কক্সবাজার ট্যুরিস্ট পুলিশের এসপি আপেল মাহমুদ:ক্ষমতার আড়ালে অনিয়ম, চাঁদাবাজি ও নারী কেলেঙ্কারির বিস্ফোরক অভিযোগ..

Akib Hasan Shad avatar   
Akib Hasan Shad
পর্যটন নিরাপত্তার দায়িত্বে থেকেও বিচ ভাড়া, স্পা-পতিতালয় থেকে মাসোয়ারা, মাদক আত্মসাৎ ও নারী কেলেঙ্কারির অভিযোগে আলোচনায় এই পুলিশ কর্মকর্তা..

কক্সবাজারের পর্যটন নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা ট্যুরিস্ট পুলিশের এসপি (সুপারনিউমারারি অতিরিক্ত ডিআইজি) আপেল মাহমুদকে ঘিরে একের পর এক গুরুতর অভিযোগ সামনে আসছে। ক্ষমতার প্রভাব খাটিয়ে সৈকত ভাড়া দেওয়া, অবৈধভাবে বিজ্ঞাপন বসানো, সরকারি স্থাপনা ভাড়া দিয়ে অর্থ হাতিয়ে নেওয়া, মাদক জব্দ করে আত্মসাৎ, এমনকি নারী কেলেঙ্কারি ও ধর্ষণের অভিযোগ—সব মিলিয়ে আলোচনার কেন্দ্রে এই পুলিশ কর্মকর্তা।

স্থানীয় সূত্র, ট্যুরিস্ট পুলিশের সদস্য, ভুক্তভোগী নারী এবং প্রশাসনের সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সঙ্গে কথা বলে উঠে এসেছে একাধিক বিস্ময়কর তথ্য। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও সম্প্রতি তার কর্মকাণ্ড নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে।

• অনুমোদন ছাড়াই সৈকত ভাড়া, ৩০ লাখ টাকার অভিযোগ :

অনুসন্ধানে জানা গেছে, কক্সবাজার সৈকতের লাবণী থেকে কলাতলী পয়েন্ট পর্যন্ত প্রায় তিন কিলোমিটার এলাকায় একটি স্টিল কোম্পানির বিজ্ঞাপন বসানো হয়েছে ট্যুরিস্ট পুলিশের পাহারায়। অভিযোগ রয়েছে, বিচ ম্যানেজমেন্ট কমিটি বা জেলা প্রশাসনের অনুমোদন ছাড়াই এ কাজটি করা হয়েছে।

ঘটনাস্থলে দায়িত্বরত ট্যুরিস্ট পুলিশের সদস্যরা জানান, এসপি আপেল মাহমুদের নির্দেশেই এসব বিজ্ঞাপন বসানো হয়েছে।

কক্সবাজারের অতিরিক্ত ম্যাজিস্ট্রেট শহিদুল ইসলাম বলেন,
“জেলা প্রশাসনের অনুমোদন ছাড়া সৈকত এলাকায় কোনো কোম্পানির বিজ্ঞাপন বসানোর সুযোগ নেই।”

তবে ট্যুরিস্ট পুলিশের কয়েকজন সদস্য ও সংশ্লিষ্ট কোম্পানির একজন কর্মকর্তা দাবি করেন, জেলা প্রশাসনের অনুমোদন না পাওয়ায় প্রায় ৩০ লাখ টাকা দিয়ে আপেল মাহমুদের সহযোগিতায় ওই বিজ্ঞাপন বসানো হয়।

অভিযোগ ওঠার পর আপেল মাহমুদ কয়েকটি খুঁটি সরিয়ে ফেলার ভিডিও পাঠালেও ৩ মার্চ রাতে সরেজমিনে গিয়ে দেখা গেছে বেশ কয়েকটি বিজ্ঞাপন এখনও অক্ষত রয়েছে।

• সরকারি স্থাপনা ভাড়া দিয়ে অর্থ হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগ :

পর্যটকদের নিরাপত্তার জন্য নির্মিত ওয়াচ টাওয়ার, অভিযোগ কেন্দ্র, পুলিশ বক্স এমনকি সরকারি জেট স্কিও অবৈধভাবে ভাড়া দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে আপেল মাহমুদের বিরুদ্ধে।

লাবণী পুলিশ ফাঁড়ির সামনে নির্মিত একটি ওয়াচ টাওয়ারকে রেস্টুরেন্টে রূপান্তর করে ‘অর্ণব ক্যান্টিন’ নামে ভাড়া দেওয়া হয়। এ জন্য অগ্রিম হিসেবে নেওয়া হয় ৮ লাখ টাকা। পরে বিষয়টি প্রকাশ্যে এলে সেটিকে ‘ট্যুরিস্ট পুলিশ ক্যান্টিন’ নামে চালানো শুরু করা হয় বলে অভিযোগ রয়েছে।

• পতিতালয় ও অবৈধ স্পা থেকে মাসোয়ারা :

কক্সবাজারের কটেজ জোনে অবৈধ স্পা ও পতিতালয় থেকে নিয়মিত মাসোহারা নেওয়ার অভিযোগও রয়েছে তার বিরুদ্ধে।

স্থানীয় সূত্র জানায়—

  • প্রতিটি কটেজ বা পতিতালয় থেকে মাসে ২০ থেকে ৫০ হাজার টাকা
  • এসব জায়গা থেকে মোট প্রায় ১৫ লাখ টাকা মাসিক চাঁদা তোলা হয়

এই টাকা তোলার জন্য কয়েকজন দালাল ও স্থানীয় নামধারী সাংবাদিককে ব্যবহার করা হয় বলে অভিযোগ রয়েছে।

