ভূগর্ভস্থ স্পন্দন ও আগামী দিনের দ্বিধাবিভক্ত রণাঙ্গন: বাংলাদেশের রাজনীতির চোরাস্রোত..

Salauddin Akbar avatar   
Salauddin Akbar
ভূগর্ভস্থ স্পন্দন ও আগামী দিনের দ্বিধাবিভক্ত রণাঙ্গন: বাংলাদেশের রাজনীতির চোরাস্রোত..
ভূগর্ভস্থ স্পন্দন ও আগামী দিনের দ্বিধাবিভক্ত রণাঙ্গন: বাংলাদেশের রাজনীতির চোরাস্রোত..
শূন্যতার সুযোগ ও জনমানসের মনস্তাত্ত্বিক দোলাচল।
- সালাউদ্দিন আকবর , ঢাকা

২০২৪ সালের গ্রীষ্মকালীন মহাবিপ্লবের পর থেকে বাংলাদেশের শাসনতান্ত্রিক উপরিভাগে যে বিশাল পরিবর্তনের হাওয়া বইছে, ২০২৬ সালের এই মধ্যভাগে এসে তা এক নতুন গোলকধাঁধায় রূপ নিয়েছে। আপাতদৃষ্টিতে প্রকাশ্য রাজপথ একতরফা আধিপত্যের চাদরে ঢাকা থাকলেও, ক্ষমতার গভীর অন্দরে এক ভিন্ন সুরের গুঞ্জন ক্রমেই জোরালো হচ্ছে।

মার্কেটপ্লেস পণ্যসমূহ (Marketplace)

সরাসরি কেনাকাটা করুন
সবগুলো দেখুন

আইনি ও সংসদীয় প্রাচীর তুলে যে বৃহৎ রাজনৈতিক শক্তিটিকে প্রকাশ্য কর্মকাণ্ড থেকে সম্পূর্ণ অবরুদ্ধ করে রাখা হয়েছে, নেপথ্য রণাঙ্গনে তাদের 'ফিরে আসার চোরাস্রোত' এবং ভবিষ্যৎ বাংলাদেশের রাষ্ট্রচরিত্র নিয়ে একটি গভীর মনস্তাত্ত্বিক রূপরেখা এখানে তুলে ধরা হলো:

১. অবরুদ্ধ শিবিরের মৌন পুনরুত্থান: রাজপথের আড়ালে অদৃশ্য জাল

সংসদীয় আইন এবং নিষেধাজ্ঞার কড়া নজরদারিতে থাকা সত্ত্বেও সেই ‘মহীরূহ রাজনৈতিক শক্তিটি’ নিঃশেষ হয়ে যায়নি। তাদের প্রত্যাবর্তন কোনো প্রথাগত মিছিলে হচ্ছে না, বরং তা ঘটছে এক নীরব, মনস্তাত্ত্বিক ও কৌশলী উপায়ে—

  • সাইবার রণাঙ্গনে অদৃশ্য আধিপত্য: প্রকাশ্য কার্যালয় বন্ধ থাকলেও ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম এবং ভার্চুয়াল দুনিয়ায় দলটির উপস্থিতি আগের চেয়ে অনেক বেশি সংহত।
  • তৃণমূলের সুপ্ত সংযোগ: দেশের আনাচে-কানাচে ছড়িয়ে থাকা বিশাল কর্মী বাহিনী এখন আর কোনো প্রকাশ্য ব্যানার ব্যবহার করছে না। তারা বিভিন্ন সামাজিক, ধর্মীয় ও অরাজনৈতিক ছদ্মবেশে পাড়া-মহল্লায় নিজেদের সংযোগ টিকিয়ে রাখছে।
  • ভুলত্রুটি শিকার ও 'ভোলবদল': ভেতরের খবর হলো, নির্বাসিত ও আত্মগোপনে থাকা নেতৃত্ব অতীতের ভুলত্রুটি সংশোধন করে সম্পূর্ণ নতুন এবং একটি সহনশীল ইমেজ নিয়ে জনগণের সামনে হাজির হওয়ার ছক কষছে।

২. শূন্যতার সুযোগ ও জনমানসের মনস্তাত্ত্বিক দোলাচল

রাজনীতিতে কোনো শূন্যস্থান চিরস্থায়ী হয় না। বর্তমান নতুন শাসকদের কিছু কিছু সীমাবদ্ধতা অবরুদ্ধ সেই শক্তির প্রত্যাবর্তনের পথকে পরোক্ষভাবে প্রশস্ত করছে—

