের বটছড়ায় প্রবেশ করি। আমাদের দলে পুরুষের চেয়ে মেয়ের সংখ্যা বেশি ছিল। সবাই বন জঙ্গল পাথরের পাহাড় পার হয়ে ওয়ারেংকা নামক এক জায়গায় এসে থামলাম। সে জায়গাটি ছিল খাসিয়া রানীর অধীন। ঝোপ জঙ্গল কেটে আমাদের থাকার মত ব্যবস্থা করা হল। এই ক্যাম্পের পাশে পাহাড় থেকে রাতে বাঘের গর্জন শোনা যেত। জুলাইয়ের দিকে বন্যার পানির মত মানুষ আসতে লাগল। মানুষ যত আসছে রোগের প্রকোপ তত বাড়ছে। আমাশয় ,কলেরা, ডায়রিয়ার মত রোগে বেশি মানুষ মরতে থাকলো। ঝোপ জঙ্গলে লাশ আর লাশ। ইচ্ছে ছিল মুক্তিযুদ্ধে যেতে কিন্তু এই অসহায় মানুষদের ছেড়ে যেতে মন সায় দিল না। জুনের শেষ কিংবা জুলাইয়ের শুরুর দিকে পরিস্থিতি বেশি খারাপ হতে থাকল। পাহাড়ের রানী রেজিনা, কাছাড় জেলার বালাট থানার অফিসার পাথবাবু, বিএসএফ কমান্ডার বি আর খান তাদের নিয়ে বৈঠকে বসলাম স্থির হল রেডক্রসকে খবর দিতে হবে। তাই হল। সেই মোতাবেক আমাকে ১৫ দিনের এ দিয়ে কিভাবে স্যালাইন পুশ করা হয়, কিভাবে তৈরী করা হয় ইত্যাদি শিখিয়ে মাঠে ছেড়ে দেওয়া হল। আল্লাহর নাম নিয়ে মানুষের সেবায় কাজে ঝাপিয়ে পড়লাম। ওয়ারেংকা, পানছড়া, মনাই এই তিন শরনার্থী শিবিরের দায়িত্ব আমাকে দেওয়া হল। মাঝে মাঝে মুক্তিযুদ্ধাদেরকেও সেবা দেওয়া লাগতো। অনেক লাশের কোনো নিকটাত্মীয় ছিল না এগুলোর সতকারের ব্যবস্থা করতে হত। দিন যত যেতে লাগলো শরনার্থীর সংখ্যাও বাড়তে লাগলো। আমাদের তিন শরনার্থী ক্যাম্পে তাহেরপুর ও সুনামগঞ্জের মানুষ বেশি ছিল।

 

এখানে একটি ঘটনার কথা এখনো মনে আছে, ওস্তাদ সুরকার গোপাল দত্ত কলেরায় আক্রান্ত হলেন, কোনো কিছুতেই কাজ হচ্ছিলো না। আমি, তার প্রিয় শিষ্য আদিত্য গৌরাঙ্গ , লোক সংগীত শিল্পী বারি সিদ্দিকী ওস্তাদের সেবায় রাতদিন অতিবাহিত করছিলাম। তারা দুজনেই নেত্রকোনার বাসিন্দা।কিন্তু অসুখ সাড়ার কোনো লক্ষণ নেই। আমরা রানী রেজিনার স্মরণাপন্ন হলাম। বিস্তারিত বলার পর রাতেই শিলং থেকে লোক পাঠিয়ে সেলাইন আনার ব্যবস্থা করা হল। সেই সেলাইন পুশ করার পর ওস্তাদ আস্তে আস্তে সুস্থ হয়ে উঠলো।

স্বাধীনতার পর ওস্তাদ গোপাল দত্ত বেতার ও টেলিভিশনে খেয়াল পরিবেশন করতেন।

 