প্রতিদিন সন্ধ্যায় এসব দালালদের নিয়ে কক্সবাজারের সায়মন হেরিটেজ নামের একটি বিলাসবহুল রেস্টুরেন্টে আড্ডা দেন আপেল মাহমুদ। সেখানে মাদকসেবনের আসরও বসে বলে অভিযোগ রয়েছে। সংশ্লিষ্টরা দাবি করেন, সিসিটিভি ফুটেজ পরীক্ষা করলে এসব ঘটনার প্রমাণ মিলবে।

• নারী উদ্যোক্তাদের সঙ্গে অনৈতিক সম্পর্কের অভিযোগ :

কক্সবাজারে পরিচিত অন্তত ১৫ তরুণী উদ্যোক্তার সঙ্গে আপেল মাহমুদের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক নিয়ে নানা অভিযোগ রয়েছে।

স্থানীয় সূত্র জানায়, তাদের অনেককে নিয়মিত তার ব্যক্তিগত ডেরায় যাতায়াত করতে দেখা যায়।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে ৫ জন ভুক্তভোগী নারী অভিযোগ করেছেন—

  • কাউকে ফ্ল্যাট কিনে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি
  • কাউকে বিয়ের আশ্বাস
  • পরে প্রতারণা ও শারীরিক সম্পর্কের চাপ

তাদের মধ্যে দুজন সুযোগ পেলে আপেল মাহমুদের বিরুদ্ধে মামলা করবেন বলেও জানিয়েছেন।

•ধর্ষণের অভিযোগ :

২০২৫ সালের ২৮ অক্টোবর ৯৯৯ নম্বরে ফোন পেয়ে উখিয়া থানা পুলিশ অভিযান চালিয়ে লায়লা পরী নামের এক নারীকে উদ্ধার করে।

উদ্ধারের পর ভিডিও বার্তায় ওই নারী অভিযোগ করেন—

তার স্বামী তাকে আপত্তিকর ভিডিও ধারণ করে প্রভাবশালী ব্যক্তিদের কাছে পাঠাতেন। সেই তালিকায় কক্সবাজার ট্যুরিস্ট পুলিশের এসপি আপেল মাহমুদের নামও উল্লেখ করেন তিনি।

তার দাবি, জুসের সঙ্গে কিছু মিশিয়ে কলাতলীর একটি হোটেলে নিয়ে তাকে ধর্ষণ করেন আপেল মাহমুদ।

পরে সাংবাদিকরা বিষয়টি জানতে চাইলে আপেল মাহমুদ নাকি আতঙ্কিত হয়ে তার ক্যারিয়ার নষ্ট না করার অনুরোধ করেন।

•মাদক জব্দ করে আত্মসাতের অভিযোগ :

২০২৫ সালের ৭ নভেম্বর কক্সবাজারের একটি আবাসিক হোটেলে ইয়াবা থাকার খবর পেয়ে অভিযান চালায় ট্যুরিস্ট পুলিশ।

অভিযোগ রয়েছে—

  • ঘটনাস্থলে প্রায় ২০ হাজার ইয়াবা পাওয়া যায়
  • মামলায় দেখানো হয় মাত্র ২০০ পিস ইয়াবা

পরে হোটেল কর্তৃপক্ষের সঙ্গে ১০ লাখ টাকায় আপস করা হয় বলে অভিযোগ।

• দাগি অপরাধীদের দিয়ে ‘সাংবাদিক বাহিনী’ :

নিজের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ সামাল দিতে আপেল মাহমুদ নাকি রোহিঙ্গাসহ বিভিন্ন এলাকা থেকে অপরাধীদের জড়ো করে একটি তথাকথিত ‘সাংবাদিক বাহিনী’ গড়ে তুলেছেন।

এদের সংখ্যা প্রায় ৩০ জন বলে জানা গেছে। তাদের অনেকের বিরুদ্ধে মাদকসহ বিভিন্ন অপরাধে একাধিক মামলা রয়েছে।

সম্প্রতি ‘সাংবাদিক উন্নয়ন পরিষদ’ নামের একটি সংগঠনের প্যাডে আপেল মাহমুদের পক্ষে একটি বিবৃতিও দেওয়া হয়েছে।

•অভিযোগের মুখে আপেলের প্রতিক্রিয়া :

এসব বিষয়ে জানতে চাইলে আপেল মাহমুদ প্রতিবেদককে “বড় ভাই” সম্বোধন করে বলেন—

“আপনি আমার বড় ভাই। আমি আপনার কাছে সারেন্ডার করছি। ফেসবুক থেকে সবকিছু ডিলিট করে দিচ্ছি। ভয়েই এসব করেছি।”

তিনি আরও বলেন—

“আপনি যেমন নির্দেশ দেবেন, তেমন করেই চলব। ঊর্ধ্বতনদের বলেছি সাংবাদিকের সঙ্গে ভুল বোঝাবুঝির কারণে এসব হচ্ছে।”

• প্রশ্নের মুখে পর্যটন নিরাপত্তা :

পর্যটকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দায়িত্বে থাকা একজন পুলিশ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে এত গুরুতর অভিযোগ ওঠায় কক্সবাজারের পর্যটন নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়েও প্রশ্ন উঠছে।

স্থানীয় সচেতন মহল মনে করছে, অভিযোগগুলো নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে সত্যতা যাচাই করা জরুরি। অন্যথায় দেশের অন্যতম পর্যটন নগরীর ভাবমূর্তি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

Nessun commento trovato


News Card Generator