কিছু মানুষ সময়ের ভেতর দিয়ে হেঁটে যান না, সময়ই তাদের বহন করে। বাংলা কবিতার পরিসরে এমনই এক দীপ্ত নাম আল মাহমুদ। তাঁর ষষ্ঠ মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে “বিপ্লব বসন্তে আল মাহমুদ” শীর্ষক স্মরণসভা অনুষ্ঠিত হয়েছে ১৫ এপ্রিল ২০২৬, বাংলা একাডেমি-র আল মাহমুদ কর্নারে। আয়োজন করে সাহিত্য সংগঠন “কালের কলস”।
বসন্তের বিকেলে কবির স্মৃতিকে ঘিরে জমে ওঠে এক আন্তরিক সাহিত্যসম্মেলন। সভাপতিত্ব করেন জাতিসংঘের সিভিল সোসাইটির প্রতিনিধি ড. আবুল কাসেম শেখ। উপস্থিত ছিলেন জাতীয়তাবাদী লেখক ফোরামের সভাপতি কবি শাহীন রেজা, কবি ও সাংবাদিক শান্তা মারিয়া, কবি শাহীন রিজভী, ড. কাজল রশীদ শাহীন এবং ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল আরিফ খান। আলোচনায় অংশ নেন নর্দান বিশ্ববিদ্যালয়ের সহযোগী অধ্যাপক জসীম উদ্দীন, কবি ইমরান মাহফুজ, চলচ্চিত্রকার পার্থিব রাশেদ ও কবি-গবেষক শামস আরেফিন।
আলোচকদের কণ্ঠে ঘুরে ফিরে আসে একটাই উপলব্ধি- আল মাহমুদ কেবল একজন কবি নন, তিনি এক মানসজগৎ, এক সাংস্কৃতিক ভুবন। কবি শাহীন রেজা বলেন, আমাদের চেতনা ও অবচেতনে আল মাহমুদ অমলিন। তিনি বাংলা একাডেমিতে একটি পূর্ণাঙ্গ “আল মাহমুদ অডিটোরিয়াম” নির্মাণ এবং “আল মাহমুদ স্মৃতি পুরস্কার” প্রবর্তনের আহ্বান জানান।
কবি আবিদ আজম স্মরণ করিয়ে দেন, আন্দোলন-সংগ্রামের দিনগুলোতে রাজপথে উচ্চারিত হয়েছে আল মাহমুদের কবিতা। তাঁর মতে, একটি কর্নার নয়, প্রয়োজন এমন এক অডিটোরিয়াম যেখানে প্রজন্মের পর প্রজন্ম কবিকে নতুন করে আবিষ্কার করবে।
কবি শান্তা মারিয়া জানান, চীনের বাংলা সাহিত্য পাঠ্যসূচিতে আল মাহমুদের কবিতা অন্তর্ভুক্ত করার উদ্যোগ সফল হয়েছে। ফলে কবির কণ্ঠ এখন আন্তর্জাতিক পরিসরে পৌঁছানোর নতুন সম্ভাবনা তৈরি করেছে।
কবি ইমরান মাহফুজ বলেন, বাংলাদেশি সংস্কৃতির গভীর সুর বোঝার এক অনন্য মাধ্যম আল মাহমুদের কবিতা। শামস আরেফিন তাঁর কাব্যের নৈঃসঙ্গ, আত্মমগ্নতা ও ঐতিহ্যনির্ভর মিথাশ্রয়ী রূপ বিশ্লেষণ করেন। ড. কাজল রশীদ শাহীন মন্তব্য করেন, বাংলাদেশকে বুঝতে হলে আল মাহমুদকে বুঝতেই হবে- দেশ ও কবিতা তাঁর ভেতর অবিচ্ছেদ্যভাবে মিশে আছে।
ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল আরিফ খান মনে করিয়ে দেন, কবির কাজ স্বপ্ন দেখানো, আর সেই স্বপ্ন বাস্তবায়নের দায়িত্ব আমাদের সবার। সভাপতির বক্তব্যে ড. আবুল কাসেম শেখ প্রস্তাব করেন একটি “আল মাহমুদ ইনস্টিটিউট” বা “আল মাহমুদ কালচারাল সেন্টার” প্রতিষ্ঠার। তাঁর ভাষায়, এটি কেবল একজন কবির স্মৃতি সংরক্ষণ নয়, বরং বাংলাদেশি সংস্কৃতির গভীর শিকড়কে ধারণ করার একটি স্থায়ী উদ্যোগ।
অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করেন কবি আবিদ আজম ও মুশফিকা নীপা। স্বনামধন্য আবৃত্তিকারদের কণ্ঠে যখন উচ্চারিত হয় কবিতার পঙক্তি, তখন স্মরণসভা হয়ে ওঠে আবেগময় ও প্রাণবন্ত।
বসন্তের দিনে স্মরণ করা হলো এক কবিকে, যিনি বিপ্লবে যেমন ছিলেন, প্রেমে তেমনি, বাংলার মাটির গন্ধেও তেমনি নিবিড়।
আল মাহমুদ আছেন- বাংলা ভাষার গভীরে, পাঠকের হৃদয়ে, সময়ের অনন্ত প্রবাহে।



