প্রায় নয় মাস সেই পাহাড়ের পাদদেশে কাটিয়েছি তখন মনে হত হয়তো কোনদিন দেশে যেতে পারবো না। কত লাশ পুড়িয়েছি তার হিসাব নেই। একটা লাশের কথা মনে আছে সেই ভদ্র লোক মুসলমান বাড়ি গাজিপুরের শ্রীপুরে। সে সুনামগঞ্জের কৃষি ব্যাংকের পিয়ন। তার একমাত্র ছেলে কলেরায় মারা গেছে।সে আমার পায়ে পড়ে কাদতে লাগলো তার ছেলেকে যেন কবরের ব্যবস্থা করা হয়।

সেখানে কবর দেওয়ার মত পরিবেশ নাই। চারদিকে পাথরের জমি। দুজনে মিলে চার ঘণ্টায় একফুটের মত গর্ত করে লাশটি সাদা কাপাড়ে পেচালাম। কিন্তু জানাজার মানুষ নাই। এসময় দুজন লোক আমাদের দিকে এগিয়ে আসলো এবং বলল তারা মুসলমান। আমার ইমামতীতে জানাজা শেষ করলাম। হাজার হাজার মানুষ হাজার হাজার ঘটনা। সব মনে নেই।

 

যাত্রার মেয়েদের মধ্যে অঞ্জলী বন্দনা আমাদের সাথে থাকতো তার মা সহ।কে হিন্দু কে মুসলমান সব ভুলে গিয়ে শুধু ভাবতাম আমরা মানুষ।

নভেম্বরের প্রথম দিকে সকাল ১০/১১ টা হবে, মাথায় সেলাইন, হাতে ওষুদের পুটলা নিয়ে পানছড়ি ক্যাম্পের দিকে যাচ্ছিলাম সেখানে মোহনগঞ্জের কিছু লোকের মধ্যে কলেরা দেখা দিয়েছে। হঠাৎ দেখি ৩০/৩৫ জন মুক্তিযুদ্ধা হেটে হেটে যাচ্ছে। কাছে আসতেই অনেককে চিনতে পারলাম। আমার অন্তরঙ্গ বন্ধুবর ভাই ফজলু(বাড়ি নিগুয়ারী ইউনিয়ন), মফিজুল হক চেয়ারম্যান, সেলিম চেয়ারম্যান (মশাখালি ইউনিয়ন) আরও অনেকে। প্রায় ৬মাস পর এলাকার মানুষ পেয়ে আনন্দে আত্মহারা হয়ে গেলাম। তাদের কাছে জানলাম ভিতরে যুদ্ধ করে তাদের গোলাবারুদ শেষ হয়ে গেছে তাই তারা ভারতে এসেছেন গোলাবারুদের জন্য। ছাত্রনেতা বেলাল ও অনিলকে পাকিস্তানবাহিনী হত্যা করেছে শুনে মনটা খারাপ হয়ে গেল। তাদের সাথে আমার রাজনৈতিক মিল ছিল না। তারা ছিলো আওয়ামিলীগের অনুসারী আর আমি ছিলাম ভাসানীর ন্যাপের কর্মী। কিন্তু স্বাধীনতার প্রশ্নে আমরা একমত ছিলাম।

আর শুনলাম পাকিস্তানি বাহিনী চর-আলগী  ইউনিয়ন জ্বালিয়ে দিয়েছে। আমার যতটুকু সাধ্য তাদের আপ্যায়ন করে বিদায় দিলাম। তারা বালাটের দিকে রওনা হল।

