মেয়ের হত্যার বিচার চেয়ে প্রেসক্লাবে কাঁদছেন অসহায় পিতা
সীতাকুণ্ড (চট্টগ্রাম) প্রতিনিধি :
চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডে নিজের মেয়ের হত্যার সঠিক বিচার চেয়ে এক অসহায় বাবা দ্বারে দ্বারে ঘুরে বেড়াচ্ছেন। প্রতিদিন তিনি প্রেসক্লাবে এসে সাংবাদিকদের সামনে কান্নায় ভেঙে পড়ছেন, তুলে ধরছেন বিচার না পাওয়ার আশঙ্কা এবং প্রভাবশালী মহলের চাপের অভিযোগ।
ভুক্তভোগী বাবা মো. মোস্তফা স্বপন (৫৫) সীতাকুণ্ড উপজেলার কুমিরা ইউনিয়নের ১ নম্বর ওয়ার্ডের মসজিদ্দা গ্রামের বাসিন্দা। তিনি অভিযোগ করে বলেন, এক বছর আগে তার মেয়ে নাজমুন নাহান প্রমা (২১)-কে একই এলাকার শাহজাহানের ছেলে মো. জামশেদের সঙ্গে বিয়ে দেন। বিয়ের পর থেকেই প্রমা তার স্বামী, শ্বশুর, শাশুড়ি ও দেবরের শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের শিকার হয়ে আসছিলেন।
তিনি জানান, এ নির্যাতনের বিষয়ে একাধিকবার পারিবারিকভাবে দেনদরবার ও মীমাংসার চেষ্টা করা হলেও শ্বশুরবাড়ির পক্ষ থেকে নির্যাতন বন্ধ করা হয়নি।
মোস্তফা স্বপনের অভিযোগ, গত ১১ ডিসেম্বর ২০২৫ ইং বৃহস্পতিবার দুপুর আনুমানিক ১টার দিকে পরিকল্পিতভাবে তার মেয়েকে হত্যা করা হয়। ঘটনার দিন পরিবারের অন্য সদস্যদের সঙ্গে খাবার খেতে যাওয়ার সময় সামান্য কথা কাটাকাটির জেরে শ্বশুর ও শাশুড়ি তার ওপর চড়াও হন। একপর্যায়ে তারা গলা টিপে ধরে শ্বাসরোধ করে প্রমাকে হত্যা করেন।
তিনি আরও বলেন, হত্যাকাণ্ডকে আত্মহত্যা হিসেবে চালিয়ে দিতে প্রমার গলায় কাপড় পেঁচিয়ে ঘরের ভেতরে সামান্য উঁচু স্থানে ঝুলিয়ে রাখা হয়। তবে নিহতের পা মাটিতে লেগে ছিল এবং তার গলায় আঙুলের চারটি স্পষ্ট দাগ পাওয়া যায়, যা আত্মহত্যার দাবিকে প্রশ্নবিদ্ধ করে।
খবর পেয়ে সীতাকুণ্ড থানা পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে লাশ উদ্ধার করে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ (চমেক) হাসপাতালে ময়নাতদন্তের জন্য পাঠায়। পরদিন ময়নাতদন্ত শেষে লাশ পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হলে স্থানীয় হাম্মেদিয়া দীঘির পাড়ে দাফন সম্পন্ন করা হয়।
মোস্তফা স্বপন অভিযোগ করেন, ময়নাতদন্ত প্রতিবেদন নিয়ে তিনি চরম শঙ্কার মধ্যে রয়েছেন। তার দাবি, হাসপাতালের সংশ্লিষ্ট এক কর্মচারীর মাধ্যমে তাকে জানানো হয়েছে— মেয়ের স্বামীপক্ষ এক লাখ টাকা দিতে রাজি রয়েছে। একই সঙ্গে তাকেও জিজ্ঞেস করা হয়েছে, তিনি কত টাকা দিতে পারবেন। তিনি গরিব মানুষ হওয়ায় কোনো টাকা দিতে পারবেন না জানালে তাকে ন্যায়বিচারের আশা ছেড়ে দিতে বলা হয়েছে বলেও অভিযোগ করেন তিনি।
কান্নাজড়িত কণ্ঠে তিনি বলেন,
“আমি বুঝে গেছি, রিপোর্ট আমার পক্ষে আসবে না। তারপরও আমি আমার নিরপরাধ মেয়ের হত্যার ন্যায়বিচার চাই।”
এদিকে অভিযুক্ত শ্বশুরবাড়ির পক্ষ থেকে ঘটনাটিকে আত্মহত্যা বলে দাবি করা হচ্ছে।
স্থানীয় মানবাধিকারকর্মীরা বলছেন, এটি কেবল একটি পারিবারিক ঘটনা নয়; বরং নারী নির্যাতন, বিচারহীনতা ও প্রভাব খাটানোর একটি ভয়াবহ দৃষ্টান্ত। তারা দ্রুত নিরপেক্ষ তদন্ত, ময়নাতদন্ত প্রতিবেদন প্রকাশ এবং ঘটনার সঙ্গে জড়িতদের আইনের আওতায় আনার দাবি জানিয়েছেন।
অসহায় এই বাবার মতো দেশের নানা প্রান্তে আজও বহু বাবা-মা তাদের সন্তান হত্যার বিচার চেয়ে দ্বারে দ্বারে ঘুরছেন—যা সমাজ ও বিচার ব্যবস্থার প্রতি গভীর প্রশ্ন তুলে ধরছে।



















