ভারতের রাজস্থানের আরাবল্লী পর্বতমালার মাঝে অবস্থিত ভানগড় দুর্গ (Bhangarh Fort) সমগ্র এশিয়া, এমনকি বিশ্বের অন্যতম 'ভুতুড়ে' স্থান হিসেবে পরিচিত। আর্কিওলজিক্যাল সার্ভে অফ ইন্ডিয়া (ASI) দ্বারা এই দুর্গের মূল ফটকে একটি সতর্কবার্তা দেওয়া আছে— "সূর্যাস্তের পর এই দুর্গে প্রবেশ সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ।" বছরের পর বছর ধরে মানুষের মুখে মুখে ঘুরে বেড়াচ্ছে নানা রোমহর্ষক গল্প। বলা হয়, যারা রাতে এই দুর্গে থেকেছেন, তারা আর কখনো জীবিত ফেরেননি। কিন্তু এই 'ভুতুড়ে' তকমার পেছনের আসল সত্যটা কী? সম্প্রতি জনপ্রিয় ইউটিউবার ধ্রুব রাঠি তার একটি ভিডিওতে এই রহস্যের জট খুলেছেন।
প্রচলিত দুই 'অভিশাপের' মিথ ভানগড় শহর একসময় ৯০০০-এর বেশি বাড়ি, ৭ তলা রাজপ্রাসাদ, মন্দির এবং জমজমাট বাজার নিয়ে গড়ে ওঠা একটি সমৃদ্ধ শহর ছিল। আজ এটি কেবল ছাদবিহীন এক ধ্বংসস্তূপ। এই ধ্বংসের পেছনে স্থানীয়রা দুটি মূল গল্প বিশ্বাস করেন:
১. বাবা বালুনাথের অভিশাপ: ১৫৭৩ সালে রাজা মাধব সিং যখন এই শহর গড়ে তোলেন, তখন সেখানে বাবা বালুনাথ নামের এক সাধু তপস্যা করতেন। সাধু শর্ত দিয়েছিলেন যে, দুর্গের কোনো ভবনের ছায়া যেন তার কুঁড়েঘরের ওপর না পড়ে। কিন্তু মাধব সিংয়ের নাতি অજબ সিং দুর্গটিকে ৭ তলা উঁচু করায় ছায়া সাধুর ঘরে পড়ে। এর ফলে সাধুর অভিশাপে পুরো শহর ধ্বংস হয়ে যায়।
২. তান্ত্রিক সিঙ্ঘিয়ার কালো জাদু: আরেকটি জনপ্রিয় গল্প হলো রাজকুমারী রত্নাবতী এবং তান্ত্রিক সিঙ্ঘিয়াকে নিয়ে। সিঙ্ঘিয়া রাজকুমারীকে পাওয়ার জন্য তার সুগন্ধির বোতলে কালো জাদু করে। কিন্তু রাজকুমারী বিষয়টি বুঝতে পেরে বোতলটি একটি পাথরের ওপর ছুড়ে মারেন। জাদুকৃত পাথরটি গড়িয়ে গিয়ে তান্ত্রিককে পিষে মারে। মৃত্যুর আগে তান্ত্রিক অভিশাপ দেয় যে এই শহরের সবাই মারা যাবে এবং কারও পুনর্জন্ম হবে না।
বিজ্ঞানের চোখে 'ভূত' দর্শন ধ্রুব রাঠির বিশ্লেষণ অনুযায়ী, ভানগড়ে মানুষের 'ভূত' দেখার বা অদ্ভুত কিছু অনুভব করার পেছনে কোনো অতিপ্রাকৃত শক্তি নেই, বরং রয়েছে বিজ্ঞান। এর পেছনের প্রধান কারণগুলো হলো:
-
ইনফ্রাসাউন্ড (Infrasound): এটি এমন একটি শব্দ তরঙ্গ (২০ হার্জের নিচে) যা মানুষের কান শুনতে পায় না, কিন্তু শরীর অনুভব করতে পারে। ভানগড়ের পুরোনো পাথরের দেয়ালের ফাঁক দিয়ে বাতাস বয়ে গেলে প্রাকৃতিকভাবে ইনফ্রাসাউন্ড তৈরি হয়, যা মানুষের শরীরে কাঁপুনি, অস্বস্তি এবং 'কেউ নজর রাখছে' এমন অনুভূতির সৃষ্টি করে।
