বাংলাদেশ টেলিকমিউনিকেশন কোম্পানি লিমিটেড (বিটিসিএল)-এর কয়েক হাজার সাধারণ কর্মচারীর সরলতার সুযোগ নিয়ে বড় ধরনের এক আর্থিক কেলেঙ্কারির অভিযোগ উঠেছে। স্থায়ী পদের কর্মচারীদের 'আনুতোষিক' সুবিধা পাইয়ে দেওয়ার প্রলোভন দেখিয়ে টেলিযোগাযোগ ও অর্থ মন্ত্রণালয়ের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের নাম ভাঙিয়ে প্রায় ৮৩ লাখ টাকা হাতিয়ে নিয়েছে একটি শক্তিশালী চক্র।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, বিটিসিএল-এর স্থায়ী পদের কর্মচারীদের আনুতোষিক প্রাপ্যতার বিষয়ে দীর্ঘদিনের জটিলতা নিরসনে কর্তৃপক্ষ সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ে মতামত চেয়েছিল। এই সুযোগকে কাজে লাগিয়ে বিটিসিএল-এর প্রভাবশালী কর্মচারী নেতা ভিপি হানিফ এবং আহমেদ ফজলে রাব্বি মাঠে নামেন। তারা সাধারণ কর্মচারীদের আশ্বস্ত করেন যে, ডাক ও টেলিযোগাযোগ সচিব এবং অর্থ মন্ত্রণালয়ের সচিবকে মোটা অঙ্কের 'উৎকোচ' বা ঘুষ প্রদান করলে আনুতোষিকের সিদ্ধান্ত তাদের পক্ষে আসবে।
অনুসন্ধানে জানা যায়, বিটিসিএল-এর মোট ২,৩৮৫ জন ওয়ার্কচার্জড কর্মচারীর প্রত্যেকের কাছ থেকে ৩,৫০০ টাকা করে মোট ৮৩ লক্ষ ৪৭ হাজার ৫শ টাকা উত্তোলন করা হয়েছে। কর্মচারী ভিপি হানিফ ও উপ সহকারী প্রকৌশলী আহমেদ ফজলে রাব্বির নেতৃত্বে মাঠ পর্যায়ে এই বিশাল অংকের টাকা সংগ্রহের মূল কারিগর হিসেবে কাজ করেছেন। কথিত ক্যাশিয়ার ও ওয়ার্কচার্জড কর্মচারী মিজান, মোর্শেদ আলম মুন্সি, আঃ আজিজ, সাইফুল ইসলাম নয়ন, শফিউল্লাহ এবং গিয়াস উদ্দিন। তাদের মাধ্যমে ধাপে ধাপে এই টাকা কেন্দ্রীয় চক্রের হাতে পৌঁছায়। অথচ গত ১ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ তারিখে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের বিধি-৪ শাখার এক দাপ্তরিক আদেশে স্পষ্টভাবে জানানো হয়েছে যে, নির্দিষ্ট শর্তে ওয়ার্কচার্জড হিসেবে নিয়োগপ্রাপ্ত এসব কর্মচারী আনুতোষিক সুবিধা পাওয়ার যোগ্য নন। মন্ত্রণালয়ের এই নেতিবাচক সিদ্ধান্তের পরও কর্মচারীদের কাছ থেকে টাকা তোলা অব্যাহত ছিল বলে অভিযোগ উঠেছে।
বিটিসিএল-সূত্রে জানা যায়, আনুতোষিক প্রাপ্তির বিষয়টি সম্পূর্ণ প্রশাসনিক ও আইনি প্রক্রিয়ার বিষয়। এখানে কোনো সচিব বা কর্মকর্তাকে ঘুষ দিয়ে সিদ্ধান্ত বদলানোর সুযোগ নেই। কেউ যদি ব্যক্তিগতভাবে টাকা তুলে থাকে, তবে তার দায়ভার কোম্পানি নেবে না এবং অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে কঠোর প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
বিটিসিএল তেজগাঁও ক্যাম্পের কর্মচারী মোক্তার ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, "এরা টাকা তুলে খেয়ে ফেলেছে, এরা সবাই চাঁদাবাজ। টাকা ফেরতের জন্য আমাদের ঐক্যবদ্ধ হতে হবে।" ক্যান্টনমেন্ট ক্যাম্পের কর্মচারী নাজিম ও আব্দুল হক জানান, তারা অভিযুক্ত মিজানকে টাকা দিয়েছিলেন, কিন্তু সেই টাকা আর ফেরত পাননি। প্রধান কার্যালয়ের গাড়িচালক রহিম জানান, এই টাকা লেনদেন নিয়ে ইতিমধ্যে কর্মচারীরা অভিযুক্ত কয়েকজনকে অবাঞ্ছিত ঘোষণা করেন।
ভুক্তভোগী কর্মচারীরা জানান, বিটিসিএল-এর অভ্যন্তরে এখন একটাই প্রশ্ন, যেখানে মন্ত্রণালয় সাফ জানিয়ে দিয়েছে টাকা দেওয়া সম্ভব নয়, সেখানে সচিবদের নাম ভাঙিয়ে আদায় করা এই কোটি টাকা এখন কার পকেটে? সাধারণ কর্মচারীরা এখন বিচার চেয়ে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) হস্তক্ষেপ কামনা করছেন।
অর্থ আত্মসাতের অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে অভিযুক্ত মিজান ঘুষ নেওয়ার কথা অস্বীকার করে দায় চাপান অন্যদের ওপর। অন্যদিকে, ভিপি হানিফের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাকে পাওয়া যায়নি। তবে উপ-সহকারী প্রকৌশলী আহমেদ ফজলে রাব্বি ঘটনার সত্যতা কিছুটা স্বীকার করে বলেন, আনুতোষিকের বিষয়ে বাকবিতণ্ডা হয়েছে এবং তিনি নেতা হিসেবে ক্ষমা চেয়ে বিষয়টি সমাধানের চেষ্টা করছেন।
এ বিষয়ে বিটিসিএল-এর ডেপুটি ম্যানেজিং ডাইরেক্টর রতন কুমার হালদারের সাথে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাকে পাওয়া যায়নি।



















