জুলাই সনদ বাস্তবায়নে রাষ্ট্রপতির আদেশের আইনি ব্যাখ্যা দিলেন ব্যারিস্টার মোমেন..

আব্দুল্লাহ আল মামুন avatar   
আব্দুল্লাহ আল মামুন
তিনি বলেন, ইউটিউব বা ফেসবুকে এখনো তাঁর পিতার যুক্তিনির্ভর বক্তব্যের ভিডিও দেখা যায়, যা তৎকালীন সংসদ নেতা বেগম খালেদা জিয়াও প্রশংসা করতেন।..

জাতীয় সংসদের অধিবেশনে জুলাই বিপ্লবের চেতনা ও 'জুলাই সনদ' (July Charter) বাস্তবায়নের আইনি বাধ্যবাধকতা নিয়ে এক তাৎপর্যপূর্ণ বক্তব্য রেখেছেন পাবনা-১ আসনের সংসদ সদস্য ব্যারিস্টার নাজিবুর রহমান মোমেন। তিনি তাঁর বক্তব্যে জুলাই সনদের আইনি বৈধতা চ্যালেঞ্জকারীদের কড়া সমালোচনা করে সংবিধানের বিভিন্ন অনুচ্ছেদ ও ঐতিহাসিক নজির তুলে ধরেন।

বক্তব্যের শুরুতেই ব্যারিস্টার মোমেন ১৯৯১ সালের একটি স্মৃতিচারণ করেন। তিনি জানান, মাত্র ১১-১২ বছর বয়সে এই সংসদের গ্যালারিতে বসে তিনি তাঁর পিতা মাওলানা মতিউর রহমান নিজামী এবং তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার বক্তব্য শুনতেন। আজ দ্বিতীয় প্রজন্মের সংসদ সদস্য হিসেবে সেই একই আঙিনায় দাঁড়িয়ে তিনি আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন। তিনি বলেন, ইউটিউব বা ফেসবুকে এখনো তাঁর পিতার যুক্তিনির্ভর বক্তব্যের ভিডিও দেখা যায়, যা তৎকালীন সংসদ নেতা বেগম খালেদা জিয়াও প্রশংসা করতেন।

বিগত শাসনামলকে 'ফ্যাসিবাদ' হিসেবে অভিহিত করে ব্যারিস্টার মোমেন বলেন, এদেশের বিরোধী দলীয় নেতাদের ওপর শতাব্দীর জঘন্যতম মিথ্যাচারের মাধ্যমে বিচারিক হত্যাকাণ্ড চালানো হয়েছে। তিনি বেগম খালেদা জিয়াকে এক কাপড়ে বাসা থেকে বের করে দেওয়া এবং তাঁর নিজের পরিবারসহ অনেক নির্যাতিত পরিবারের যন্ত্রণার কথা স্মরণ করেন। তিনি বিশ্বাস করেন, এই দীর্ঘ অবিচার ও অনিয়মকে নিয়ম হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করার বিরুদ্ধেই ছাত্র-জনতা ২৪-এর জুলাই বিপ্লবে বুকের তাজা রক্ত ঢেলে দিয়েছে।

জুলাই সনদ বাস্তবায়নে রাষ্ট্রপতির আদেশ নিয়ে তৈরি হওয়া ধোঁয়াশা নিরসনে ব্যারিস্টার মোমেন জোরালো আইনি যুক্তি পেশ করেন। সরকারের কেউ কেউ এই আদেশকে 'আইন বা অধ্যাদেশ নয়' বলে যে দাবি তুলেছেন, তা নাকচ করে তিনি সংবিধানের ১৫২ নম্বর অনুচ্ছেদ পাঠ করেন।

তিনি স্পষ্টভাবে বলেন:

"সংবিধান অনুযায়ী 'আইন' অর্থ হলো কোনো আইন, অধ্যাদেশ, আদেশ, উপ-আইন বা প্রথা যা আইনের ক্ষমতা রাখে। সুতরাং রাষ্ট্রপতি যে আদেশ দেন, তা এই সংবিধান অনুযায়ী আইন হিসেবেই গণ্য।"

তিনি আরও উদাহরণ দেন যে, বাংলাদেশের নির্বাচনের মূল ভিত্তি আরপিও (Representation of the People Order, 1972) মূলত একটি রাষ্ট্রপতির আদেশ। ১৯৭২ সালে এমন ১৫৫টিরও বেশি রাষ্ট্রপতির আদেশ জারি হয়েছিল যা আজও আইন হিসেবে বলবৎ। সুতরাং জুলাই সনদের আদেশকে আইন হিসেবে অস্বীকার করা সংবিধান লঙ্ঘনের শামিল।

ব্যারিস্টার মোমেন উল্লেখ করেন যে, জুলাই সনদের সংস্কারের বিষয়ে দেশের প্রায় ৭০ শতাংশ জনগণ 'হ্যাঁ' ভোট দিয়েছে। তাই এই গণরায় ও জুলাই সনদ বাস্তবায়ন করা সংসদের পবিত্র দায়িত্ব। তিনি বলেন, "আমরা যদি সংস্কারকে সম্মান করি, তবে 'সময় নেই' বলে তা এড়িয়ে যাওয়ার কোনো সুযোগ নেই।" নির্ধারিত ৩০ দিনের মধ্যে সংস্কার পরিষদ গঠনের আইনি বাধ্যবাধকতার কথাও তিনি মনে করিয়ে দেন।

বক্তব্যের শেষ দিকে তিনি সুপ্রিম কোর্টের অষ্টম সংশোধনীর (আনোয়ার হোসেন বনাম রাষ্ট্র) ঐতিহাসিক রায়ের কথা উল্লেখ করেন। তিনি সতর্ক করে বলেন, সংসদ চাইলেই সংবিধানের মৌলিক কাঠামো পরিবর্তন করতে পারে না। জুলাই সনদে বিচার বিভাগের বিকেন্দ্রীকরণ ও রাষ্ট্রের মূলনীতি রক্ষার যে অঙ্গীকার করা হয়েছে, তা বাস্তবায়নেই দেশের প্রকৃত কল্যাণ নিহিত।

Комментариев нет


News Card Generator