-
ভূমিকম্প প্রবণ এলাকা: ভানগড় 'সিসমিক জোন-৪'-এ অবস্থিত হওয়ায় সেখানে ছোটখাটো ভূকম্পন সাধারণ ব্যাপার, যা ইনফ্রাসাউন্ড তৈরিতে সাহায্য করে।
-
প্যারাডোলিয়া (Pareidolia) এবং মানুষের মনস্তত্ত্ব: মানুষের মস্তিষ্ক র্যান্ডম আকার বা ছায়াতে পরিচিত মানুষের মুখ খোঁজার চেষ্টা করে। টুটাফাটা দেয়াল ও অন্ধকারে মস্তিষ্ক নিজে থেকেই ছায়াকে 'ভৌতিক আকার' হিসেবে কল্পনা করে নেয়। এছাড়া 'সাজেস্টেবিলিটি' (Suggestibility) বা মানুষের পূর্বধারণা বড় ভূমিকা রাখে। ভানগড়ে ভূত আছে—এই ধারণা নিয়ে সেখানে গেলে সামান্য পাতার শব্দকেও ভূত মনে হয়।
সরকারি সতর্কবার্তার আসল কারণ অনেকে ভাবেন ASI-এর সাইনবোর্ডটি ভূতের প্রমাণ। কিন্তু আসল কারণটি হলো নিরাপত্তা। ভানগড় দুর্গ থেকে মাত্র ৫০ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত 'সরিস্কা টাইগার রিজার্ভ'। রাতে বাঘ, চিতাবাঘ, হায়েনা এবং অন্যান্য বন্য প্রাণী দুর্গের আশেপাশে চলে আসে। দূর থেকে হায়েনার ডাক মানুষের কান্নার শব্দের মতো শোনায়। এছাড়া দুর্গের অবকাঠামো খুবই জরাজীর্ণ হওয়ায় অন্ধকারে দেয়াল ধসে পড়ার ঝুঁকি রয়েছে। তাই নিরাপত্তার স্বার্থেই রাতে প্রবেশ নিষেধ করা হয়েছে।
ইতিহাসের আসল সত্য: খরা এবং যুদ্ধ রাজকুমারী রত্নাবতী, তান্ত্রিক সিঙ্ঘিয়া বা বাবা বালুনাথের ঐতিহাসিক কোনো সুনির্দিষ্ট প্রমাণ বা রেকর্ড নেই। এগুলো মূলত লোককথা, যা যুগের পর যুগ ধরে মানুষের মুখে মুখে রোমাঞ্চকর রূপ নিয়েছে। ঐতিহাসিক সত্য হলো, ১৭২০ সালে জয়পুরের রাজা সাওয়াই জয় সিং ভানগড় আক্রমণ করে দখল করে নেন। কিন্তু শহরটি চূড়ান্তভাবে ধ্বংস হয় ১৭৮৩ সালের ভয়াবহ 'চালিসা দুর্ভিক্ষ'-এর (Chalisa Famine) কারণে। এল-নিনো প্রভাবের কারণে সৃষ্ট এই ভয়ংকর খরার ফলে পানির অভাবে মানুষ শহর ছেড়ে পালাতে বাধ্য হয় এবং ভানগড় একটি পরিত্যক্ত ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়।
মানুষের মনস্তত্ত্ব আকর্ষণীয় গল্প মনে রাখতে পছন্দ করে বলে খরার মতো সাধারণ ঐতিহাসিক সত্যের চেয়ে অভিশাপের গল্প বেশি জনপ্রিয় হয়েছে। এছাড়া, 'ভারতের সবচেয়ে ভুতুড়ে স্থান' তকমাটি স্থানীয় পর্যটন শিল্পকে বাঁচিয়ে রেখেছে, তাই কেউ এই মিথ ভাঙতে চায় না।
ধ্রুব রাঠির এই বিশ্লেষণ প্রমাণ করে যে, ভানগড় দুর্গে কোনো ভূত নেই; বরং আছে ইতিহাস, বিজ্ঞান এবং মানুষের মনস্তত্ত্বের এক অপূর্ব সংমিশ্রণ।