তারা চলে যাবার পরদিন বি এস এফ কমান্ডার মি. বি আর খান আমাকে বললেন গতকাল সন্দেহজনক কিছু লোক ধরা পড়েছে। তখন আমি বললাম তারা মুক্তিযুদ্ধা ,আওয়ামীলীগের কর্মী তাদের ধরা তাদের উচিত হয় নাই। আমি তাদের ছেড়ে দেবার অনুরোধ করলাম। সে বলল এটা উপর মহলে জানিয়ে দেওয়া হয়েছে তাই এখন কিছু করার নেই তবে তুমি যখন বলছো তাদের আর নির্যাতন করা হবে না। পর দিন বিএসএফ কমান্ডারের অনুমতি নিয়ে বালাট ক্যাম্পে গেলাম। দেখলাম কমান্ডার ফজলু ভাইকে খুব নির্যাতন করেছে। তার ছোট ভাই মন্টু সেও মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার। তাদের সাথে আলাপ করে চলে এলাম ওয়ারেংকা ক্যাম্পে। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য স্বাধীনতার পর আমার সেই বন্ধুদের মুক্তি দিয়েছিলো ভারত সরকার। আমি আমার কাজ নিয়ে ব্যস্ত সময় কাটাতে লাগলাম। সময় যত গড়াচ্ছে শরনার্থী শিবিরে আনন্দ তত বাড়ছে ,চারদিক থেকে মুক্তিবাহিনীর বিজয়ের খবর আসছিলো। সবসময় ভাবতাম এই বুঝি পাকিস্তানি বাহিনী আত্মসমর্পণ করছে। অবশেষে সেই মহেন্দ্রক্ষন এসে ধরা দিল। ১৬ ডিসেম্বর জেনারেল নিয়াজী তার বাহিনী নিয়ে আত্মসমর্পণ করলো। ওয়ারেংকা, বালাট, মনাই, পানছড়া সব ক্যাম্পে জয়বাংলা স্লোগানে মুখরিত হয়ে উঠলো। আনন্দ স্রোত বইতে লাগলো আমাদের মধ্যে। এসময় বিএসএফ কমান্ডার বি আর খান আমাকে বলল ,তোমাদের এমপি হামিদ সাহেব(বর্তমান বাংলাদেশের  মহামান্য রাষ্ট্রপতি) মৈলাম ক্যাম্পে শরনার্থীদের উদ্দেশ্যে বক্তব্য রাখবেন। তখন হামিদ সাহেব ইটনা, মিঠামইনের এম এল এ। আমি ওয়ারেংকা, মনাই, পানছড়া ক্যাম্প থেকে প্রায় হাজার খানেক লোক নিয়ে বিকালের মধ্যেই মৈলাম শরনার্থী শিবিরে উপস্থিত হই।

গিয়ে দেখি কোন মঞ্চ নেই চেয়ারটেবিল কিচ্ছু নেই। আমি পাশের একটি চায়ের দোকান থেকে চেয়ার এনে একটি মঞ্চ তৈরী করি। হামিদ সাহেব আসার কথা চারটায় কিন্তু সন্ধ্যা হয়ে গেল তার আসার নাম নাই। এদিকে আমার সভাপতিত্বে সভার কাজ শুরু হল। প্রায় ৪০ জন বক্তৃতা করলেন।  আনন্দের আতিশয্যে যার যা খুশি তাই বলছে। অবশেষে রাত ৮টায় হামিদ সাহেব আসলেন। আমি আমার বক্তবের মাধ্যমে হামিদ সাহেবকে সবার সাথে পরিচয় করিয়ে দিলাম। উনি দাঁড়িয়ে সবার উদ্দেশ্যে সমাপনী বক্তব্য রাখলেন।

 

