close

ভিডিও আপলোড করুন পয়েন্ট জিতুন!

গানম্যান ও অস্ত্রের লাইসেন্স দেওয়ার ক্ষেত্রেও বৈষম্য তৈরি হয়..

ইউসুফ আলী avatar   
ইউসুফ আলী
****

নির্বাচন মানেই প্রতিযোগিতা, মতের লড়াই, ভিন্নমতের প্রকাশ। কিন্তু নির্বাচন যদি ভয়ের ছায়ায় অনুষ্ঠিত হয়, তবে সেটি আর গণতন্ত্র থাকে না, হয়ে ওঠে টিকে থাকার সংগ্রাম। সাম্প্রতিক সিদ্ধান্ত অনুযায়ী নির্বাচনী প্রার্থীদের নিরাপত্তায় গানম্যান দেওয়া এবং অস্ত্রের লাইসেন্স প্রদানের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। সিদ্ধান্তটি আপাতদৃষ্টিতে ইতিবাচক মনে হলেও এর পেছনে যে প্রশ্নগুলো জমে আছে, সেগুলো এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই।

এই সিদ্ধান্ত কি হঠাৎ করেই নেওয়া হলো? নাকি হাদির মৃত্যুই রাষ্ট্রকে নতুন করে ভাবতে বাধ্য করেছে? যদি তাই হয়, তাহলে প্রশ্ন উঠবেই একটি প্রাণ যাওয়ার পরই কেন রাষ্ট্রের উপলব্ধি হয়? আগেই কি এই ঝুঁকিগুলো দৃশ্যমান ছিল না? হাদির মৃত্যু কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। নির্বাচনী রাজনীতিতে সহিংসতা, হুমকি, আক্রমণ এগুলো আমাদের রাজনৈতিক বাস্তবতায় নতুন কিছু নয়। স্থানীয় সরকার থেকে শুরু করে জাতীয় পর্যায় পর্যন্ত বিভিন্ন নির্বাচনে প্রার্থীদের ওপর হামলার ঘটনা ঘটেছে বারবার। তবু নিরাপত্তা ব্যবস্থায় কাঠামোগত কোনো পরিবর্তন খুব একটা চোখে পড়েনি। বরং প্রতিবারই আমরা দেখেছি ঘটনার পর তদন্ত, বিবৃতি আর আশ্বাস।

রাষ্ট্রের দায়িত্ব শুধু ঘটনার পর প্রতিক্রিয়া দেখানো নয়, বরং আগাম ঝুঁকি চিহ্নিত করে ব্যবস্থা নেওয়া। নির্বাচনের সময় মাঠপর্যায়ে কারা বেশি ঝুঁকিতে থাকেন, কোথায় সংঘাতের সম্ভাবনা বেশি এসব তথ্য প্রশাসনের অজানা থাকার কথা নয়। তাহলে কেন আগে থেকে কার্যকর নিরাপত্তা পরিকল্পনা নেওয়া হলো না? এই প্রশ্নের উত্তর খোঁজা জরুরি।

প্রার্থীদের জন্য গানম্যান দেওয়া একদিকে যেমন নিরাপত্তার অনুভূতি জাগাতে পারে, অন্যদিকে এটি একটি অস্বস্তিকর বাস্তবতার কথাও জানান দেয়। গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় একজন নাগরিক যখন নির্বাচনে অংশ নিতে চান, তখন তাঁর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের দায়। সেই দায় যদি ব্যক্তিগত অস্ত্র ও ব্যক্তিগত নিরাপত্তার ওপর ছেড়ে দেওয়া হয়, তাহলে রাষ্ট্রের ভূমিকা কোথায় দাঁড়ায়?

আরও একটি প্রশ্ন এখানে গুরুত্বপূর্ণ এই নিরাপত্তা কি সবার জন্য সমান হবে? আমাদের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে ক্ষমতা ও প্রভাব অনেক সময় রাষ্ট্রের সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে প্রভাব ফেলে। যদি গানম্যান ও অস্ত্রের লাইসেন্স দেওয়ার ক্ষেত্রেও বৈষম্য তৈরি হয়, তাহলে নির্বাচনী মাঠ আরও অসম হয়ে পড়বে। গণতন্ত্রের জন্য এটি ভালো কোনো বার্তা নয়।

