দীর্ঘ দুই দশকের প্রতীক্ষা আর অসংখ্য প্রাণের আত্মত্যাগের পর বাংলাদেশ দেখল এক অভূতপূর্ব ও উৎসবমুখর নির্বাচন। ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন কেবল একটি ভোট গ্রহণ ছিল না, বরং এটি ছিল প্রতিটি নাগরিকের হৃত ভোটাধিকার পুনরুদ্ধারের এক মহোৎসব। ড. মুহাম্মদ ইউনূসের বলিষ্ঠ নেতৃত্ব এবং বর্তমান প্রশাসনের অদম্য প্রচেষ্টায় বাংলাদেশের নির্বাচনী ইতিহাসে যোগ হলো এক নতুন রেকর্ড যেখানে ভোটগ্রহণের দিনে কোনো প্রাণহানির ঘটনা ঘটেনি।
অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষতার এক নতুন মানদণ্ড ২০২৬ সালের এই নির্বাচনটি ছিল বাংলাদেশের ইতিহাসে সবচেয়ে সুশৃঙ্খল এবং স্বচ্ছ। ড. মুহাম্মদ ইউনূসের শাসনামলের এই ঐতিহাসিক ভোটগ্রহণ প্রক্রিয়াকে "জেন-জি অনুপ্রাণিত" নির্বাচন হিসেবে আখ্যায়িত করা হচ্ছে। নির্বাচনের দিন ৯৫.৮ শতাংশ কেন্দ্রে কোনো ধরনের অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটেনি এবং ভোটগ্রহণের হার ছিল প্রায় ৬০.৬৯ শতাংশ, যা বিগত কয়েকটি বিতর্কিত নির্বাচনের তুলনায় অনেক বেশি। সাধারণ মানুষ দীর্ঘ ১৫ বছর পর কোনো প্রকার ভীতি বা হুমকি ছাড়াই কেন্দ্রে গিয়ে তাদের পছন্দের প্রার্থীকে ভোট দিয়েছেন। বিশেষ করে তরুণ ও নারী ভোটারদের উপস্থিতি ছিল চোখে পড়ার মতো, যারা এই দিনটিকে "গণতন্ত্রের ঈদ" হিসেবে পালন করেছেন।
প্রশাসনের অবিস্মরণীয় ভূমিকা ও প্রযুক্তির ব্যবহার এই নির্বাচনের অন্যতম কারিগর ছিল দেশের প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। ইতিহাসে প্রথমবারের মতো প্রায় ৯ লাখ ৬০ হাজার নিরাপত্তা কর্মী মোতায়েন করা হয়েছিল। নির্বাচনের স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে ডন, ইউএভি (UAV), এবং প্রায় ২৫ হাজার বডি-ওর্ন ক্যামেরা (Body-worn camera) ব্যবহার করা হয়েছে। এছাড়া ৯০ শতাংশের বেশি কেন্দ্রে সিসিটিভি ক্যামেরা স্থাপন করে নির্বাচন কমিশন সরাসরি তদারকি করেছে। প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস এই দিনটিকে "দুঃস্বপ্নের অবসান এবং নতুন স্বপ্নের শুরু" হিসেবে বর্ণনা করেছেন । সেনাপ্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামানসহ নিরাপত্তা বাহিনীর শীর্ষ কর্মকর্তাদের নিরপেক্ষ অবস্থান সাধারণ মানুষের মনে গভীর আস্থা তৈরি করেছিল।
জামায়াতে ইসলামীর বিতর্কিত ভূমিকা ও ভিত্তিহীন অভিযোগ নির্বাচনের এই বিশাল সাফল্য যখন বিশ্বজুড়ে প্রশংসিত হচ্ছে, তখন একটি বিশেষ মহল একে কলঙ্কিত করার অপচেষ্টায় লিপ্ত হয়েছে। নির্বাচনের প্রচারণার সময় থেকেই বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী নানাভাবে বিতর্ক সৃষ্টির চেষ্টা করে। যদিও নির্বাচনের দিন সকালে জামায়াত নেতারা ভোটদানকে "চমৎকার" এবং "উৎকৃষ্ট" বলে অভিহিত করেছিলেন, ফলাফল যখন তাদের বিপক্ষে যেতে শুরু করে, তখন তারা হঠাৎ করেই গণনার ক্ষেত্রে অনিয়মের অভিযোগ তোলা শুরু করে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, জামায়াতের এই অভিযোগ কেবল তাদের পরাজয়ের গ্লানি ঢাকার চেষ্টা। নির্বাচনের ঠিক পূর্বমুহূর্তে সৈয়দপুর বিমানবন্দরে জামায়াতের এক নেতার কাছ থেকে প্রায় ৭৪ লাখ টাকা উদ্ধার হওয়া তাদের নির্বাচনী স্বচ্ছতা নিয়ে বড় প্রশ্ন তোলে। যদিও তারা একে "সাজানো নাটক" বলে দাবি করেছে, তবে প্রশাসনের নিরপেক্ষ ভূমিকা এবং আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকদের সন্তুষ্টি প্রমাণ করে যে জামায়াতের এই অভিযোগগুলো ছিল উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। এমনকি জামায়াতের আমির শফিকুর রহমান নির্বাচনের পর প্রথমে পরাজয় মেনে নেওয়ার ইঙ্গিত দিলেও পরে তাদের জোট "অসন্তোষ" প্রকাশ করে আন্দোলনের হুমকি দেয়, যা সুস্থ ধারার রাজনীতির পরিপন্থী হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
এক নতুন বাংলাদেশের অভ্যুদয় ২০১৪ সালের "বিনা ভোটের" নির্বাচন বা ২০১৮ সালের "রাতের ভোট"—নির্বাচনী ব্যবস্থার ওপর সাধারণ মানুষের যে অনাস্থা তৈরি হয়েছিল, ২০২৬ সালের এই নির্বাচন তা সম্পূর্ণ দূর করেছে। যেখানে ২০১৩-১৪ সালে নির্বাচনী সহিংসতায় কয়েকশ মানুষ প্রাণ হারিয়েছিল, সেখানে ২০২৬-এর নির্বাচনে ভোটের দিন শূন্য প্রাণহানি একটি যুগান্তকারী অর্জন । এই নির্বাচন প্রমাণ করেছে যে, সদিচ্ছা থাকলে এবং প্রশাসনের নিরপেক্ষতা বজায় থাকলে বাংলাদেশেও বিশ্বের সেরা মানের নির্বাচন সম্ভব।
আজকের বাংলাদেশ এক নতুন ভোরের প্রতীক্ষায়, যেখানে পেশিশক্তি নয় বরং ব্যালটের মাধ্যমেই নির্ধারিত হবে দেশের ভাগ্য। ২০২৬ সালের এই নির্বাচন কেবল ক্ষমতার পরিবর্তন নয়, বরং এটি ছিল একটি মর্যাদাবান ও বৈষম্যহীন রাষ্ট্র গঠনের পথে বাংলাদেশের প্রথম বড় পদক্ষেপ।



