রাত দশটায় ক্যাম্পে পৌছালাম। শরনার্থীরা আনন্দে আত্মহারা। কখন দেশে ফিরবে সেই জন্যে উদগ্রীব। প্রায় নয় মাস ভারতে রয়েছি। আমাদের খাবার, বাসস্থান, চিকিৎসা সব ভারত দিয়েছে। তাদের নিয়ম মেনেই আমাদের দেশে ফিরতে হবে। যারা তাহেরপুর, সুনামগঞ্জের বাসিন্দা তাদের আগে বিদায় দেওয়া হল। একে একে সবাই বিদায় নিচ্ছে ২২ ডিসেম্বর থেকে জানুয়ারির শেষ পর্যন্ত। সবাই চলে গেল শুধু রইলাম আমি একা। কারণ- আমার আশ্রিতা অঞ্জলীকে বালাট থানা অফিসার পাথবাবু বিয়ের প্রস্তাব দিয়েছে। সৃষ্টিকর্তায় কৃপায় শুভ বিবাহ সম্পন্ন হল। আমি দায় মুক্ত হয়ে আল্লাহর নামে দেশের উদ্দেশ্যে রওনা দিলাম। ওয়ারেংকা থেকে বাধাঘাট এসে সেখান থেকে সাচনার লঞ্চঘাটে পৌছালাম। রাত দশটায় লঞ্চ ছাড়বে। ততক্ষণ অপেক্ষা করতে থাকলাম। পরদিন সকালে ভৈরব লঞ্চঘাটে নামলাম। সেখান থেকে রেলস্টেশনে এসে অনেক্ষন অপেক্ষা করে একখানা ভাঙাচোরা ট্রেন পাইকাম। ট্রেন থেকে দুপাশের গ্রামের পাঞ্জাবীদের অত্যাচারের বিভৎস্য দৃশ্য দেখতে থাকলাম। ৪/৫ ঘন্টা পর টঙ্গি স্টেশনে আসলাম। স্টেশনে প্রায় সবাই আমার দিকে চেয়ে আছে। মাথার চুল মেয়েদের মত হয়েগেছে দাড়িও কাটা হয় নাই। অবশেষে আরেক ট্রেনে গফরগাঁও আসলাম।

 

বাড়িতে আসার পর মা অনেকক্ষন আমার মুখের দিকে চেয়ে থেকে বলল, সুবল এতো দিন তুই কোথায় ছিলি বাবা? আমরা তো মনে করছি তুই যুদ্ধে মারা গেছিস। মার চিৎকারে সবই ছুটে এল। মা শুধু বলতে লাগলো, আমার সুবল মরে নাই। বাইচ্যা আছে। কারণ- কিছুদিন আগে নাকি আমার গায়েবি জানাজা হয়েছে। আমি বেঁচে আছি, মৃত মানুষ ফিরে এসেছে একথা জেনে আবাল বৃদ্ধ বনীতা সবাই দেখতে এসেছে। আমার চাচা তালেব মীর আমাকে খুব আদর করতেন। তিনি বললেন, 'আল্লাহ যাকে বাঁচিয়ে রাখে কেউ তাকে মারতে পারে না।' মা নয় মাস পর আমাকে সাবান দিয়ে গোসল করালেন। আমি খেয়ে ঘুমিয়ে পড়লাম।

দিনরাত কিভাবে কেটে গেল টেরই পেলাম না। গ্রামের অনেক আত্মীয়স্বজন, বন্ধুকে  পাঞ্জাবীরা হত্যা করেছে। আমি কীভাবে বেঁচে ফিরলাম আজও ভাবতে অবাক লাগে।

খুব কষ্টভরা কণ্ঠে মীর মোনায়েম সালেহীন সুবল বলেন, 'আজ স্বাধীনতার ৫০ বছর পূর্ণ হলেও এখন পর্যন্ত মুক্তিযোদ্ধার সনদ পেলাম না।'

দীর্ঘ ৯ মাস পাহাড়ে জঙ্গলে কাটিয়ে জীবন বিপন্ন রেখে, হাজার মানুষের সেবা করার পরও কেন তিনি মুক্তিযোদ্ধার সনদ পেলেন না, ইহা আমাকে হতবাক করে। ভাবায় মুক্তিযুদ্ধোর স্বীকৃতি যারা পেয়েছেন তাদের থেকে মীর মোনায়েম সালেহীনের ফারাক কত টুকু?

Aucun commentaire trouvé


News Card Generator