যুদ্ধের ছায়ায় ঢাকার প্রথম ইংরেজি সিনেমা হল: ব্রিটানিয়া টকিজ..

Akib Hasan Shad avatar   
Akib Hasan Shad
****

 

চল্লিশের দশকের ঢাকা—একদিকে শান্ত, প্রাদেশিক শহরের আবহ; অন্যদিকে পৃথিবীজুড়ে তীব্র উত্তাল দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের অভিঘাত। ব্রিটিশ ভারতের কৌশলগত অবস্থানের কারণে ঢাকা তখন হয়ে ওঠে সামরিক তৎপরতার এক গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র। বিশেষ করে বার্মা ও নাগাল্যান্ড ফ্রন্টে যুদ্ধ পরিচালনার প্রয়োজনে তেজগাঁওয়ে গড়ে তোলা হয় একটি নতুন বিমান ঘাঁটি, যা পরবর্তীকালে পরিচিত হয় তেজগাঁও বিমানবন্দর হিসেবে।

যুদ্ধকালীন ঢাকা ও বিদেশি সৈন্যদের আগমন :

এই সময় ঢাকার পল্টন ব্যারাকে সমবেত হয় নানা দেশের সৈন্য—মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ‘জিআই’ সেনা থেকে শুরু করে ব্রিটিশ ‘টমি’ সেনা পর্যন্ত। যুদ্ধের চাপ, অচেনা শহর ও দীর্ঘ কর্মঘণ্টার মাঝে বিনোদনের সুযোগ ছিল অত্যন্ত সীমিত। সৈন্যদের এই বাস্তব প্রয়োজন থেকেই ঢাকায় জন্ম নেয় এক ব্যতিক্রমী সাংস্কৃতিক স্থাপনা।

জন্ম নেয় ‘ব্রিটানিয়া টকিজ’

বিদেশি সেনাদের বিনোদনের কথা মাথায় রেখে এক ইংরেজ ভদ্রলোক পল্টন এলাকায় গড়ে তোলেন একটি নতুন সিনেমা হল—‘ব্রিটানিয়া টকিজ’। স্থাপত্যের দিক থেকে হলটি মোটেও আকর্ষণীয় ছিল না; দেখতে অনেকটা গুদামের মতো, ভেতরে বসার ব্যবস্থাও ছিল সাদামাটা—সস্তায় বানানো সোফা ও চেয়ার। কিন্তু আড়ম্বর নয়, এর মূল শক্তি ছিল ভিন্নধর্মী কনটেন্ট।

হলের নামফলকে স্পষ্ট করে লেখা থাকত—

“The Home of English Movies”

এটাই ছিল ঢাকায় নিয়মিত ইংরেজি সবাক (talking) সিনেমা প্রদর্শনের প্রথম দিককার হল—যে কারণে নামের সঙ্গে যুক্ত হয় ‘টকিজ’।

সমকালীন ঢাকার অন্যান্য সিনেমা হল :

ভ্রমণবিষয়ক গ্রন্থ স্যামসন র‍্যুবেন-এর “A Guide for Travellers in India” থেকে জানা যায়, সে সময় ঢাকায় আরও কয়েকটি সিনেমা হল সক্রিয় ছিল—

  1. লায়ন সিনেমা — আশেক জমাদার লেন
  2. মুকুল থিয়েটার — জনসন রোড
  3. রূপমহল — ১৩৬, সদরঘাট
  4. নিউ পিকচার হাউস — আরমানিটোলা
  5. তাজমহল টকিজ — আলী নকির দেউড়ী

এই সব হলে নির্বাক ও সবাক ছবির পাশাপাশি নাটক ও নাচগানের আয়োজন থাকলেও ব্রিটানিয়া টকিজে শুরু থেকেই প্রধানত ইংরেজি সবাক ছবিই প্রদর্শিত হতো, যা একে আলাদা পরিচিতি দেয়।

দর্শক, শো ও হলের দৈনন্দিনতা :

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শেষ হলে ধীরে ধীরে বিদেশি সৈন্যরা ঢাকা ছাড়তে শুরু করে। তখন ব্রিটানিয়া টকিজের নিয়মিত দর্শক হয়ে ওঠেন ঢাকায় বসবাসরত ইংরেজ, অ্যাংলো-ইন্ডিয়ান ও উচ্চশিক্ষিত স্থানীয় জনগোষ্ঠী।

  • প্রতিদিন মাত্র দুটি শো হতো
    • সন্ধ্যা ৬টা
    • রাত ৯টা
  • দর্শক কম হলে অনেক সময় শো স্থগিত রাখা হতো
  • তবে স্থগিত শোর টিকিট বাতিল হতো না—সেই টিকিট দিয়েই পরবর্তী কোনো শো দেখা যেত

এই মানবিক ও ব্যবহারিক ব্যবস্থাপনাও হলটির একটি উল্লেখযোগ্য দিক।

প্রদর্শিত উল্লেখযোগ্য চলচ্চিত্র :

ব্রিটানিয়া টকিজে প্রদর্শিত কয়েকটি স্মরণীয় ইংরেজি চলচ্চিত্র হলো—

  • Bathing Beauty (১৯৪৪)
  • A Double Life (১৯৪৭)
  • Hamlet (১৯৪৮)
  • Hotel Sahara (১৯৫১)

এই ছবিগুলো তৎকালীন ঢাকার দর্শকদের সামনে পশ্চিমা সিনেমার ভিন্ন এক জানালা খুলে দিয়েছিল।

অবসান ও উত্তরাধিকার :

পঞ্চাশের দশকে এসে ধীরে ধীরে ব্রিটানিয়া টকিজ বন্ধ হয়ে যায়। সময়ের প্রয়োজনে ও নগরায়ণের চাপে হারিয়ে যায় হলটির অস্তিত্ব।
এর স্থানে গড়ে ওঠে—

  • বর্তমান জীবন বীমা কর্পোরেশনের ভবন, এবং
  • রমনা ভবন

আজ আর কোথাও নামফলকে লেখা নেই “The Home of English Movies”—কিন্তু ঢাকার সাংস্কৃতিক ইতিহাসে ব্রিটানিয়া টকিজ এক নীরব সাক্ষী হয়ে রয়ে গেছে। যুদ্ধের অস্থির সময়ে বিনোদনের আশ্রয়, ইংরেজি সিনেমার প্রথম ঠিকানা এবং নগর সংস্কৃতির এক অনন্য অধ্যায় হিসেবে এর স্মৃতি আজও ইতিহাসপ্রেমীদের মনে উজ্জ্বল।

ব্রিটানিয়া টকিজ ছিল কেবল একটি সিনেমা হল নয়—
এটি ছিল যুদ্ধকালীন ঢাকার এক টুকরো বিশ্ব।

Ingen kommentarer fundet


News Card Generator