হরমোজ প্রণালী: কেবল সামরিক ‘চোক পয়েন্ট’ নয়, এক অতিপ্রাকৃত সভ্যতার বেঁচে থাকার লড়াই..

আব্দুল্লাহ আল মামুন avatar   
আব্দুল্লাহ আল মামুন
বিস্ময়কর বিষয় হলো, এই মাটি কেবল দেখার জন্য নয়, এটি তাদের খাদ্যেরও অংশ। ‘সুরাক’ নামক এক বিশেষ মশলা তৈরিতে এই মাটি ব্যবহার করা হয়, যা এই অঞ্চলের মানুষের ঐতিহ্যের অবিচ্ছেদ্য অংশ।..

বর্তমান বিশ্বে হরমোজ প্রণালী (Strait of Hormuz) বলতেই আমাদের চোখে ভেসে ওঠে যুদ্ধজাহাজ, তেলের ট্যাংকার আর বারুদের গন্ধ। কিন্তু সংবাদপত্রের শিরোনামের বাইরে এই সংকীর্ণ জলপথের প্রতিটি বাঁকে লুকিয়ে আছে কোটি বছরের ইতিহাস এবং এক অদম্য মানব সভ্যতার টিকে থাকার গল্প। যখন ওয়াশিংটন আর তেহরানের মধ্যে কূটনীতির লড়াই তুঙ্গে, তখন এই ‘অবাস্তব হরমোজ’ (Unreal Hormuz) বিশ্ববাসীকে দেখাচ্ছে কীভাবে চরম প্রতিকূলতার মধ্যেও প্রকৃতি আর মানুষ সহাবস্থান করতে পারে।

১. ‘পৃথিবীর বুকে মঙ্গল গ্রহ’: লোহিত মাটির রহস্য

হরমোজ দ্বীপের মাটির রঙ টকটকে লাল, যা দেখলে মনে হয় আপনি পৃথিবীর বুকে নয়, বরং মঙ্গল গ্রহের কোনো উপত্যকায় দাঁড়িয়ে আছেন। স্থানীয়রা এই আয়রন-সমৃদ্ধ লাল মাটিকে বলে ‘গালক’। বিস্ময়কর বিষয় হলো, এই মাটি কেবল দেখার জন্য নয়, এটি তাদের খাদ্যেরও অংশ। ‘সুরাক’ নামক এক বিশেষ মশলা তৈরিতে এই মাটি ব্যবহার করা হয়, যা এই অঞ্চলের মানুষের ঐতিহ্যের অবিচ্ছেদ্য অংশ। লবণের পাহাড় আর রংধনু রঙের গিরিখাতগুলো এখানে ৫৭০ মিলিয়ন বছরের ভূ-তাত্ত্বিক পরিবর্তনের সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে।

২. প্রাচীন প্রযুক্তি: বিদ্যুৎ ছাড়াই ঘর শীতল রাখার ‘বাদগির’

প্রচণ্ড দাবদাহে যখন হরমোজ ও কেশম দ্বীপের তাপমাত্রা ১১৫ ডিগ্রি ফারেনহাইট ছাড়িয়ে যায়, তখন আধুনিক এসির পরিবর্তে কাজ করে হাজার বছরের প্রাচীন প্রযুক্তি ‘বাদগির’ বা উইন্ড টাওয়ার। কেশম দ্বীপের ‘লাফ্ট’ (Loft) গ্রামের বাড়িগুলোর উপরে অবস্থিত এই টাওয়ারগুলো কোনো বিদ্যুৎ ছাড়াই বাইরের উত্তপ্ত বাতাসকে ভেতরে প্রবেশের সময় ১৫-২০ ডিগ্রি পর্যন্ত কমিয়ে দেয়। এটি কেবল স্থাপত্য নয়, বরং চরম গরমে বেঁচে থাকার এক নিখুঁত কারিগরি দক্ষতা।

৩. কুমজারি ভাষা: সাম্রাজ্য পতনের ‘জীবাশ্ম’

হরমোজ প্রণালীর ওমান প্রান্তে অবস্থিত ‘কুমজার’ নামক বিচ্ছিন্ন গ্রামে বসবাসকারী মানুষের ভাষা বিশ্বের অন্যতম রহস্যময় বিষয়। ‘কুমজারি’ নামক এই ভাষাটি মূলত ফারসি, আরবি, পর্তুগিজ এবং হিন্দির এক অদ্ভুত সংমিশ্রণ। এই প্রণালী দিয়ে শত শত বছর ধরে যত নাবিক ও দখলদার পার হয়েছে, তারা প্রত্যেকেই এই ভাষায় তাদের ছাপ রেখে গেছে। এটি কোনো লিখিত ভাষা নয়, বরং জলপথের বাণিজ্যিক ইতিহাসের এক জীবন্ত দলিল।

৪. প্রকৃতির দম্ভ: উত্তাপজয়ী কোরাল ও ম্যানগ্রোভ বন

পারস্য উপসাগরের পানির তাপমাত্রা যখন ৯৬ ডিগ্রি ফারেনহাইটে পৌঁছায়, তখন পৃথিবীর অন্যান্য প্রান্তের কোরাল বা প্রবাল ধ্বংস হয়ে গেলেও হরমোজের কোরালগুলো দিব্যি বেঁচে থাকে। হাজার বছরের বিবর্তনে তারা এই চরম উত্তাপ সহ্য করার ক্ষমতা অর্জন করেছে, যা বর্তমানে জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় বিজ্ঞানীদের কাছে এক বিশেষ গবেষণার বিষয়। পাশাপাশি এখানকার ‘হারা’ (Hara) ম্যানগ্রোভ বনগুলো লোনা পানি থেকে লবণ ছেঁকে নিয়ে নিজেদের বাঁচিয়ে রাখার এক অনন্য জৈবিক প্রক্রিয়া গড়ে তুলেছে।

৫. লেনজেহ নৌকা: স্মৃতি থেকে জন্ম নেওয়া জাহাজ

হরমোজের উপকূলে আজও ইউনেস্কো স্বীকৃত ‘লেনজেহ’ (Lenjeh) নামক কাঠের জাহাজ তৈরি করা হয়। আশ্চর্যজনকভাবে, এই বিশালাকায় জাহাজগুলো তৈরির জন্য কোনো লিখিত নকশা বা ডায়াগ্রাম ব্যবহার করা হয় না। বংশপরম্পরায় কারিগররা কেবল তাদের হাতের স্পর্শ আর চোখের আন্দাজে এই কাঠের জাহাজগুলো তৈরি করেন, যা ভারত মহাসাগরের উত্তাল ঢেউ অনায়াসেই পাড়ি দিতে পারে।

হরমোজ প্রণালী কেবল ২০ শতাংশ বিশ্ব জ্বালানির ধমনী নয়; এটি এমন এক জায়গা যেখানে প্রকৃতি চরম বৈরী, কিন্তু জীবন সেখানে সৃজনশীল। আজকের যুদ্ধকবলিত পৃথিবীতে যখন তেলের দাম আর সামরিক আধিপত্য নিয়ে আলোচনা হচ্ছে, তখন হরমোজের এই প্রাচীন সংস্কৃতি ও প্রকৃতির সহনশীলতা আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে—স্থায়িত্ব কোনো প্রতিশ্রুতি নয়, বরং এটি নিরন্তর অভিযোজনের এক মহাকাব্য।

没有找到评论


News Card Generator