বাঁশশিল্পী মো. কামাল হোসেনের চার দশকের সংগ্রাম
মোহাম্মদ জামশেদ আলম,
সীতাকুণ্ড প্রতিনিধি :
চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ড উপজেলার সৈয়দপুর ইউনিয়নের পূর্ব সৈয়দপুর গ্রামের বাসিন্দা মো. কামাল হোসেন (৫৮)। দীর্ঘ প্রায় চার দশকেরও বেশি সময় ধরে তিনি বাঁশ দিয়ে তৈরি করে আসছেন নানারকম ব্যবহার্য তৈজসপত্র—লাই, টুকরি, খাঁচি, হাতপাখা, কুলা ও অন্যান্য দৈনন্দিন প্রয়োজনীয় সামগ্রী। নিজের হাতে তৈরি এসব পণ্য বিক্রি করেই দীর্ঘদিন সংসার চালিয়েছেন তিনি।
কামাল হোসেন জানান, একসময় তাঁর তৈরি পণ্যের কদর ছিল ব্যাপক। বৃষ্টি-বর্ষায় কৃষকের একমাত্র ভরসা ছিল ‘জুঙ্গুর’। মাছ ধরার জন্য 'চাঁই', ‘আঁন্তা’ ও ‘ডুগ’ ছিল অপরিহার্য উপকরণ। গ্রামবাংলার প্রায় প্রতিটি ঘরে এসব বাঁশের তৈরি জিনিসের ব্যবহার ছিল চোখে পড়ার মতো। তখন এসব বিক্রি করেই স্বাচ্ছন্দ্যে সংসার চালানো যেত।
কিন্তু সময়ের পরিবর্তন আর আধুনিকতার ছোঁয়ায় অনেক কিছুই আজ হারিয়ে গেছে। প্লাস্টিক ও মেশিনে তৈরি পণ্যের দাপটে ঐতিহ্যবাহী বাঁশের সামগ্রীর চাহিদা কমে এসেছে উল্লেখযোগ্যভাবে। ‘জুঙ্গুর’, 'চাঁই' ‘আঁন্তা’ 'হাতপাখা' ও ‘ডুগ’ -এর মতো পণ্য এখন প্রায় বিলুপ্ত। নতুন প্রজন্মের অনেকেই এসবের নাম পর্যন্ত জানে না।
বর্তমানে দু-একটি পণ্যের সামান্য চাহিদা থাকলেও সেগুলো তৈরি করতেও নানা প্রতিবন্ধকতার মুখে পড়তে হচ্ছে তাঁকে। বাঁশসহ প্রয়োজনীয় কাঁচামালের দাম কয়েকগুণ বেড়ে গেছে। উৎপাদন খরচ বেড়ে যাওয়ায় আগের মতো লাভ করা সম্ভব হচ্ছে না। জীবিকা নির্বাহ করাই এখন তাঁর জন্য কষ্টসাধ্য হয়ে উঠেছে।
তবুও হাল ছাড়েননি কামাল হোসেন। দীর্ঘ চার দশকের অভিজ্ঞতা আর পেশার প্রতি ভালোবাসা তাঁকে এখনো বাঁশের কাজের সঙ্গে বেঁধে রেখেছে। তাঁর হাতের নিপুণ ছোঁয়ায় বাঁশ যেন নতুন প্রাণ পায়। প্রতিটি বাঁশের ফালি, প্রতিটি বুননের রেখায় ফুটে ওঠে গ্রামীণ জীবনের সৌন্দর্য ও সরলতা।
স্থানীয়দের মতে, সরকারি বা বেসরকারি উদ্যোগে যদি প্রশিক্ষণ, স্বল্পসুদে ঋণ, কাঁচামাল সহায়তা ও বাজার সম্প্রসারণের ব্যবস্থা করা যায়, তাহলে এমন দক্ষ কারিগরদের কাজ আবারও নতুনভাবে মূল্যায়িত হতে পারে। বিশেষ করে অনলাইন বাজার ও হস্তশিল্প মেলার মাধ্যমে দেশ-বিদেশে প্রচার করা গেলে এই শিল্প নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলতে পারে।
মো. কামাল হোসেনের মতো কারিগররা কেবল পণ্য তৈরি করেন না—তারা বয়ে নিয়ে চলেন বাংলার ঐতিহ্য, সংস্কৃতি ও গ্রামীণ জীবনের ইতিহাস। তাদের টিকিয়ে রাখা মানে আমাদের শিকড়কে বাঁচিয়ে রাখা।



