  • অর্থনৈতিক অস্বস্তি ও পুরোনো স্মৃতিকাতরতা: দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের সংস্কারজনিত ভর্তুকি প্রত্যাহার এবং সার্বিক অর্থনৈতিক চাপের কারণে সাধারণ মানুষের একটি অংশের মধ্যে অবচেতনভাবেই আগের সরকারের আমলের 'আপাত অর্থনৈতিক স্থায়িত্বের' প্রতি এক ধরনের স্মৃতিকাতরতা তৈরি হচ্ছে।
  • নতুনদের প্রশাসনিক অপরিপক্বতা: রাষ্ট্র পরিচালনায় নতুন শক্তির মাঠপর্যায়ের দখলদারিত্ব এবং প্রশাসনিক সমন্বয়হীনতার ঘটনাগুলো জনমনে এমন একটি বার্তা দিচ্ছে যে, রাষ্ট্র পরিচালনায় পুরোনোদের ‘অভিজ্ঞতা’ অত্যন্ত জরুরি ছিল।

৩. আন্তর্জাতিক দাবার চাল ও ভূরাজনৈতিক সমীকরণ

বাংলাদেশের ক্ষমতার অলিন্দে কারা থাকবে, তা শুধু দেশের ভেতরের সমীকরণ ঠিক করে না। আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক অক্ষের চাপও এখানে একটি বড় নিয়ামক—

  • আঞ্চলিক মিত্রদের কৌশলগত অবস্থান: ভৌগোলিক কারণে প্রতিবেশী বৃহৎ শক্তি এবং কিছু আন্তর্জাতিক অক্ষ কখনোই চাইবে না যে এই বিশাল ধর্মনিরপেক্ষ রাজনৈতিক গোষ্ঠীটি চিরতরে বিলীন হয়ে যাক। তারা পর্দার আড়ালে নতুন সরকারের ওপর ক্রমাগত চাপ সৃষ্টি করছে যেন এই দলটিকে মূলধারার রাজনীতিতে অন্তর্ভুক্তির সুযোগ দেওয়া হয়।
  • ভারসাম্যের কূটনীতি: চরমপন্থী ভাবধারার শক্তির উত্থান ঠেকাতে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ও শেষ পর্যন্ত একটি ভারসাম্যপূর্ণ বহুদলীয় রাজনীতির পক্ষে ওকালতি করছে, যা প্রকারান্তরে অবরুদ্ধ দলটির পুনর্বাসনের পথ উন্মুক্ত করতে পারে।

৪. ভবিষ্যৎ বাংলাদেশের দ্বিধাবিভক্ত রণাঙ্গন

এই চোরাস্রোত যদি শেষ পর্যন্ত সফল হয়, তবে আগামী দিনের বাংলাদেশের রাজনীতি কোনো সরলরেখায় চলবে না। তা রূপ নিতে পারে এক জটিল দ্বন্দ্বে—

  • মহাবিমুখী মেরুকরণ: ভবিষ্যৎ বাংলাদেশ কোনো একক শক্তির অধীনে শান্ত থাকবে না। একদিকে থাকবে জুলাই বিপ্লবের চেতনাধারী তরুণ ও ডানপন্থী জোট এবং অন্যদিকে থাকবে সেই সুপ্ত পুরোনো ধর্মনিরপেক্ষ শক্তি। এই দুই মেরুর তীব্র সংঘর্ষে রাজনীতি সবসময় উত্তপ্ত থাকবে।
  • প্রতিশোধ বনাম সহাবস্থানের যুদ্ধ: যদি কোনো উপায়ে এই অবরুদ্ধ শক্তি আইনি ফাঁক গলে বা আন্তর্জাতিক চাপে রাজনীতিতে পুনর্বাসিত হয়, হয়তো দেশের শাসনব্যবস্থায় এক চরম অস্থিরতা দেখা দিতে পারে কিংবা দেশ একটি দীর্ঘস্থায়ী গৃহবিবাদের দিকে যাবে, অথবা এক কঠিন সমঝোতার মাধ্যমে এক নতুন 'কোয়ালিশন' সংস্কৃতির জন্ম হবে।

উপসংহার:

আইনি কাগজে কোনো শক্তিকে নিষিদ্ধ বা অবরুদ্ধ করা গেলেও কোটি মানুষের মনস্তত্ত্ব এবং বহু দশকের সাংগঠনিক ভিত্তি রাতারাতি মুছে ফেলা যায় না। বাংলাদেশের আকাশ এখন মেঘাচ্ছন্ন, আর সেই মেঘের আড়ালে পুরোনো সূর্যটি অন্য কোনো নামে, অন্য কোনো রূপে উদিত হওয়ার জন্য ব্যাকুল হয়ে অপেক্ষা করছে। আগামী দিনের রাজনীতি তাই কোনো শান্ত নদী নয়, বরং এক উত্তাল সমুদ্রের পূর্বাভাস দিচ্ছে।

 

তথ্য সূত্র : সমসাময়িক কলাম এবং রাজনৈতিক বিশ্লেষণ (বিশেষ করে ২০২৬ সালের জুনে প্রকাশিত “When the banned party becomes the Talk of the Nation” বা নিষিদ্ধ দল যখন আলোচনার কেন্দ্রে)—যেখানে রাজনীতিতে দলটির সুপ্ত মনস্তাত্ত্বিক অস্তিত্ব নিয়ে বিশদ আলোকপাত করা হয়েছে। প্রথম আলো।

 

 

 

Keine Kommentare gefunden


News Card Generator