আমরা বারবার দেখেছি, নির্বাচনকেন্দ্রিক সহিংসতা শুধু ব্যক্তিগত ক্ষতির মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে না; এটি সমাজে ভয়ের সংস্কৃতি তৈরি করে। যখন একজন প্রার্থী হামলার শিকার হন বা প্রাণ হারান, তখন শুধু তাঁর পরিবারই ক্ষতিগ্রস্ত হয় না,ভীত হয়ে পড়েন অন্য প্রার্থীরাও। অনেকেই তখন আর মাঠে নামতে চান না। এর ফলে প্রকৃত প্রতিযোগিতা বাধাগ্রস্ত হয়।

হাদির মৃত্যুর পর নেওয়া এই সিদ্ধান্ত আমাদের রাষ্ট্রব্যবস্থার একটি পরিচিত প্রবণতাকে আবার সামনে এনেছে দেরিতে জেগে ওঠা। সড়ক দুর্ঘটনায় একের পর এক প্রাণ যাওয়ার পর আমরা সড়ক নিরাপত্তা নিয়ে কথা বলি। ভবন ধসে মৃত্যুর পর আমরা নকশা ও অনুমোদনের কথা মনে করি। ঠিক তেমনি, রাজনৈতিক সহিংসতায় একটি প্রাণ যাওয়ার পর নিরাপত্তা জোরদারের সিদ্ধান্ত আসে। প্রশ্ন হলো, এই চক্র থেকে আমরা কবে বের হব? রাষ্ট্র কি শুধু মৃত্যুর হিসাব দেখেই নীতি নির্ধারণ করবে?

সরকার কি বধির এই প্রশ্নটি অনেকের কাছে কঠোর মনে হতে পারে। কিন্তু মাঠপর্যায়ের বাস্তবতা দেখলে প্রশ্নটি অযৌক্তিক মনে হয় না। প্রার্থীরা, রাজনৈতিক কর্মীরা, নাগরিক সমাজ বহুবার নির্বাচনী সহিংসতার ঝুঁকির কথা বলেছে। কিন্তু সেই সতর্কবার্তাগুলো কি গুরুত্ব পেয়েছে?

এখানে আরেকটি দিক বিবেচনার দাবি রাখে। অস্ত্রের লাইসেন্স দেওয়া মানেই কি নিরাপত্তা নিশ্চিত করা? নাকি এটি সহিংসতার ঝুঁকিকেই আরও স্বাভাবিক করে তোলে? রাজনীতিতে অস্ত্রের উপস্থিতি কখনোই ইতিবাচক সংস্কৃতি তৈরি করে না। বরং এটি শক্তির প্রদর্শনকে উৎসাহিত করে, সংলাপ ও মতের প্রতিযোগিতাকে দুর্বল করে।

নিরাপত্তা মানে শুধু অস্ত্র নয়। নিরাপত্তা মানে কার্যকর আইনশৃঙ্খলা রক্ষা, নিরপেক্ষ প্রশাসন, দ্রুত বিচার এবং রাজনৈতিক সহিংসতার বিরুদ্ধে স্পষ্ট অবস্থান। অপরাধীর রাজনৈতিক পরিচয় যাই হোক, তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া—এই বার্তাটি যদি স্পষ্ট না হয়, তাহলে গানম্যান দিয়েও নিরাপত্তা নিশ্চিত করা যাবে না।
দেরিতে হলেও রাষ্ট্র যে বিষয়টি নিয়ে ভাবছে, সেটি অবশ্যই স্বাগত। কিন্তু এই সিদ্ধান্ত যেন হাদির মৃত্যুর মধ্যেই সীমাবদ্ধ না থাকে। 

এটি যেন একটি দীর্ঘমেয়াদি, কাঠামোগত পরিবর্তনের সূচনা হয়। না হলে আমরা আবারও কোনো এক মৃত্যুর পর একই প্রশ্ন নিয়ে বসব। গণতন্ত্রের সৌন্দর্য এর অংশগ্রহণে। সেই অংশগ্রহণ যদি ভয়ের কারণে সংকুচিত হয়ে যায়, তাহলে রাষ্ট্রকেই তার মূল্য দিতে হয়। প্রশ্ন হলো আমরা কি এবার আগাম সতর্ক হব, নাকি আবারও দেরিতে শিখব?

মোঃ ইউসুফ আলী প্রধান
শিক্ষাথী.গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ

No se encontraron comentarios


News Card Generator