close

কমেন্ট করুন পয়েন্ট জিতুন!

মধ্য শাবানের মাহাত্ম্য ও করণীয়।

Fardin Niaz avatar   
Fardin Niaz
****

শাবান মাসের ১৪ তারিখ দিবাগত রাত। আমাদের সমাজে এটি শবেবরাত নামে বেশি পরিচিত হলেও হাদিসের ভাষায় একে লাইলাতুন নিসফি মিন শাবান বা মধ্য শাবানের রাত বলা হয়েছে। এই রাতটি নিয়ে আমাদের সমাজে যেমন অতিরঞ্জিত আবেগের ছড়াছড়ি আছে, তেমনি সুন্নাহ পরিপন্থি নানা কুসংস্কারও ছড়িয়ে আছে। যার সঙ্গে ইসলামের কোনো সম্পর্ক নেই। অথচ উচিত হলো অতি বাড়াবাড়ি এবং ছাড়াছাড়ি ব্যতিরেকে সুন্নাহসম্মত পদ্ধতিতে এই রাতের গুরুত্ব ও মাহাত্ম্য অনুধাবন করা এবং আমল করা।

এই রাতে সাধারণত মসজিদে মুসল্লিদের ভিড় জমে। অনেকে মনে করেন, এটি ভাগ্য নির্ধারণী রাত। এই রাতে আগামী এক বছরের হায়াত, মউত ও রিজিক নির্ধারণ করা হয়। এটি গ্রহণযোগ্য ধারণা নয়। পবিত্র কোরআনের সুরা দুখানের শুরুতে যে বরকতময় রাতে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো ফয়সালা হওয়ার কথা বলা হয়েছে, তা মূলত লাইলাতুল কদর। যা রমজান মাসের শেষ দশকের রাতগুলোর মধ্যে একটি রাত।

রসুল (সা.) বলেছেন, মধ্য শাবানের রাতে মহান আল্লাহ তাঁর সৃষ্টির প্রতি বিশেষ রহমতের দৃষ্টি দেন এবং মুশরিক ও অন্যের প্রতি বিদ্বেষ পোষণকারী ব্যক্তি ছাড়া সবাইকে সাধারণ ক্ষমা ঘোষণা করেন (বায়হাকি)। এই হাদিস থেকে আমরা বুঝতে পারি, শিরক ও হিংসাবিদ্বেষ হলো আল্লাহর অবারিত এই ক্ষমা পাওয়ার পথে প্রধান দুটি বাধা।

সুতরাং কেউ যদি এই রাতে সারা রাত ইবাদতে লিপ্ত থাকে, কিন্তু তার ইমানে শিরক কিংবা মনে কোনো মুসলিম ভাইয়ের প্রতি ঘৃণা বা শত্রুতা পোষণ করে, তবে এই রাতের সাধারণ ক্ষমা তার ভাগ্যে জুটবে না। তাই মধ্য শাবানের রাতকে ঘিরে প্রধান কাজ হওয়া উচিত ইমানকে শিরকমুক্ত করা ও প্রতিহিংসার আগুন থেকে মনকে পবিত্র করা। এ ছাড়া এই রাতের ফজিলত ও আমল সম্পর্কে আরও অনেক হাদিস আছে, তবে সেগুলো সনদের দিক দিয়ে ত্রুটিপূর্ণ।

এই রাতের বিশেষ কোনো নামাজ কিংবা জিকির-আসকার নেই। অন্য সাধারণ রাতে একজন মুমিন যেভাবে নফল ইবাদত করেন, এই রাতেও তিনি চাইলে সেভাবে ব্যক্তিগতভাবে নফল আমল করতে পারেন এবং আল্লাহর বিশেষ ক্ষমা লাভের চেষ্টা করতে পারেন। কিন্তু এর জন্য নির্দিষ্ট কোনো পদ্ধতি বা সংখ্যার নামাজ বা ইবাদতের কাঠামো তৈরি করা সুন্নাহসম্মত নয়।

অনেক অঞ্চলে এই রাতকে কেন্দ্র করে সুন্নাহর নামে বিভিন্ন কুসংস্কারও চালু আছে। যেমন এই রাতে খাবারের উৎসব করা। বিশেষ করে হালুয়া-রুটি বিতরণের যে সংস্কৃতি আমাদের সমাজে প্রচলিত আছে, এর সঙ্গে সুন্নাহর কোনো সম্পর্ক নেই। এর প্রমাণ হিসেবে অনেকে একটি ভিত্তিহীন গল্প বলেন যে ওহুদ যুদ্ধে নবীজি (সা.)-এর দাঁত মোবারক শহীদ হওয়ার পর তিনি শক্ত খাবার খেতে পারতেন না বলে হালুয়া খেয়েছিলেন, তাই আমাদেরও তা খেতে হবে। আর এটা খাওয়া হয় শবেবরাতে। অথচ ওহুদ যুদ্ধ শাবান মাসে হয়নি এবং এই গল্পের নির্ভরযোগ্য কোনো ভিত্তিও নেই। এমন একটি বানোয়াট গল্পের ওপর ভিত্তি করে ইবাদত ও ক্ষমার রাতে রান্নাবান্না ও উৎসবের পেছনে সময় ব্যয় করাটা প্রকারান্তরে ইবাদত থেকে বিচ্যুত হওয়া ছাড়া আর কিছু নয়। একইভাবে আতশবাজি ফোটানো, ঘরবাড়ি আলোকসজ্জা করাটাও ইসলামের শিক্ষার সম্পূর্ণ পরিপন্থি।

অনেকে এই রাতে দলবদ্ধভাবে ইবাদত করেন। নফল ইবাদত হলো বান্দার সঙ্গে তাঁর প্রভুর একান্ত বিষয়। রসুল (সা.) ও সাহাবিদের যুগে এই রাতে দলবদ্ধ হয়ে মসজিদে জিকির বা সম্মিলিত দোয়া করার কোনো প্রমাণ পাওয়া যায় না। নফল নামাজ ও দোয়া ঘরে নিভৃতে করাই উত্তম ও সুন্নাহর অধিক নিকটবর্তী।

সর্বোপরি এই রাতটি ঘটা করে উৎসব করার নয়, বরং আল্লাহর ক্ষমা লাভের চেষ্টা করার উপলক্ষ। যদি আল্লাহর ক্ষমা পেতে চাই, তবে উচিত হলো অন্যকে ক্ষমা করার উদারতা লালন করা। কারও প্রতি হিংসাবিদ্বেষ পুষে রাখলে আল্লাহর রহমতের দৃষ্টি ও সাধারণ ক্ষমা থেকে বঞ্চিত হতে হবে।

 

তাই এই রজনিকেন্দ্রিক বাড়াবাড়ি ও ছাড়াছাড়ি থেকে দূরে থেকে শিরকমুক্ত ইমান ও হৃদয়কে সব ধরনের মালিন্য থেকে মুক্ত করা হোক আমাদের প্রধান ব্রত।

Tidak ada komentar yang ditemukan


News Card Generator