আমাদের গুরুত্ব সহকারে সচেতন হওয়া দরকার। পানি ছাড়া অনুজীব অ্যামিবা থেকে বিশাল নীলতিমিও বাঁচবে না। পানির সদ্ব্যবহার জরুরি। এই পৃথিবী সবুজ গ্রহে পরিণত হওয়ার প্রধান কারণ হচ্ছে পানি। পানি আমাদের প্রতি মুহূর্তের বন্ধু।
আমরা সিলেট বন্যার সময় দেখেছি পানি কতটুকু প্রয়োজন। কিছুদিন আগেও দেখেছি দক্ষিণ চট্টগ্রামের বন্যায়। বন্যায় পানির জন্য মানুষ ঘরবন্দি ছিল। অনেক কিছু হারিয়েছি আমরা পানিতে। সমস্ত কর্ম বন্ধ ছিল। অথচ সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন ছিল পানি। পান করার মতো পানিও মেলেনি বন্যায়। নৌকায় করে গিয়ে মিনারেল ও বোতল ভরতি পানি দিয়ে জীবন বাঁচাতে হয়েছে। একে তো পানির জন্য জীবনের দুরবস্থা, অপর দিকে পানি পান করতে না-পারার তৃষ্ণা।
ঢাকার ভূগর্ভস্থ পানির স্তর উদ্বেগজনক হারে নেমে যাচ্ছে। বিশেষজ্ঞরা এর জন্য ওয়াসার অদূরদর্শী ও অকার্যকর ব্যবস্থাপনাকেই দায়ী করছেন। আমরা প্রতিনিয়ত যেভাবে ভূগর্ভস্থ পানি তুলে নিচ্ছি, তার তুলনায় সেই পানির স্বাভাবিক পুনর্ভরণ হচ্ছে না। ফলে দিন দিন পানি আরও নিচে নেমে যাচ্ছে, আর আমরা অজান্তেই নিজেদের ভবিষ্যৎকে সংকটের দিকে ঠেলে দিচ্ছি। এখনই সচেতন না হলে, খুব শিগগিরই এমন সময় আসতে পারে যখন পানি থাকা সত্ত্বেও আমরা তা ব্যবহার করতে পারব না। বাস্তবতা হলো, ঢাকা ওয়াসার বর্তমান পানি সরবরাহ ব্যবস্থার প্রায় ৭০ শতাংশই ভূগর্ভস্থ পানির ওপর নির্ভরশীল, আর বাকি অংশ আসে শীতলক্ষ্যা, বুড়িগঙ্গা ও পদ্মা নদীর পানি পরিশোধনের মাধ্যমে পরিচালিত কয়েকটি শোধনাগার থেকে। এই অতিরিক্ত নির্ভরতা শুধু ভূগর্ভস্থ পানির স্তরকে দ্রুত নিচে নামিয়ে দিচ্ছে না, বরং নগরীর পানি নিরাপত্তাকেও দীর্ঘমেয়াদে ঝুঁকির মুখে ফেলছে।
ওয়াসার তথ্য অনুযায়ী ২০২২–২৩ অর্থবছরে প্রতিদিন প্রায় ২,৬৮০ মিলিয়ন লিটার পানি সরবরাহ করা হলেও ২০২৬ সালে এই চাহিদা বেড়ে প্রায় ৩,৫৯৮ মিলিয়ন লিটারে পৌঁছাবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। এই ক্রমবর্ধমান চাপের মধ্যে টেকসই পানি ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা না গেলে ভবিষ্যতের সংকট আরও তীব্র হয়ে উঠবে। ২০২২ সালের তথ্য অনুযায়ী, ঢাকার ঘনবসতিপূর্ণ এলাকা যেমন মিরপুর, মনিপুর, সবুজবাগ, তেজগাঁও ও বাসাবোতে ভূগর্ভস্থ পানির স্তর যথাক্রমে প্রায় ৬৬, ৬৩, ৬৬ ও ৬৩ মিটার নিচে নেমে গেছে। বিপরীতে, নদীসংলগ্ন এলাকা যেমন মোহাম্মদপুর, গেন্ডারিয়া ও হাজারীবাগে এই স্তর তুলনামূলক কম—প্রায় ৩৬.৫, ২১ ও ৩৩ মিটার। এই বৈষম্য স্পষ্ট করে যে শহরের ভেতরে অতিরিক্ত পানি উত্তোলনের চাপ কতটা তীব্র, যার ফলে প্রতিবছর গড়ে ১ থেকে ১.৫ মিটার করে ভূগর্ভস্থ পানির স্তর নিচে নেমে যাচ্ছে। ফলে এখনই কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া না হলে ২০৫০ সালের মধ্যে ঘনবসতিপূর্ণ এলাকাগুলোতে ভূগর্ভস্থ পানির স্তর ১০০ মিটার পর্যন্ত নেমে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। এমন পরিস্থিতির ভয়াবহ প্রভাব ইতোমধ্যেই ঢাকার ধানমন্ডি এলাকায় দৃশ্যমান হতে শুরু করেছে, যা স্পষ্ট করে দেয়—সংকট আর ভবিষ্যতের নয়, এটি ইতোমধ্যেই আমাদের দরজায় কড়া নাড়ছে।
কিন্তু সাম্প্রতিক উন্নয়ন অর্থায়নে কাটছাঁটের ফলে ২০৩০ সালের মধ্যে সবার জন্য নিরাপদ পানি, স্যানিটেশন ও স্বাস্থ্যবিধি নিশ্চিত করার লক্ষ্য—এসডিজি ৬—ক্রমেই ঝুঁকির মুখে পড়ছে, যা আমাদের পানি নিরাপত্তা অর্জনের পথকে আরও কঠিন করে তুলছে। বিশেষ করে ইউএসএইডসহ বৈশ্বিক উন্নয়ন অংশীদারদের অর্থায়ন হ্রাসের প্রভাব ইতোমধ্যেই বিভিন্ন দেশে দৃশ্যমান, এবং বাংলাদেশও এর বাইরে নয়। বাস্তবতা হলো, পরিকল্পনাহীন পানি ব্যবস্থাপনা, অতিরিক্ত ভূগর্ভস্থ পানি নির্ভরতা এবং আর্থিক সীমাবদ্ধতার কারণে আমরা এই লক্ষ্যের বিপরীত দিকে এগোচ্ছি। তাই এখনই সময় সমন্বিত, টেকসই এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক পানি ব্যবস্থাপনার দিকে জোর দেওয়া—তা না হলে এসডিজি অর্জনের প্রতিশ্রুতি কেবল কাগজেই সীমাবদ্ধ থেকে যাবে।
সাগর মারান্ডি, ডিরেক্টর – প্রোগ্রাম ইমপ্যাক্ট অ্যান্ড অ্যাডভোকেসি, ওয়ার্ল্ড ভিশন বাংলাদেশ



















