যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে ঘোষিত দুই সপ্তাহের সাময়িক যুদ্ধবিরতি চুক্তিটি কার্যকর হওয়ার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই বড় ধরনের কূটনৈতিক সংকটের মুখে পড়েছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দাবি করেছেন যে, লেবানন এই চুক্তির আওতাভুক্ত নয়। ট্রাম্পের এই বক্তব্য চুক্তির মধ্যস্থতাকারী দেশ পাকিস্তানের দাবির সম্পূর্ণ বিপরীত, যা মধ্যপ্রাচ্যের ভঙ্গুর শান্তি প্রক্রিয়াকে পুনরায় যুদ্ধের দিকে ঠেলে দিচ্ছে।
বুধবার লেবাননের জনবহুল এলাকায় ইসরায়েলি বাহিনীর ভয়াবহ হামলার পর এক প্রতিক্রিয়ায় প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প জানান, হিজবুল্লাহর বিরুদ্ধে ইসরায়েলের এই যুদ্ধ একটি ‘বিচ্ছিন্ন সংঘর্ষ’ (Separate Skirmish)। এটি যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যকার বৃহত্তর যুদ্ধবিরতির অংশ নয়। অথচ চুক্তির প্রধান মধ্যস্থতাকারী পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শেহবাজ শরিফ স্পষ্ট করে বলেছিলেন যে, এই যুদ্ধবিরতি লেবাননসহ পুরো অঞ্চলের জন্য ‘অবিলম্বে’ কার্যকর হবে। ট্রাম্পের এই বিপরীতমুখী অবস্থানে বিশ্ব কূটনীতিতে চরম বিভ্রান্তি তৈরি হয়েছে।
লেবাননকে চুক্তির বাইরে রাখার প্রতিবাদে তেহরান কঠোর অবস্থান নিয়েছে। ইরানের রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থা ‘ফার্স নিউজ’ জানিয়েছে, লেবাননে ইসরায়েলি হামলার প্রতিবাদে হরমোজ প্রণালী দিয়ে তেলের ট্যাংকার চলাচল আবারও স্থগিত করা হতে পারে। যদিও সরকারিভাবে এর কোনো নিশ্চিতকরণ পাওয়া যায়নি, তবে ইরানের রেভল্যুশনারি গার্ডস (IRGC) সতর্ক করে দিয়ে বলেছে, লেবাননে ইসরায়েলি আগ্রাসন অবিলম্বে বন্ধ না হলে তারা পুনরায় যুদ্ধ শুরু করতে বাধ্য হবে। তাসনিম নিউজ এজেন্সির এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইসরায়েল যদি লেবাননে যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘন অব্যাহত রাখে, তবে ইরান এই চুক্তি থেকে পুরোপুরি বেরিয়ে আসবে।
ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরঘচি পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রীর পোস্টটি শেয়ার করে জানিয়েছেন, চুক্তির শর্তগুলো অত্যন্ত স্পষ্ট। তিনি ওয়াশিংটনকে উদ্দেশ্য করে বলেন, “যুক্তরাষ্ট্রকে যেকোনো একটি বেছে নিতে হবে—হয় যুদ্ধবিরতি, না হয় ইসরায়েলের মাধ্যমে প্রক্সি যুদ্ধ। তারা দুটি একসঙ্গে পেতে পারে না।” আরঘচি আরও যোগ করেন যে, লেবাননের এই গণহত্যা পুরো বিশ্ব দেখছে এবং এখন বল পুরোপুরি যুক্তরাষ্ট্রের কোর্টে। যুক্তরাষ্ট্র তাদের প্রতিশ্রুতি রক্ষা করবে কি না, বিশ্ব এখন সেদিকেই তাকিয়ে আছে।
চুক্তির ঘোষণা আসার পর থেকেই ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু সাফ জানিয়ে দিয়েছেন যে, লেবাননে তাদের হামলা থামবে না। বুধবার লেবাননে ইসরায়েলের নজিরবিহীন বিমান হামলায় শত শত মানুষ হতাহত হয়েছেন। ইসরায়েলি সংবাদমাধ্যম চ্যানেল ১২-এর মতে, ইরান শুরু থেকেই লেবাননকে চুক্তির অন্তর্ভুক্ত করার শর্ত দিয়ে আসছিল। কিন্তু মাঠপর্যায়ে ইসরায়েলের অব্যাহত হামলা এবং ট্রাম্পের সমর্থন এই চুক্তির ভবিষ্যৎকে এখন খাদের কিনারায় দাঁড় করিয়েছে।
লেবানন নিয়ে ট্রাম্পের এই মন্তব্য কেবল কূটনৈতিক বিভ্রান্তিই নয়, বরং এটি পুরো মধ্যপ্রাচ্যকে এক মহাপ্রলয়ংকারী যুদ্ধের দিকে ধাবিত করার ইঙ্গিত দিচ্ছে। শুক্রবার ইসলামাবাদে অনুষ্ঠিতব্য শান্তি বৈঠকের আগে লেবানন ইস্যুতে কোনো পরিষ্কার সমাধান না এলে দুই সপ্তাহের এই যুদ্ধবিরতি কেবল কাগজে-কলমেই সীমাবদ্ধ থেকে যাবে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।



















