ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশনের চলমান কার্যদিবসে এক অভূতপূর্ব ও নাটকীয় পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। সংসদের ভেতরে আন্দোলনের সংস্কৃতি ও সংসদীয় রীতিনীতি নিয়ে সরকারি ও বিরোধী দলের সদস্যদের মধ্যে তীব্র বাকবিতণ্ডার এক পর্যায়ে জনৈক জ্যেষ্ঠ সংসদ সদস্য উচ্চকণ্ঠে ঘোষণা করেন ‘দিস ইজ নট শাহবাগ স্কয়ার, দিস ইজ পার্লামেন্ট’। তার এই কড়া মন্তব্য মুহূর্তেই সংসদ কক্ষের পরিবেশকে উত্তপ্ত করে তোলে।
বৃহস্পতিবার (৯ এপ্রিল) বিকেলে সংসদের দশম দিনের অধিবেশনে অন্তর্বর্তী সরকারের সংস্কারমূলক বিভিন্ন অধ্যাদেশ বিল আকারে পাসের প্রক্রিয়া চলছিল। আলোচনার এক পর্যায়ে বিরোধী দলের পক্ষ থেকে আইন পাসের দ্রুত প্রক্রিয়া ও বিভিন্ন ধারা নিয়ে প্রবল আপত্তি তোলা হয়। এসময় সংসদের ভেতরে হইচই ও স্লোগান দেওয়ার মতো পরিস্থিতির সৃষ্টি হলে সরকারি দলের একজন প্রভাবশালী সদস্য দাঁড়িয়ে সংসদীয় শিষ্টাচার বজায় রাখার আহ্বান জানান। তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন যে, রাজপথের আন্দোলনের আবেগ এবং আইন সভার বিচার-বিশ্লেষণ এক বিষয় নয়।
বিতর্ক যখন তুঙ্গে, তখন ওই সদস্য তার বক্তব্যে সাফ জানিয়ে দেন যে, সংসদ কোনো আন্দোলনের ময়দান নয়। তিনি উল্লেখ করেন, শাহবাগ স্কয়ার রাজপথের প্রতিবাদের প্রতীক হতে পারে, কিন্তু পার্লামেন্ট হলো রাষ্ট্রের আইন প্রণয়নের পবিত্রতম স্থান। সংসদীয় কার্যপ্রণালী বিধি মেনে আলোচনা করার পরিবর্তে রাজপথের মতো আচরণ করলে তা সংসদের মর্যাদাহানি করে—এমন যুক্তিতেই তিনি ‘দিস ইজ নট শাহবাগ স্কয়ার’ মন্তব্যটি করেন। তার এই বক্তব্যকে কেন্দ্র করে সরকারি ও বিরোধী দলের সদস্যদের মধ্যে পাল্টাপাল্টি যুক্তি ও স্লোগান শুরু হয়।
পরিস্থিতি সামাল দিতে স্পিকার বারবার সদস্যদের শান্ত হওয়ার অনুরোধ জানান। তিনি বলেন, সংসদের ভেতরে প্রত্যেকেরই কথা বলার অধিকার রয়েছে, তবে তা হতে হবে সংসদীয় ভাষা ও নিয়ম মেনে। শাহবাগ বা অন্য কোনো চত্বরের রাজনৈতিক আবাহন সংসদের ভেতরে টেনে আনা কতটা যুক্তিযুক্ত, তা নিয়ে সংসদ সদস্যদের সতর্ক হওয়ার পরামর্শ দেন তিনি। প্রায় আধঘণ্টা ধরে চলা এই হট্টগোলের কারণে সংসদের স্বাভাবিক কার্যক্রমে সাময়িক বিঘ্ন ঘটে।
অধিবেশন শেষে লবিতে সাংবাদিকদের সাথে আলাপকালে বিরোধী দলের সদস্যরা জানান, তাদের কণ্ঠরোধ করার জন্যই এ ধরনের মন্তব্য করা হয়েছে। অন্যদিকে সরকারি দলের সদস্যদের মতে, সংসদকে আন্দোলনের চত্বর বানানোর চেষ্টা প্রতিহত করতেই এমন কড়া অবস্থান নেওয়া জরুরি ছিল। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমেও এই মন্তব্যটি নিয়ে ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনা চলছে।
সংসদের ভেতরে রাজনৈতিক স্লোগান ও সংসদীয় বিতর্কের এই সংঘাত প্রমাণ করে যে, নতুন সংসদের সদস্যদের মধ্যে সংসদীয় রীতিনীতি ও রাজপথের রাজনীতির পার্থক্য নিয়ে এখনও গভীর মতভেদ রয়েছে। তবে আইন প্রণয়নের এই সর্বোচ্চ কেন্দ্রে আলোচনা যেন কেবল স্লোগাননির্ভর না হয়, সেই দাবিই এখন সাধারণ জনগণের।



















