ক্ষমতা ও মিডিয়ার অশুভ আঁতাত, এপস্টাইন ফাইলস এবং পশ্চিমা সভ্যতার মুখোশ উন্মোচন..

আব্দুল্লাহ আল মামুন avatar   
আব্দুল্লাহ আল মামুন
বছরের পর বছর ধরে এপস্টাইনের দ্বীপে কী ঘটছে, তা মিডিয়ার অজানা ছিল না। কিন্তু বড় বড় রাজনৈতিক শক্তি এবং পুঁজিপতিদের স্বার্থ রক্ষায় তারা মুখে কুলুপ এঁটেছিল।..

বর্তমান বিশ্ব এক অদ্ভুত গোলকধাঁধায় বন্দি। একদিকে তথাকথিত উন্নত বিশ্বের প্রগতিশীল স্লোগান, অন্যদিকে পর্দার আড়ালে জেফরি এপস্টাইনের মতো ব্যক্তিদের তৈরি করা এক আদিম ও বর্বর নেটওয়ার্ক। এই পুরো প্রক্রিয়ায় আধুনিক মিডিয়া এবং বিশ্ব রাজনীতি যেভাবে সত্যকে ধামাচাপা দিয়ে মিথ্যার বেসাতি করেছে, তা আজ ইতিহাসের এক বড় কলঙ্ক হিসেবে চিহ্নিত হচ্ছে।

গণমাধ্যমকে বলা হয় সমাজের দর্পণ বা চতুর্থ স্তম্ভ। কিন্তু এপস্টাইন কাণ্ড প্রমাণ করেছে যে, পশ্চিমা মূলধারার মিডিয়া (Mainstream Media) অনেক সময় সত্যের প্রহরীর বদলে অপরাধীদের পাহারাদার হিসেবে কাজ করে। বছরের পর বছর ধরে এপস্টাইনের দ্বীপে কী ঘটছে, তা মিডিয়ার অজানা ছিল না। কিন্তু বড় বড় রাজনৈতিক শক্তি এবং পুঁজিপতিদের স্বার্থ রক্ষায় তারা মুখে কুলুপ এঁটেছিল।

মাওলানা আবুল হাসান আলী নদভী (রহ.) যেমনটি ইঙ্গিত দিয়েছিলেন এই ব্যবস্থায় সব কিছু যখন বাণিজ্যে পরিণত হয়, তখন মিডিয়াও একটি ব্যবসায়িক পণ্যে রূপ নেয়। তারা জনমত গঠন করে না, বরং ক্ষমতাধরদের নির্দেশে জনমতকে ‘ম্যানুফ্যাকচার’ বা উৎপাদন করে। ফলে সাধারণ মানুষ এক বিভ্রান্তিকর মায়াজালে আটকা পড়ে থাকে।

বর্তমান বিশ্ব রাজনীতি এখন আর নীতির ওপর দাঁড়িয়ে নেই, দাঁড়িয়ে আছে ব্ল্যাকমেইলিং এবং স্বার্থের ওপর। বিশ্লেষকদের মতে, এপস্টাইন কেবল একজন যৌন অপরাধী ছিলেন না, তিনি ছিলেন প্রভাবশালী ব্যক্তিদের দুর্বলতা সংগ্রহ করার এক কারিগর। বড় বড় নেতা ও নীতিনির্ধারকদের অনৈতিক কর্মকাণ্ডের ভিডিও ধারণ করে তাদের নিয়ন্ত্রণ করা হতো। এর মাধ্যমেই নির্ধারিত হতো বিশ্ব রাজনীতির গতিপথ। যখন নেতৃত্বের ভিত্তিই হয় পাপাচার ও ব্ল্যাকমেইল, তখন সেই নেতৃত্ব থেকে বিশ্বজুড়ে শান্তি বা ন্যায়ের আশা করা বাতুলতা মাত্র।

আমেরিকা ও তার মিত্ররা যখন অন্য দেশগুলোতে মানবাধিকারের ছবক দেয়, তখন তাদের নিজেদের ঘরের ভেতরে থাকা এই পচনশীল চিত্রটি চরম দ্বিচারিতা হিসেবে ধরা দেয়। একদিকে তারা নারীর স্বাধীনতার কথা বলে, অন্যদিকে তাদেরই শীর্ষ নেতারা পর্দার আড়ালে নারী ও শিশুদের পণ্য হিসেবে ব্যবহার করে। এই দ্বিচারিতাই আজ পশ্চিমা বিশ্বকে এক নৈতিক দেউলিয়ার দ্বারপ্রান্তে নিয়ে গেছে।

এই অন্ধকার বৃত্ত ভাঙার জন্য আজ এক বিকল্প বিশ্ব ব্যবস্থার প্রয়োজন। মাওলানা নদভী তাঁর দর্শনে স্পষ্টভাবে দেখিয়েছিলেন যে, একমাত্র ইসলামই পারে মিডিয়াকে সত্যের বাহক এবং রাজনীতিকে সেবার মাধ্যমে পরিণত করতে। ইসলামে মিডিয়ার কাজ হলো 'আমর বিল মারুফ ওয়া নাহি আনিল মুনকার' (সৎ কাজের আদেশ ও অসৎ কাজের নিষেধ)। সেখানে সত্য গোপন করা বা ক্ষমতার চাটুকারিতা করার কোনো স্থান নেই।

মুসলিম উম্মাহর বর্তমান দুর্বলতা ও অনৈক্যের কারণেই আজ বিশ্ব নেতৃত্ব এই পাপিষ্ঠদের হাতে চলে গেছে। যদি মুসলমানদের মধ্যে সেই আদর্শিক জাগরণ থাকতো, তবে বিশ্ব রাজনীতি আজ এই দুর্গন্ধযুক্ত কাচের বোতলে বন্দি থাকতো না।

এপস্টাইন ফাইলস কেবল একটি ফাইল নয়, এটি পশ্চিমা সভ্যতার মৃতপ্রায় আধ্যাত্মিকতার মরণ-চিৎকার। মিডিয়া ও রাজনীতির এই বিষাক্ত বলয় থেকে মুক্তি পেতে হলে মানুষকে আজ সেই হৃতগৌরব পুনরুদ্ধারের দিকে তাকাতে হবে, যা এক সময় বিশ্বকে ইনসাফ ও পবিত্রতার আলো দেখিয়েছিল। নতুবা এই বিষাক্ত নিঃশ্বাস সভ্যতার প্রতিটি রন্ধ্রকে আরও নিস্তেজ করে ফেলবে।

نظری یافت نشد


News Card Generator