গাজীপুরের কালীগঞ্জে চাকরির প্রলোভন দেখিয়ে মো. ফরহাদুল ইসলাম নামের এক যুবককে অপহরণ এবং মুক্তিপণ আদায়ের উদ্দেশ্যে নৃশংস নির্যাতনের ঘটনায় চার অপহরণকারীকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। ভুক্তভোগী ফরহাদুল ইসলাম ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের একটি চায়ের দোকানে কর্মরত ছিলেন, যার সঙ্গে প্রধান আসামি মো. ইমাম হোসেনের পূর্বপরিচয় ছিল। গত ১৬ জুন ইমাম হোসেন হোয়াটসঅ্যাপের মাধ্যমে ফরহাদুলকে ভালো বেতনের চাকরির টোপ দিয়ে টঙ্গীতে আসতে বলেন এবং পরবর্তীতে কৌশলে তাকে কালীগঞ্জের দেওপাড়া এলাকায় নিয়ে আসা হয়। সেখানে সিএনজিযোগে আসা একদল অপহরণকারী ফরহাদুলকে জোরপূর্বক তুলে নিয়ে একটি নির্জন বাগানবাড়িতে জিম্মি করে। ঘটনাটি কেবল একটি অপহরণের মামলা নয়, বরং এটি পরিকল্পিত অপরাধের একটি ভয়াবহ দৃষ্টান্ত, যেখানে পরিচিতি ও বিশ্বাসের সুযোগ নিয়ে অপরাধীরা তাদের লক্ষ্যবস্তুকে ফাঁদে ফেলেছিল।
মার্কেটপ্লেস পণ্যসমূহ (Marketplace)
অপহরণের পর ভুক্তভোগী ফরহাদুল ইসলামের ওপর চালানো হয় অমানবিক শারীরিক নির্যাতন। অপহরণকারীরা তার কাছে ৫ লাখ টাকা মুক্তিপণ দাবি করে এবং টাকা দিতে অস্বীকৃতি জানালে তারা চাইনিজ কুড়াল, চাপাতি ও স্টিলের পাইপ দিয়ে তাকে আঘাত করতে থাকে। ভুক্তভোগীর শরীরে জ্বলন্ত সিগারেটের ছ্যাঁকা দেওয়া হয় এবং তার ডান পায়ের হাঁটুতে চাপাতি দিয়ে গুরুতর জখম করা হয়। ভুক্তভোগীর ভাই মো. জাহিদুল ইসলাম অপহরণকারীদের প্রাণনাশের হুমকির মুখে বাধ্য হয়ে বিকাশের মাধ্যমে ১৫ হাজার টাকা পাঠালেও অপহরণকারীরা পুরো টাকার জন্য চাপ প্রয়োগ করতে থাকে। দুই দিন ধরে বন্দী অবস্থায় ফরহাদুলকে মৃত্যুর ভয় দেখানো হয় এবং ১৮ জুন তাকে মূল অপহরণকারী চক্রের সদস্য মো. ইমরান হোসেনের বাড়িতে স্থানান্তর করা হয়। ভুক্তভোগীর জবানবন্দি অনুযায়ী, অপহরণকারীরা তাকে হত্যার হুমকি দিয়ে প্রতিনিয়ত মানসিক ও শারীরিক চাপে রাখে, যা তাদের অপরাধের ভয়াবহতাকে স্পষ্টভাবে ফুটিয়ে তোলে।
ঘটনার ধারাবাহিকতায় ১৯ জুন ভোর সাড়ে ৪টার দিকে অটোরিকশাযোগে ফরহাদুলকে অন্যত্র সরানোর সময় কালীগঞ্জ থানার উপপরিদর্শক মো. মাসুদ রানা শামীমের নেতৃত্বে পুলিশের একটি দল জামালপুর এলাকায় সন্দেহভাজন অটোরিকশাটি আটক করে। এ সময় ঘটনাস্থল থেকেই তিন অপহরণকারীকে গ্রেপ্তার করা হয় এবং গুরুতর আহত অবস্থায় ভুক্তভোগীকে উদ্ধার করে কালীগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চিকিৎসার জন্য পাঠানো হয়। পরবর্তীতে গোপন সংবাদের ভিত্তিতে ২০ জুন রাত ২টার দিকে অভিযান চালিয়ে চক্রের চতুর্থ সদস্য আসাদুজ্জামান ওরফে দুলালকে গ্রেপ্তার করা হয় এবং তার কাছ থেকে ভুক্তভোগীর দুটি মুঠোফোন উদ্ধার করা হয়। কালীগঞ্জ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মো. জাকির হোসেন জানিয়েছেন, এ ঘটনায় ভুক্তভোগীর ভাইয়ের দায়ের করা মামলায় চার আসামিকে গ্রেপ্তার করে আইনি প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা হয়েছে। অপরাধীদের গ্রেপ্তার করা হলেও এ ধরনের চক্রের সক্রিয়তা জনমনে গভীর উদ্বেগের সৃষ্টি করেছে।
এই ঘটনাটি কর্মসন্ধানী সাধারণ মানুষের জন্য একটি বড় সতর্কবার্তা এবং দেশের নিরাপত্তা ব্যবস্থার জন্য একটি চ্যালেঞ্জ। চাকরির নামে প্রতারণা ও অপহরণের এই সিন্ডিকেট কেবল একজন ব্যক্তিকে শারীরিক ও মানসিকভাবে পঙ্গু করে দেয়নি, বরং সাধারণ মানুষের মধ্যে এক ধরনের নিরাপত্তাহীনতার জন্ম দিয়েছে। বর্তমানে গ্রেপ্তারকৃত আসামিদের বিরুদ্ধে দণ্ডবিধির বিভিন্ন ধারায় মামলা দায়ের করে আদালতে সোপর্দ করা হয়েছে এবং পুলিশি তদন্ত চলমান রয়েছে। তবে কেবল গ্রেপ্তারই যথেষ্ট নয়, বরং এই ধরনের অপরাধী চক্রের মূল উৎপাটন করতে এবং ভুক্তভোগীদের ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে বিচারিক প্রক্রিয়ার দ্রুত নিষ্পত্তি এবং প্রশাসনের কঠোর নজরদারি অত্যন্ত জরুরি। ভবিষ্যতে যেন কোনো সাধারণ মানুষ এমন অমানবিক পরিস্থিতির শিকার না হয়, সেজন্য পরিবহন ও জননিরাপত্তা খাতে গোয়েন্দা তৎপরতা বৃদ্ধি করা সময়ের দাবি।
সংবাদটির ওপর ভিত্তি করে তাৎক্ষণিক একটি ব্যঙ্গাত্মক রাজনৈতিক কার্টুন তৈরি করুন।