খুলনা জেলার ফুলতলা ও ডুমুরিয়া উপজেলার দীর্ঘস্থায়ী জলাবদ্ধতা নিরসনের লক্ষ্যে সরকারি উদ্যোগে শুরু হওয়া খাল খনন প্রকল্পে ব্যাপক অনিয়ম ও অব্যবস্থাপনার চিত্র ফুটে উঠেছে। ত্রাণ ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদপ্তরের অর্থায়নে বিলডাকাতিয়ার নিমতলা থেকে সাড়াভিটা ৮০ ফুট খাল এবং ডোলডাঙ্গা কাঠবুনিয়া খাল খননের জন্য প্রায় আড়াই কোটি টাকার প্রকল্প গ্রহণ করা হলেও কাজের মান নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। সরেজমিনে দেখা গেছে, ৫ থেকে ১০ ফুট গভীর পানি থাকা অবস্থায় ভাসমান ভেক্যু দিয়ে মাটি তুলে খালের পাড়েই রাখা হচ্ছে, যা বৃষ্টির পানিতে পুনরায় খালে ধসে পড়ার আশঙ্কা তৈরি করেছে। এই প্রক্রিয়ায় শ্রমিকদের অংশগ্রহণের কথা থাকলেও প্রকল্পগুলোতে যান্ত্রিক নির্ভরতা বেশি লক্ষ্য করা গেছে, যা সরকারি প্রকল্পের মূল উদ্দেশ্যের সাথে সাংঘর্ষিক। গত সপ্তাহে ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম সচিব মিনাক্ষী ব্রম্ম প্রকল্প এলাকা পরিদর্শনকালে কাজের এই বেহাল দশা দেখে তীব্র অসন্তোষ প্রকাশ করেন এবং নকশা অনুযায়ী পানি নিষ্কাশন করে সঠিকভাবে খনন কাজ পরিচালনার কঠোর নির্দেশনা প্রদান করেন।
মার্কেটপ্লেস পণ্যসমূহ (Marketplace)
স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, খালগুলোতে পর্যাপ্ত পানি থাকা অবস্থায় খনন কাজ চালানো এক প্রকার অর্থের অপচয় ছাড়া আর কিছুই নয়। তাদের দাবি, পানি অপসারণ না করে খনন করার ফলে মাটি পুনরায় খালে মিশে যাচ্ছে, যা জলাবদ্ধতা নিরসনে কোনো কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারছে না। স্থানীয়দের মতে, পানি নিষ্কাশনের পথ আগে পরিষ্কার না করলে এই বিশাল ব্যয়ের প্রকল্প কোনো সুফল বয়ে আনবে না। প্রকল্পের সভাপতি ও সংশ্লিষ্ট ইউনিয়ন চেয়ারম্যানের দাবি কাজ সঠিকভাবে হচ্ছে এবং অর্ধেকের বেশি সম্পন্ন হয়েছে, কিন্তু মাঠ পর্যায়ের বাস্তব চিত্র বলছে ভিন্ন কথা। শ্রমিকদের জন্য বিপুল পরিমাণ অর্থ বরাদ্দ থাকলেও কাজের ধরনে তাদের সক্রিয় অংশগ্রহণ না থাকায় স্থানীয়দের মধ্যে ক্ষোভ দানা বাঁধছে। প্রকল্পের নকশা ও বাস্তব কাজের মধ্যে এই বিস্তর ফারাক জনমনে প্রকল্পের স্বচ্ছতা নিয়ে বড় ধরনের সন্দেহের সৃষ্টি করেছে।
সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দাবি অনুযায়ী, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নির্দেশনা বাস্তবায়নে এই কর্মসূচি হাতে নেওয়া হয়েছে এবং বর্তমানে ভেক্যু ও শ্রমিকদের সমন্বয়ে কাজ চলছে। ডুমুরিয়া উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন অফিসের উপ-সহকারী প্রকৌশলী মোঃ রবিউল ইসলাম জানিয়েছেন, অর্থ বরাদ্দের একটি অংশ ইতিমধ্যে ছাড় করা হয়েছে এবং বাকি অর্থ ছাড়ের প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে। তবে প্রকল্পের সভাপতিরা বরাদ্দের টাকা না পাওয়ার কথা জানালেও প্রশাসনের পক্ষ থেকে কাজের তদারকি নিয়ে অস্পষ্টতা রয়ে গেছে। জেলা ত্রাণ ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কর্মকর্তা মোঃ আব্দুল করিমের দাবি, নিয়ম মেনেই কাজ চলছে এবং শ্রমিক দিয়ে মাটি ড্রেসিং করা হচ্ছে, যদিও মাঠ পর্যায়ের পর্যবেক্ষণে এই দাবির স্বপক্ষে তেমন কোনো শক্তিশালী প্রমাণ পাওয়া যাচ্ছে না। প্রশাসনের শীর্ষ পর্যায়ের পরিদর্শনের পরেও কাজের মান নিয়ে অস্বচ্ছতা বজায় থাকায় প্রকল্প বাস্তবায়নকারীদের দায়বদ্ধতা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে।
পরিকল্পনা মাফিক খনন কাজ সম্পন্ন না হলে খুলনার এই দুই উপজেলার জলাবদ্ধতা নিরসনের স্বপ্ন অধরাই থেকে যাবে বলে মনে করছেন স্থানীয় সচেতন মহল। সরকারি অর্থের সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত না করা হলে এবং তদারকির অভাব থাকলে এই প্রকল্প শেষ পর্যন্ত কেবল কাগজে-কলমেই সীমাবদ্ধ থাকবে। ভবিষ্যতে পরিবহন ও জনজীবনে চরম ভোগান্তি এড়াতে হলে অবিলম্বে নকশা অনুযায়ী খনন কাজ সম্পন্ন করা এবং অনিয়মের সাথে জড়িতদের বিরুদ্ধে প্রশাসনিক ব্যবস্থা গ্রহণ করা জরুরি হয়ে পড়েছে। অন্যথায় জনকল্যাণমূলক এই উদ্যোগটি কেবল সরকারি অর্থ অপচয়ের একটি নজির হিসেবেই ইতিহাসের পাতায় রয়ে যাবে।
সংবাদটির ওপর ভিত্তি করে তাৎক্ষণিক একটি ব্যঙ্গাত্মক রাজনৈতিক কার্টুন তৈরি করুন।